মানুষকে কষ্ট দেওয়ার পরিণতি ভয়াবহ

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:২৮ এএম

বর্তমানে আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে কিছু মানুষ ক্রমেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে উঠছে। শান্তি, শৃঙ্খলা ও সভ্যতাকে চুরমার করে দিচ্ছে। এতে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার সংকটও প্রকট হয়ে উঠছে। সম্প্রতি বর্ষবরণের নামে পটকা ফোটিয়ে যা করা হলো, আর যাই হোক তা কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক ও সভ্য মানুষের কাজ হতে পারে না। এমনিতেই বাংলাদেশ শব্দদূষণে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশ। এর মধ্যে আবার ঘটা করে শব্দদূষণের উদযাপন করা হয়। কোনো উৎসব উদযাপনের মাধ্যম কি দূষণ দ্বারা হতে পারে? মানুষের মেধা-মনন কতটা অস্বাভাবিক হলে এমন কাজ করতে পারে, ভাবা যায়? পটকার প্রচণ্ড আওয়াজে আশপাশে কত রোগী ও শিশু কেঁপে কেঁপে উঠেছে, তীব্র আতঙ্কে ভারী নিঃশ্বাস ফেলেছে, তাদের যন্ত্রণায় আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে ওঠে! কিন্তু সেই বোধ কি বিকৃত মেধা-মননের অধিকারী মানুষের মাঝে কখনো জাগ্রত হবে? তাদের এমন নোংরা ও জঘন্য কাজে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেক পাখি মারা যায়। এ বছর বর্ষবরণ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আতশবাজি ও পটকা ফোটাতে গিয়ে শিশুসহ পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নাটোরে ছাদ থেকে পড়ে এক স্কুলছাত্র মৃত্যুবরণ করেছেন।

সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো একে অপরকে সাহায্য করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সহানুভূতি প্রদর্শন করা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করা। নিজেদের আনন্দের জন্য যারা অন্যকে কষ্ট দিতে দ্বিধা করে না, তারা শান্তিপ্রিয় মানুষ হতে পারে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানবজাতি কখনো অন্যের শান্তি ও সুখ নষ্ট করতে পারে না, বরং একে অপরের প্রতি সহানুভূতি এবং দয়ার হাত বাড়াবে। দৈনন্দিন জীবনে পেশাগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবন পর্যন্ত একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, অন্যের ক্ষতি না করে তার কল্যাণে অংশীদার হওয়া। ইসলাম মানবিকতা ও সৌহার্দের ধর্ম। মানুষের প্রতি দয়া, সহমর্মিতা ও সম্মান প্রদর্শন ইসলামের মূল শিক্ষা। অন্যকে কষ্ট দেওয়া ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং এটি জঘন্য হারাম হিসেবে বিবেচিত। বর্তমান সমাজে পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দয়ার অভাব লক্ষণীয়, যা সামাজিক অস্থিরতা ও বিভেদ সৃষ্টি করছে। এ প্রেক্ষাপটে ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ নীতির কথা নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ‘মানুষকে কষ্ট দেওয়া হারাম’।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিসের মাধ্যমে বোঝা যায়, মুসলিম হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো এমনভাবে জীবনযাপন করা, যাতে আমাদের আচরণ অন্যের জন্য কোনোভাবেই কষ্টদায়ক না হয়। ইসলাম মানুষকে কষ্ট দেওয়া যেমন হারাম করেছে, তেমনি দয়া ও সহমর্মিতার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন কর, আসমানের অধিপতি তোমাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবেন।’ (তিরমিজি) হাদিসে আরও বর্ণিত হয়েছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি দয়া প্রদর্শন করতে অপারগ।’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হবে না।’ (সহিহ বুখারি) আমাদের সবার মাঝে দয়া ও সহানুভূতির চর্চা জোরদার করতে হবে। অন্যের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। যারা বুঝে না, তাদের বারবার বোঝাতে হবে যে, যারা অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে নিজেকে সংযত রাখবে, তারা দুনিয়া ও আখেরাতে নিরাপদ থাকবে এবং সাফল্য লাভ করবে। এ প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা বিনা অপরাধে মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের কষ্ট দেয়, তারা মিথ্যা অপবাদ ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা আহজাব ৫৮)

যারা বিভিন্ন উপলক্ষে পটকা ফুটিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয় তারা তো আমাদের সমাজেরই লোক। আমাদের ভাই, বন্ধু বা আপনজন। তাদের সচেতন করতে হবে। পটকা ফোটানোর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে তাদের বোঝাতে হবে। যদিও তাদের কাছে তা আনন্দের উৎস হিসেবে বিবেচিত, কিন্তু তা মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও পশু-পাখির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পটকা ফোটানোর কারণে যে ক্ষতিগুলো হয়, তা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি ও বিস্তৃত হয়ে থাকে। পটকা ফোটানোর পর যে শব্দ হয়, তা মানুষের শারীরিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলে। বিশেষত উচ্চমাত্রার শব্দদূষণ সরাসরি মানুষের শ্রবণশক্তি ও হৃদযন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এ ছাড়া এর ফলে যে ধোঁয়া ও রাসায়নিক উপাদান নিঃসৃত হয়, তা শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এই ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থ শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবাহিত হয়ে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি, অ্যাজমা ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পটকা ফোটানোর পর যে ভীতি ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়, তা মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এটি শিশুদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক, যারা শব্দের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও এই ভয়ানক শব্দের কারণে অতিরিক্ত স্ট্রেস এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে। বিশেষত যারা উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে ভুগছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, পটকা ফোটানোর কারণে কিছু ব্যক্তির মধ্যে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, ভীতি ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, যা তাদের মানসিক শান্তির জন্য ক্ষতিকর।

কাতাদাহ (রহ.) বলেন, ‘তোমরা মুমিনকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাক। কেননা আল্লাহ তাকে বেষ্টন করে রাখেন। এতে তিনি ক্রুদ্ধ হন।’ ইসলাম নির্দেশ দেয়, অন্যকে কষ্ট দেওয়া থেকে বেঁচে থাকুন। নিজের মনকে বৈরিতা প্রদর্শন করতে বাধা দিন। তাহলে আপনি উভয় জগতে লাঞ্ছনা ও আঘাত থেকে নিরাপদ থাকবেন।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত