খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান দাপট কমবে!

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:২৯ এএম

নতুন বছর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের দাপট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সবার। গত সেপ্টেম্বরের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ রেকর্ড ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। ব্যাংক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ডিসেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণ তিন লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তাদের মতে, ঋণ শ্রেণিকরণের নিয়ম কঠোর করা হলে এটি আরও বেশি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের অনুপাত এখন সবচেয়ে বেশি। দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশই মন্দ। ডিসেম্বরের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যা দাঁড়িয়েছে, তিন মাস আগেও ছিল তার চেয়ে কম। নতুন বছর এ খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ শ্রেণিবিন্যাসের জন্য খসড়া দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে। ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে তা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। খসড়া নির্দেশিকা অনুসারে, ঋণ পরিশোধের নির্ধারিত তারিখের পর তিন মাসের মধ্যে কিস্তি পরিশোধ না করলে ব্যাংক যেকোনো ধরনের ঋণকে বকেয়া হিসেবে গণ্য করবে। বর্তমানে কোনো ঋণগ্রহীতা সময়মতো কিস্তি দিতে না পারলে ঋণ পরিশোধের তারিখের ছয় মাস পর সেই ঋণকে বকেয়া হিসেবে গণ্য হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই ধাপে শ্রেণিবদ্ধকরণের নিয়ম কঠোর করছে। প্রথম দফায় মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে মেয়াদ ছয় মাস থেকে কমিয়ে তিন মাস করা  হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে এর প্রথম ধাপ বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

খেলাপি ঋণের কারণে কমে যাচ্ছে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা। ব্যাংকগুলো মুনাফা দেখাতে পারছে না। নিয়মের বাধ্যবাধকতায় বেশিরভাগ আয়ই খেয়ে ফেলছে খেলাপি ঋণ। শুধু তাই নয়, ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতিও বেড়ে চলছে, যা ব্যাংকগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে সহায়তা করছে। কয়েক বছর যাবৎ ব্যাংকে নানা কারণে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো ভুয়া ঋণ। আর ওইসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত থাকে না। যে জামানত দেখানো হয়, তার বেশিরভাগই অস্তিত্ববিহীন। বড় বড় ঋণ কেলেংকারির ঘটনা ঘটেছে ব্যাংকিং খাতে। সরকার মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করতে দেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ওপরে ব্যাংকিং খাত থেকে বের করে নেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতি দমন কমিশন থেকে প্রলম্বিত তদন্ত করা হয়েছে বা হচ্ছে। বড় বড় প্রচ্ছন্ন ও প্রকাশ্য ঋণ খেলাপিরা প্রায়শ বেশ শক্তিশালী অবস্থানে। এ ছাড়া বাইরে ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, বিদ্যুৎ, গ্যাস সংকট ও চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যাংকিং খাতে ঋণ আদায় কমে গেছে। এতে বেড়ে গেছে খেলাপি ঋণ।

অপরদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার কারণেও খেলাপি ঋণ বেড়েছে। ঋণ শ্রেণিকরণের তিনটি পর্যায় রয়েছে। তা হলো নিম্নমান, সন্দেহজনক এবং মন্দ বা ক্ষতি। এই তিনটি পর্যায় বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকগুলোকে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশন) সংরক্ষণ করতে হয়। খেলাপি ঋণ আদায় বা কমানোর জন্য কড়াকড়ি আইনকানুন ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার খড়্গ প্রায়শ পড়ছে  সাধারণ ও স্বচ্ছ ঋণ গ্রহীতার ওপর। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেশি। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হিসাবে অবলোপন করা ও আদালতের আদেশে স্থগিত থাকা ঋণ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংক খাত সংস্কারে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আগামী দিনে আরও বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

বড়রা অন্যায় করে, তাদের ধরার নাম করে যেসব প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, তারা ক্ষমতার জোর এবং চতুরতা ও চালাকির জোরে ঠিকই তা এড়িয়ে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ওই খড়্্গ গিয়ে পড়ে নিরীহ ঋণখেলাপিদের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংক এক সময় ঋণ শ্রেণিকরণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসরণ করলেও ২০১৫ সালে সেখান থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে। এখন আইএমএফের শর্তানুযায়ী কৃষি ও এসএমই ঋণসহ সব ধরনের ঋণ কঠোর শ্রেণিবিন্যাস বিধিমালার আওতায় আসবে।

