প্রকল্পের নামে অর্থনাশ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:২৬ এএম

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিলের কারণে বিগত সরকার জানিয়েছিল, বিকল্প জ্বালানিনির্ভর আরও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করবে। ২০২১ সালে সেই সময়ের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংগতি রেখে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। ক্রয় কমিটির সভায় ৪টি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আরও ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।’ গত বছর কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেছিলেন, ‘জ্বালানি বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখা হচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করা একটি ভয়াবহ ইঙ্গিত। জ্বালানি খাতে সুবিচার নিশ্চিত করতে হলে, বাণিজ্যিক খাত থেকে তাকে সরিয়ে নিয়ে সেবা খাতে পরিণত করতে হবে।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? তখনই বলেছিলেন, ‘২০২৪ সালে জ্বালানি খাতের কী অবস্থা হবে তা নিয়ে আমরা শঙ্কায় আছি।’

এখন আমরা পা দিয়েছি ২০২৫ সালে। দেশে অন্তর্বর্তী সরকার।  বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এসবের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যৌক্তিক মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি খরচে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’ অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবতা অনুধাবন না করে আর্থিক ও কারিগরি সমীক্ষা ছাড়াই লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ পূরণের জন্য কিছু ব্যক্তি-গোষ্ঠীর স্বার্থে দেশ জুড়ে পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। মন্ত্রী, আমলা ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী মিলে এসব অপকর্ম করেছেন। বিশেষ বিধানের সুযোগে এসব প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ দেওয়া হয়েছে দরপত্র ছাড়াই। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘এগুলো সব বাহবা প্রকল্প। গ্যাস নেই জেনেও বাহবা কুড়াতে পাইপলাইন করা হয়েছে। গ্যাসের সংস্থান না করেই খুলনায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। এটা কোন ধরনের পরিকল্পনা?’ এমনটাই জানাচ্ছে বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন। 

ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০২১ সালে বলা হয়েছিল বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতা ও জলবায়ুর ক্ষতিকর পরিবর্তনকে সামনে রেখে বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যানে (পিএসএমপি) পরিবর্তন আসছে। এতে জ্বালানি খাতকেও অন্তর্ভুক্ত করে সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান (পিইএমপি) প্রণয়নের কাজ চলছে। পরিবেশদূষণ রোধে ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনায় কয়লার ব্যবহার কমানো হচ্ছে। বিপরীতে বাড়ানো হবে আমদানি করা গ্যাসভিত্তিক (এলএনজি) বিদ্যুৎ প্রকল্পের সংখ্যা। জোর দেওয়া হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপরেও। কোন ধরনের পরিবর্তন হয়েছে আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৪২০ কোটি ঘনফুট। গড়ে ২৮০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করা হচ্ছে। এর প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট উচ্চমূল্যের আমদানি করা এলএনজি। বছরে ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করেও ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না। গ্যাসের সংকট বাড়ছেই। তবু উন্নয়নের নামে করা হয়েছে গ্যাস সরবরাহের পাইপলাইন। অন্যদিকে সক্ষমতার অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র থাকার পরও করা হয়েছে নতুন গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র। এসব প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ব্যয় বাড়ছে। কেন্দ্রের মালিকদের গত দেড় দশকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে সরকারকে। অযাচিত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই চাপে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘গ্যাস সংকট জেনেও ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারের লোকদের যোগসাজশে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত তদন্ত করে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা। পাইপলাইনও নির্মাণ করা হয়েছে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য।’

দেশ জুড়ে গ্যাস সরবরাহ প্রকল্পে কত লাখ কোটি টাকা আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতি করেছে, তার সঠিক হিসাব নেই। সেই সময় নতুন নতুন গ্যাস পাইপলাইন, একাধিক গ্যাসবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। ঋণের টাকায় নির্মিত গ্যাস পাইপলাইনগুলো পড়ে আছে মাটির নিচে। আর ঘানি টানছে বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিভিন্ন সময় জনগণকে দেখানো হয়েছে ভেলকিবাজি। দেশের মানুষকে জ্বালানি মূল্যের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে, এই মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার এগিয়ে যাবে এমনটিই প্রত্যাশা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত