নতুন বইয়ের গন্ধ পেল না দেশের প্রায় ৮৫ ভাগ শিশুশিক্ষার্থী। বিগত ১৫ বছর ঘটা করে বছরের প্রথম দিন শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন বই। রাজনৈতিক অর্জনের বাহবা নিতে বিগত সরকার বই উৎসবকে পুঁজি করেছিল। এতে শিশুদের আনন্দ দেওয়া গেছে। প্রতি বছর বই উৎসবে নতুন বই পেতে শিশুরা স্কুলে হাজির হতো। রাজনৈতিক চর্চা ছিল বলে স্কুল সাজত বর্ণিল সাজে। থাকত বিশাল আয়োজন। এ বছর যে চিত্র ছিল অনুপস্থিত। খরচ কমানোর অজুহাত দেখিয়ে বই উৎসব বাতিল করা হয়েছে। এ কারণে এবার স্কুলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও ছিল কম। এ ছাড়া এ বছর আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সবাই বছরের প্রথম দিন বই পাচ্ছে না। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ৬ কোটি ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার ৭৬২ শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ কোটি ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ২০২ কপি বই ছাপার কাজ এখনো চলমান। ৩১ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ছাপা শেষ হয়েছে মাত্র ৬ কোটি ৬ লাখ। এসব বই বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষা অফিস পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেই হিসেবে মোট পাঠ্যবইয়ের মাত্র ১৫ শতাংশ সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৮৫ শতাংশ বই কবে ছাপা ও সরবরাহ শেষ হবে, তা অনিশ্চিত। গত বুধবার শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে একটি বা দুটি করে নতুন পাঠ্যবই। তাও সব শ্রেণির না। আবার কোথাও কোথাও পাঠ্যবই না পেয়ে খালি হাতে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। এ দিন নতুন বই পেয়েছে যেসব শিক্ষার্থী, তাদের মুখে হাসি ফুটলেও যারা পায়নি তাদের মলিন বদনে ফিরে যেতে হয়েছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মন খারাপের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা গেছে, বই না পাওয়ার ব্যাখ্যায় শিক্ষা উপদেষ্টা বলেছেন এ বইগুলো ছাপা, এটি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের মতো অবস্থা হয়েছে। এখানে প্রথমত হলো বিদেশে বই ছাপানো হবে না। অনিবার্য কারণে শিক্ষাক্রমও পরিবর্তন করা হয়েছে, এতে বইয়ের সংখ্যা বেড়েছে। যে সময় থেকে এই কাজ শুরু করা হয়েছে, তখন সময়ও খুব কম ছিল। তার মধ্যে আবার অনেক বই পরিমার্জন করতে হয়েছে; যাতে দলীয় রাজনীতি নিরপেক্ষভাবে যেন বইয়ে থাকে। তারপর আবার উন্নত মানের ছাপা, উন্নত মানের কাগজ, উন্নত মানের মলাটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এনটিসিবিতে যাতে এত দিন ধরে কাজ করেছেন, তাদের অনেককে অনিবার্য কারণে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে আগে অভিজ্ঞতা ছিল এমন মানুষদেরই বসানো হয়েছে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কীভাবে বোঝাপড়া করতে হয়, এটি তাদের অভিজ্ঞতায় নেই। মূলত এসব কারণে সব বই ছাপা যায়নি বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন উপদেষ্টা।
গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। বিগত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ তাদের লোকজন দিয়ে সব কিছু করিয়েছে। ক্ষমতা থেকে সড়ে যাওয়ায় হঠাৎই সব কিছুতে শূন্য ভারসাম্য তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শূন্যতা পূরণ করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তা ছাড়া রয়েছে বিগত সরকারের ষড়যন্ত্র। সব কিছু সামাল দিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে চেষ্টা চালাতে হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকও এর বাইরে না। যদিও শিশুদের শিক্ষা উপকরণ নিয়ে রাজনীতি করা কখনো কাম্য নয়। কিন্তু নীতিবিবর্জিত রাজনৈতিক চর্চা আমাদের দেশে বেশি হচ্ছে। এর মাশুল গুনছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এ কারণে শিক্ষা উপদেষ্টা ব্যাখ্যা দিয়েছেন, দুঃখও প্রকাশ করেছেন। অবশ্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান বলেছেন ৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রাথমিকের বাকি সব বই, ১০ জানুয়ারির মধ্যে মাধ্যমিকের প্রায় আটটি বই এবং ২০ জানুয়ারির মধ্যে সব বই যাবে। এ লক্ষ্যে তারা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। বই উৎসবকে অপচয় বলেছে এনসিটিবি। কারণ এর জন্য যে আনুষ্ঠানিকতা নেওয়া হতো এতে অনেক অর্থ খরচ হতো। এটা সময়মতো বই দিতে ব্যর্থতার ঢাকার কৌশলও হতে পারে। তবে নিঃসন্দেহে অনেক খরচ হতো। কিন্তু শিশু মনের আনন্দটা তো হলো না। তবে এ বছর একটা কাজ হয়েছে তা হলো অনলাইনে এনসিটিবির ওয়েবসাইটে পাঠ্যবইয়ের পিডিএফ সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে বছরের শুরুর দিন থেকে। ফলে শিক্ষার্থীরা চাইলে তাদের নতুন বইয়ের চেহারা কেমন হবে তা দেখতে পাবে। পড়তেও পারবে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকার এক যুগ আগে তৈরি পুরনো শিক্ষাক্রমের আলোকে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে জন্য এনসিটিবি ৪১ বিশেষজ্ঞ দিয়ে ৪৪১টি পাঠ্যবই পরিমার্জন করেছে। এতে অনেক বিষয়বস্তু সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। বেশ কিছু গদ্য, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা বা বিষয়বস্তু বাদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে স্থান পেয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তুসহ নতুন কিছু গল্প-কবিতা, গ্রাফিতি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে সাহিত্যের পাশাপাশি ইতিহাস বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীনতার ঘোষণাসহ বেশ কিছু বিষয়ে সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের শহীদদের স্মরণ করে লেখা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বিষয়ের নতুন বইয়ে ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক অধ্যায়ের প্রথম অংশে প্রথমে রয়েছে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ছবি। পাশে রয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি। জাতীয় চার নেতার ছবিও রয়েছে। পুরনো বইয়ে একই স্থানে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার ছবি ছিল। চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ পাঠ্যবইয়েও স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি রয়েছে। নতুন বইয়ে এই অধ্যায়ের ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ’ শীর্ষক লেখায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ছবির পাশাপাশি মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার ছবি স্থান পেয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির আমার বাংলা বইয়ে ছয়টি প্রবন্ধ, কবিতা বা ছড়া নতুন করে যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ শীর্ষক প্রবন্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের ছবিসহ এই গণ-অভ্যুত্থানে সব শহীদকে স্মরণ করে লেখা যুক্ত হয়েছে। বলা যায়, এসব পরিমার্জনেও অন্তর্বর্তী সরকারকে সময় নিয়েছে। যেটা নতুন বই ছাপা দেরি হওয়ার কারণ হতে পারে।
১৯৮৩ সাল থেকে শুরু হয় বিনামূল্যের পাঠ্যবই বিতরণ। তবে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের নির্ধারিত কয়েকটি বিষয়ের বই শিক্ষার্থীদের দেওয়া হতো। ওই সময়ে একজন শিক্ষার্থীকে অর্ধেক নতুন আর অর্ধেক পুরনো বই দেওয়া হতো। শিক্ষার্থীরা সব বই পাওয়ার জন্য মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা থাকতে হতো। ঝরে পড়া রোধ, শতভাগ শিশুকে বিদ্যালয়ে ধরে রাখার নিমিত্তে ২০০৯ সাল থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সরকার। ২০১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে বছরের প্রথম কর্মদিবসে পাঠ্যপুস্তক উৎসব দিবস পালন করা হয়। এরপর যুক্ত হলো প্রাক-প্রাথমিকও। আর সেই সঙ্গে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। শিশুদের ব্রেইল বই ও মাল্টিমিডিয়া সিডি। ছাত্রছাত্রীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে সারা বিশে^ রেকর্ড স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। বিনামূল্যে কোটি কোটি বই ছেপে সেই বই শিক্ষার্থীদের নাগালে পৌঁছে দিয়ে পৃথিবীর বুকে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বাংলাদেশ। শিক্ষার বিস্তারে সরকারের আন্তরিকতার কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূলে বই বিতরণ সত্যিই অনন্য দৃষ্টান্ত।
শতভাগ সাক্ষরতার হার অর্জনের পথে একটা বড় বাধা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঝরে পড়া। বাংলাদেশে মূলত আর্থ-সামাজিক কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী প্রাথমিক পর্যায় থেকে ঝরে পড়ে। ইউনিসেফ ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর মতে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার গড়ে ৩.১ শতাংশ। তবে কভিড-১৯-এর কারণে এ হার বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে দরিদ্রতা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালে তথ্যমতে, দেশের প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এদের বেশিরভাগই আবার গ্রামে (২০.৫ শতাংশ) বাস করে, যাদের অনেকেরই আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ার কারণে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানকে অল্প বয়স থেকে বিভিন্ন পেশায় সম্পৃক্ত করে। যার দরুন যে বয়সে পড়াশোনা করার কথা, সে বয়সে শিশুরা পরিবারের উপার্জনের কাজে নিয়োজিত থাকে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ এভাবে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় শিক্ষার হার বাড়াতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম শুরু করে সরকার। শতভাগ শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে সরকারকে এই প্রণোদন দিয়ে যেতে হবে। কারণ আমরা এখনো দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাব্যবস্থায় ধরে রাখতে হবে।
তানজিম এ বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেছে। সে জানত, ১ জানুয়ারি নতুন বই দেওয়া হয়। বাবাকে আগের রাতেই বলে রেখেছে, কাল কিন্তু স্কুলে যেতে হবে নতুন বই দেবে। নতুন বই পাবে, এ জন্য তার মধ্যে বেশ উদ্দীপনা কাজ করছিল। কিন্তু বাবা তাকে বলতে পারেনি, কাল বই দেওয়া হবে না। তার বদলে স্কুলে না যেতে বলছিল। তানজিম বলল অন্য সময় স্কুলে না যেতে চাইলে তুমি রাগ কর, আজ আমি যেতে চাইছি তুমি দিচ্ছ না কেন? বাবা চেপে যায়। পরদিন তানজিম স্কুলে গিয়ে মলিন বদনে ফেরে বই ছাড়া খালি হাতে। স্কুলের শিক্ষকরা বলেছেন গ্রুপে জানিয়ে দেওয়া হবে তোমরা কবে বই পাবে। রাতে তানজিম বাবাকে বলে তুমি জানতে আজ বই দেবে না, তাই না? বাবা নিশ্চুপ।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক
