আমাদের গ্রহ পৃথিবী আরও একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করল। আমাদের জীবনে বয়ে নিয়ে আসছে নতুন বছর। খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডারের ২০২৫তম বছরটি শুরু হলো। মহাকালের তুলনায় হয়তো এ কিছুই নয়, একটা নতুন বছর পৃথিবীর জন্যও হয়তো কিছুই নয়, তবে মানুষের জন্য তা নিয়ে আসে নতুন সুযোগ। বাংলাদেশের জন্য ইতিহাসের পাতায় বড়সড় দাগ কেটে রাখা একটি বছর ২০২৪। রাজনৈতিকভাবে এক উত্তাল বছর পার করে এলাম আমরা। এই জনপদের গণআন্দোলনের ইতিহাসে আরও একটি পালক যোগ করে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা স্বৈরাচারকে দেশত্যাগে বাধ্য করে এদেশের জনগণ।
আন্দোলনে জিতলেও দেশের মানুষের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর হয়নি। আবারও নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের অবিশ্বাস দেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও অবস্থাকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে স্বৈরাচারের কবলে পড়ে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা ভঙ্গুর হয়েছে দলীয়করণ ও দুর্নীতির থাবায়। জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার না থাকায় গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই কারণে, স্বৈরাচার পতনের পর যেনতেন প্রকারে নির্বাচন দেওয়া কেবল নয়, গোটা দেশের মানুষ আকাক্সক্ষা করছে সংস্কারের। সংস্কারের জন্য সরকারও উদ্যোগ নিয়েছে। অনেককাল পর গোটা বাংলাদেশ যেন নতুন স্বপ্ন নিয়ে নতুন বছর শুরু করতে চাচ্ছে।
তবে, নতুন বছর নতুন রকম আশা যেমন নিয়ে আসে, তেমনি নিয়ে আসে আশঙ্কাও। ফলে, সংস্কারের পাশাপাশি গণতন্ত্রহীনতা নিয়েও আশঙ্কা থাকবে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নিয়ে আশার পাশাপাশি শঙ্কাও থাকবে। অতীতে আমরা পালটা অভ্যুত্থানের ঘটনা প্রচুর দেখেছি। এ জনপদে প্রায়ই জনতার আন্দোলনের ফলভোগ করেছে জনবিরোধী শাসকগোষ্ঠী। হয়ে উঠেছে নতুন স্বৈরাচার। নতুন বছরে আমাদের আশা ইতিহাসের সেই পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়।
আবারও এই দেশের ছাত্ররা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে, যেমনটা তারা করেছিল একাত্তর ও নব্বইসহ সব আন্দোলনে। ছাত্রদের যেমন জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা আছে, জনতাও আবার প্রমাণ করেছে যে, ছাত্রদের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে। এবারের আন্দোলনে অন্যতম আলোচিত শব্দ ছিল জেনজি। যাদের জন্ম নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে শূন্য দশকের শেষ নাগাদ পর্যন্ত। বাংলাদেশের জনমিতির শতকরা ভাগে এই সংখ্যাটি অনেক বড়। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এই বয়সীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এই নতুন প্রজন্মই বাংলাদেশের দিশা ঠিক করবে। রাজনীতিসহ সমস্ত কিছুর ভাষা নির্মাণ করবে। ফলত, এই প্রজন্মের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি ও উৎসাহে যে আন্দোলন, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা দেবে। পুরনো বছরকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে আহ্বানের মতো বাংলাদেশের জন্যও জেনজিদের ভূমিকা নিয়ে থাকবে আশা ও আকাক্সক্ষা।
আশা করা যায়, বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির প্রভাবে বিশ্বমানব হয়ে ওঠা এই প্রজন্ম বাংলাদেশকে বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে দেবে। আমাদের নারীরাও নিজেদের প্রমাণ করছে দেশে ও বিদেশে নানা ক্ষেত্রে। নারী উন্নয়ন এবং অধিকার একটা দেশের জন্য সামাজিক, আর্থিক ও ন্যায্যতার প্রশ্নে জরুরি। নতুন বছরে আমাদের সব প্রান্তিক মানুষদের জন্য নতুন রকম শুরু হোক।
আরও একটা নতুন বছরে আমরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হতে পারব ১৯৭১, ১৯৯০ আর ২০২৪ সালের চেতনায়। আমরা যাতে ভুলে না যাই যে, হাজারো মানুষ জীবন দিয়ে এই দেশকে একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। নতুন বছর আমাদের নতুন শপথের সুযোগ এনে দিয়েছে। কবিগুরুর ভাষায় আমরা ২০২৫ সালকে অভ্যর্থনা জানাই এই বলে :
‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা’
