প্রকল্পে হতাশা সাঁকোই ভরসা

আপডেট : ০৭ জানুয়ারি ২০২৫, ০৭:৩৫ এএম

চুক্তি অনুযায়ী খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার টিপনা-সিংগা নদীতে গার্ডার ব্রিজসহ সড়ক নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল মাত্র এক বছরে। অথচ এক বছরের কাজ শেষ হয়নি ছয় বছরেও। অর্ধেক বাস্তবায়নের পর দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ প্রকল্পের পুরো কাজই। এতে সাত গ্রামের মানুষের কৃষিপণ্যসহ নিজেদের পারাপারে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নিরুপায় এলাকাবাসী হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে চাঁদা তুলে পাশেই তৈরি করছেন কাঠ ও বাঁশের সাঁকো। এই সাঁকোই এখন তাদের ভরসা।

প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বহু যুগের পারাপারের ভোগান্তি লাঘবে টিপনা-সিংগা নদীতে গার্ডার ব্রিজ ও সড়ক নির্মাণে প্রকল্প নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ৬০ মিটার লম্বা ব্রিজ ও ৯০৫ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা। টেন্ডারে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আকন ট্রেডিং এবং মাহফুজ খান (জেভি)। ২০১৮ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মেয়াদ ছিল ২০১৯ সালের ১২ ডিসেম্বর। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে বাড়তি মেয়াদেও নির্মাণকাজে মোট অগ্রগতি ছিল মাত্র ৫০ শতাংশ। এখন নির্মাণকাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। পরে মেয়াদও বাড়েনি।

প্রকল্প এলাকায় সরেজমিন দেখা গেছে, পাইলিং ও কিছু ঢালাইয়ের কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় রোদ-বৃষ্টিতে ব্যবহৃত রডে মরিচা ধরেছে। তবে প্রকল্প এলাকায় ঠিকাদারের লোকজনকে দেখা যায়নি। পাশেই নদীতে পারাপারের জন্য সাঁকো তৈরি করছে এলাকাবাসী।

সাঁকো তৈরি কাজে নিয়োজিত সিংগা গ্রামের বাসিন্দা অমিতাভ গাইন ও রিপন গাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, উত্তরপাশে সিংগা বিলসংলগ্ন ৪ হাজার বিঘা জমির ফসল ও মাছ এই নদী পার করে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কে আসে। সেখান থেকে স্থানীয় বাজারসহ খুলনা ও ঢাকায় চলে যায়। তাই ব্রিজটি বহুদিনের দাবি ও প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই দাবি ও প্রত্যাশা অধরা থেকে যাচ্ছে। বছরের পর বছর পার হচ্ছে কিন্তু কাজ সমাপ্ত হচ্ছে না। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ে শিশুদের যাতায়াতের ডোঙাও নষ্ট হয়ে গেছে। তাই বাধ্য হয়ে এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলে সাঁকো তৈরি করা হচ্ছে।

সিংগা গ্রামের বাসিন্দা মৌমিতা রায় বলেন, গ্রামে কোনো গাড়ি আসে না। পারাপারে নৌকা ও ডোঙাই ভরসা। তাই অসুস্থ মানুষ ও গর্ভবতী মহিলাদের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে অসুবিধাই পড়তে হয়। অনেক সময় রোগী বাঁচানোই দায় হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় শিশুরা অনেক সময় ডোঙা থেকে পড়ে ভিজে বাড়ি ফিরে আসে। সেদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয় না। ফলে দুর্ভোগ ও ভোগান্তির শেষ নেই।

টিপনা গ্রামের বাসিন্দা জিয়াউল রহমান বলেন, নদী ঘিরে সাত গ্রামের মানুষ বসবাস করে। বিপুলসংখ্যক এ মানুষের যোগাযোগ ও কৃষি পণ্য বাজারজাত সহজ করতে ব্রিজের বিকল্প নেই। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রথম দিকে কিছু কাজ করে। হঠাৎ কাজ বন্ধ করে তার লোকজন চলে যায়। পরে তাদের আর কাজ ফিরতে দেখা যায়নি। চার বছর ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে খর্নিয়া ইউনিয়নের টিপনা গ্রামের ইউপি সদস্য মো. মহসিন শেখ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ায় সুফল বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। মূলত ঠিকাদারের গাভিলতি ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের মনিটরিংয়ের আভাবেই প্রকল্পে এমন করুণ দশা হয়েছে। তাই এই ব্যর্থতার দায়ে তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।

তবে এ ব্যাপারে ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম জানান, শুধুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে কাজ বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কাজ ফেলে রাখায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঠিকাদার কাজ ফের শুরু করবে বলে কথা দিয়েছে। এবার কাজ শুরু না করলে কার্যাদেশ বাতিল করা হবে। তবে ঠিকাদারের মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত