ব্যাপারটা দাঁড়াল, ঘাম দিয়ে জ¦র ছাড়ার মতো। ফ্যাসিস্ট হাসিনা রেজিমের বিরুদ্ধে ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের রূপকার শিক্ষার্থীরা গত খ্রিস্টীয় বছরের শেষ দিনে, অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বরে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে বিপ্লবের প্রোক্লেমেশন বা ঘোষণাপত্র দিতে চেয়েছিলেন সেটা হয়নি ওই দিন। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নিজেরাই প্রোক্লেমেশন অব রেভল্যুশন জারির অঙ্গীকার করে শিক্ষার্থীদের প্রোক্লেমেশন থামিয়েছে। শিক্ষার্থীরা সরকারকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে কাজটা সারতে বলেছেন। তারা বলেছেন, প্রোক্লেমেশন যারাই জারি করুক, বাস্তবায়ন করতে হবে সরকারকেই। কাজেই সরকার নিজেই যদি সেই প্রোক্লেমেশন জারির ভার নেয় তাতে কাজ একধাপ এগিয়ে যায়। এখন ভালোয় ভালোয় ব্যাপারটার সুরাহা হলেই হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন বর্তমান সরকারের প্রধান ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, আন্দোলন করে হাসিনা রেজিমকে তাড়ানো শিক্ষার্থীরাই তার সরকারের নিয়োগকর্তা। সেই শিক্ষার্থীরা প্রোক্লেমেশন জারির উদ্যোগ নিলে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দলের তরফে আপত্তি জানানো হয়। তখন সরকারের তরফ থেকে প্রথমে প্রোক্লেমেশনের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্ট না থাকার কথা বলা হয়। পরে রাজনীতিক ও শিক্ষার্থী উভয় পক্ষের মধ্যে টানাপড়েন দ্রুত বাড়তে দেখে সরকার জানায়, সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলে তারাই প্রোক্লেমেশন জারি করবে। এই ঘোষণায় উত্তেজনা সাময়িক থিতিয়েছে। তবে পনেরো দিনের আলটিমেটাম দ্রুতই শেষ হবে। ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আজ থেকে ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত গণসংযোগ চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম উৎখাতের এক দফায় উন্নীত হলে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিভিন্ন সমাজশক্তি এর প্রতি সমর্থন জানায় ও একাত্ম হয়। তখন তাদের কর্মসূচি আন্দোলন, সংগ্রাম, অভ্যুত্থান নাকি বিপ্লবের পথে এগোচ্ছে এ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি। পরিভাষা বা টার্মিনোলজি নির্ধারণের চেয়ে তখন সবার প্রাণপণ চেষ্টা ছিল লক্ষ্য অর্জনের। রেজিম উৎখাতের পর শুরু হয় আন্দোলনের চরিত্র বিচার, একে কোন নামে ডাকা হবে তা নিয়ে তর্ক, কৃতিত্ব দাবি, সাফল্য আত্মস্থ করার প্রতিযোগিতা এবং বিজয়কে কোন লক্ষ্যে চালিত করা হবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা। শিক্ষার্থীরা মনে করে, কেবল একটি রেজিমের পতনের জন্য এত বড় অভ্যুত্থান হয়নি। কাজেই কেবল ক্ষমতার হাতবদল বা মুখবদল নয়, মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে। সিস্টেম পাল্টাতে হবে। আর যাতে কখনো ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচার ফিরে না আসে কিংবা নতুন ফ্যাসিবাদের জন্ম না হতে পারে তার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা করতে হবে। তারা বর্তমান সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের বীজ মনে করে তা পাল্টে ফেলে জনগণের সংবিধান রচনা করতে চান। তারা প্রজাতন্ত্র সঠিকভাবে পরিগঠিত হয়নি বলে মনে করেন। তাই নতুন করে বিন্যস্ত ও পুনর্গঠিত নিউ রিপাবলিক বা সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠা করতে চান। রাষ্ট্রের সব অর্গান ও সিস্টেমের সংস্কার চান তারা। এগুলো বিপ্লবী আকাক্সক্ষা। এসব প্রত্যাশার বাস্তবায়নকল্পে তারা জারি করতে চান বিপ্লবের প্রোক্লেমেশন। এই প্রোক্লেমেশনের মধ্য দিয়ে তারা ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানে অর্জিত বিজয়কে বিপ্লবে উন্নীত করতে চান। তারা মনে করেন, রেজিম পতনের মধ্য দিয়ে বিপ্লবের সূত্রপাত হয়েছে। সে বিপ্লব চলমান এবং এখন পর্যন্ত সেটা অসমাপ্ত। সেই আনফিনিশড রেভল্যুশনকে তারা চূড়ান্ত রূপ দিতে চান।
অপরপক্ষে ট্রাডিশনাল পলিটিক্যাল পার্টিগুলো মনে করে, রেজিম চেঞ্জের মাধ্যমে ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থান চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে সফল ও সমাপ্ত হয়েছে। এতে জীবন বাজি রেখে ছাত্র-তরুণদের অংশগ্রহণ বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। এ জন্য তাদের প্রতি ধন্যবাদ। এখন বাছারা ফিরে যাও নিজ নিজ ঘরে ও শ্রেণিকক্ষে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মূল্যায়ন, ভোটাধিকারসহ জনগণের ভোটাধিকার ছিল না। হত্যাযজ্ঞ, গুম-খুন, জুলুম-নির্যাতন, দখল-দলীয়করণ, দুর্নীতি-লুটপাট ও বিচারহীনতায় ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আন্দোলন করে রেজিম হটিয়েছে। এখন চটজলদি ইলেকশন করে জনগণের রায়ে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার কায়েম করতে হবে। সংস্কার, সুশাসন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সেই নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব। অন্তর্বর্তী সরকারের মূল কাজ হচ্ছে নিজেরা নিরপেক্ষ থেকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। রেজিম চেঞ্জকে তারা বিপ্লব বলে মানতে নারাজ। কোনো রকম বিপ্লবের দিকে যাওয়ার এক চিলতে ইচ্ছাও তাদের নেই। তাই হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর এই রাজনৈতিক নেতারা ক্যান্টনমেন্টে সামরিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাঠামো দাঁড় করায়। তাদের মাথায় ছিল তিন মাসের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদল। যারা রুটিন কিছু দায়িত্ব পালন করবে আর সুষ্ঠু একটা নির্বাচন করে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাবে।
রাজনীতিবিদদের পরিবর্তন-বিরোধী এই মানসিক গড়ন ও ভাবনাই সংবিধান বহাল রাখে, রাষ্ট্রপতি স্বপদে থাকেন এবং তার কাছে শপথ নিয়ে তারই একটা উপদেষ্টা পরিষদ গড়া হয়। শিক্ষার্থীদের জেদাজেদিতে এই পরিষদের শীর্ষে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বসাতে এবং ছাত্র প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয় তারা। শিক্ষার্থীরা তাদের শক্তির প্রয়োগে বিচার বিভাগকে ফ্যাসিবাদের কবলমুক্ত করতে কিছুটা সফল হয়। এরপর থেকে কায়েমি রাজনীতি তাদের আর কোনো উদ্যোগকেই সফল হতে দেয়নি।
ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও এ আন্দোলনে দীর্ঘ অসফল আন্দোলনের লেগাসিসহ রাজনৈতিক দলগুলোও অংশ নিয়েছে। তাদের অংশগ্রহণ এবং সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া বিজয় সম্ভব ছিল না। এখন কেবল শিক্ষার্থীরা বিজয়কে বিপ্লবের পথে নিতে পারবে না। বিপ্লবের ব্যাপারে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি এ বিপ্লবকে সফল করতে দেবে না। ফলে কী হবে? রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন হবে না। নির্বাচন হবে, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে, কিছু কসমেটিক সংস্কার হবে, ট্র্যাডিশনাল রাজনীতিই বজায় ও বহাল থাকবে। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও মেরুকরণের সেই পুরনো রসায়নই থাকবে ক্রিয়াশীল। পরিবর্তনকামী ছাত্রদের জোড়াতালি দিয়ে কিছু একটা বুঝ দেওয়া হবে। সংস্কার ও বিপ্লবের মধ্যে একটা গোঁজামিল দিয়ে তাদের বলা হবে, সব পরিবর্তন তো এক ধাপে হয় না। আপাতত এটুকুই বিপ্লব। বিপ্লবকামী শিক্ষার্থীরা মেনে নিলে ভালো। না মানলেও তাদের খুব বেশি কিছু করার থাকবে না। কারণ, রাজনৈতিক দলগুলোর সর্বাত্মক সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া ছাত্রদের নিয়োগ করা বলে ঘোষিত অন্তর্বর্তী সরকারের সফল হওয়ার উপায় নেই এবং এখন পর্যন্ত তাদের পারফরমেন্স আহামরি কিছু নয়। ফলে সরকার ও শিক্ষার্থীদের পক্ষে প্রবল শক্তি নিয়ে জনগণ দাঁড়াবে না। এ অবস্থায় এ মুহূর্তে এককভাবে বিপ্লব করে ফেলার সামর্থ্য হবে না শিক্ষার্থীদের। তার অর্থ বিপ্লব এখনো বহুত দূর। বিপ্লব হনুজ দূর অস্ত।
তাহলে কি এখানেই বিপ্লবের আকাক্সক্ষার ইতি? বিপ্লবের স্বপ্ন কি মরে যাবে? আমার তা মনে হয় না। পুরনো রাষ্ট্রকাঠামো ও রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনে না নেওয়া এবং বদলে ফেলার যে আকাক্সক্ষা ছাত্র-তরুণদের মধ্যে জন্ম নিয়েছে, তা রিলে রেসের মতো সংক্রমিত হতে থাকবে এক ব্যাচ থেকে আরেক ব্যাচের মধ্যে। এ আকাক্সক্ষা ধীরে ধীরে প্রত্যয়ে পরিণত হবে। পুরনো প্রথা-পদ্ধতির বিরুদ্ধে চলমান থাকবে তারুণ্যের দ্রোহ। প্রচলিত জীর্ণ রাজনীতি সেই অমান্যতাকে বশীভূত করতে পারবে না। হয় তাদের নিজেদের বদলে যেতে হবে, নতুবা এক সময় বিপ্লবী তরুণরা সামর্থ্য অর্জন করবে এবং খোলনলচে সমেত সবকিছু বদলে ফেলবে।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক