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে নানাভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। প্রথমেই ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে। প্রভিশন সংরক্ষণের বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো ঋণ নিম্নমান হলে তার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ২০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর পরপর ছয় মাস ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে এমন সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ৫০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর নয় মাস অতিবাহিত হলে ওই সব ঋণকে মন্দ ঋণ বলা হয়। এ মন্দ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর শতভাগ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। এতে দেখা যায়, যে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যত বেশি ওই ব্যাংকের আয় খাত থেকে বেশি পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর বেশি পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করলে ওই ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়।

খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। কেন না, ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত কম সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে বিনিয়োগ করে। এখন, যে ব্যাংক যত বেশি ভালো গ্রাহকের কাছে ঋণ দিতে পারবে, অর্থাৎ ঋণ বিতরণ করে আদায় করতে পারবে, ওই ব্যাংকের বিনিয়োগ ক্ষমতা তত বেড়ে যাবে। আর মন্দ গ্রাহকের কাছে ঋণ বিতরণ করলে তা আদায় হবে না। অথচ মেয়াদ শেষে সুদে আসলে আমানতকারীকে টাকা ফেরত দিতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক নতুন আমানত নিয়ে পুরনোদের পরিশোধ করতে হয়। নতুন করে ঋণ বিতরণ করতে পারে না। এভাবে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যায়। অন্যদিকে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিমাপে ওই ব্যাংকের রেটিং খারাপ হয়। যে ব্যাংকের রেটিং যত খারাপ হবে ওই ব্যাংকের সঙ্গে দেশি-বিদেশি ব্যবসা-বাণিজ্য করতে বেশি ব্যয় করতে হয়। অর্থাৎ বিদেশি কোনো ব্যাংক নিম্ন রেটিংয়ের কোনো ব্যাংকের সঙ্গে এলসি খুলতে চাইবে না। আর এলসি খুললেও ঝুঁকির কারণে বেশি পরিমাণ কমিশন গুনতে হয়।

খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরতে অভিনব কৌশল গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই বড় বড় ঋণখেলাপিরা ঋণ নবায়নের সুযোগ পাবেন। ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, চলমান রাজনৈতিক সংকটে ব্যাংকগুলোর আয়ে যখন দৈন্যদশা, তখন বড় ঋণখেলাপিদের ছাড় দেওয়ায় ব্যাংকের প্রকৃত আদায় কমে যাবে। খেলাপি ঋণ প্রকৃতপক্ষে কমে যাওয়ার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাবে। এতে একদিকে কাগুজে মুনাফা বেড়ে যাওয়ায় ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে টাকা বাইরে চলে যাবে অন্যদিকে ব্যাংকের ঋণ, মূলধন, তহবিল ব্যবস্থাপনা ঝুঁকিসহ সামগ্রিক ঝুঁকির পরিমাণ বাড়বে, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য মোটেও শুভ লক্ষণ বয়ে আনবে না।

অর্থনীতিতে কতিপয় অদূরদৃষ্টিসম্পন্ন নীতি সামষ্টিক অর্থনীতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে বর্তমান অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে ধারাবাহিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির মতে, সরকার ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মধ্যে সম্পাদিত তিন বছর মেয়াদি সংস্কার কর্মসূচির ফলে গৃহীত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি এবং অন্যান্য কর্মসূচি রাজস্ব ও আর্থিক ব্যস্থাপনায় ফাঁদ সৃষ্টি করে প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করছে। রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি ও হ্রাস নির্দেশ করে সংস্থাটি বলছে, রাজস্ব আদায় কম হলে সামাজিক ও ভৌত অবকাঠামো খাতে সরকারের কম বিনিয়োগ হবে এবং প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করবে। অন্যান্য খাতে রাজস্ব ব্যয় বহাল রাখার জন্য সরকারকে ধার নিতে হবে, যা ঋণ ও ঘাটতির দুষ্টচক্রের ফাঁদে অর্থনীতিকে নিপতিত করবে। একই সঙ্গে রাজস্ব আয় কম হলে, সরকার প্রয়োজনীয় ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগ হ্রাস করবে এবং প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন সংকুচিত হবে।

অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহ কমে যাওয়ার ফলে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ধার করতে হচ্ছে এবং বিনিয়োগযোগ্য তহবিল বাবদ খরচ বৃদ্ধি ও সুদের হার বেশি থাকার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে বড় বড় ঋণখেলাপিদের ষড়যন্ত্রজনিত অস্থিরতাও যোগ হয়েছে।

লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত