‘ন্যায়কুঞ্জ’ এখন অস্বস্তির স্থান

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৪:১০ এএম

অযত্ন-অবহেলার চিত্র কতটা, তা দেখতে হলে তাকাতে হবে চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণের ‘ন্যায়কুঞ্জ’র দিকে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১ বছর ৪ মাস আগে বিচারপ্রার্থী মানুষ ও সাক্ষীদের বিশ্রামের জন্য ৩৫ কোটি টাকায় এটি নির্মাণ করে। কিন্তু এখন এটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ন্যায়কুঞ্জের দুটি টয়লেট, ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। বিচারপ্রার্থীদের বসার অধিকাংশ চেয়ার ভাঙাচোরা। এ ছাড়া এসব চেয়ারে পড়েছে ধুলোবালির আস্তর।

সরেজমিন দেখা যায়, ‘ন্যায়কুঞ্জ’ ভবনের দুটি শৌচাগারের অবস্থা একেবারেই ব্যবহারের অযোগ্য। মলমূত্রে পুরো শৌচাগার নোংরা অবস্থায় পড়ে আছে। হাত-মুখ পরিষ্কার করার বেসিন ভাঙা ও অপরিষ্কার। শৌচাগারের পুরো ফ্লোর স্যাঁতসেঁতে। পুরুষ এবং নারীর দুটি পৃথক শৌচাগারের দরজা খুলে দেখা যায়, বন্ধ আছে পানির কল। ভাঙা সাইফুন ও বেসিন। কমোডের পাশে পড়ে আছে হাতল ভাঙা বদনা। শৌচাগার দুটির উপরিভাগে শুকনো মল জমে আছে। মুখ পরিষ্কার করার বেসিনে পানের পিকসহ নানা আবর্জনা নোংরা পড়ে আছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শৌচাগার ব্যবহার করতে এক নারী ঢোকেন ন্যায়কুঞ্জে। দরজা খুলেই শৌচাগারের ভেতরের অবস্থা দেখে বমি ভাব চলে আসে ওই নারীর। নাকে কাপড় দিয়ে দ্রুত ন্যায়কুঞ্জ ত্যাগ করেন তিনি।

এ সময় দু-তিনজন বিচারপ্রার্থীকে ন্যায়কুঞ্জের ভেতরের কয়েকটি চেয়ারে বসতে দেখা গেলেও তাদের বসার জায়গাটি ছিল শৌচাগারের দরজা থেকে অন্তত ১৫ ফুট দূরত্বে। তাদের একজন বলেন, ‘জজ কোর্টে এসেছিলাম জামিনের আবেদন করতে। আইনজীবী বললেন, একটু ঘুরে আসতে। বিশ্রামের জন্য ন্যায়কুঞ্জে প্রবেশ করেছি। প্রথমে শৌচাগারের কাছাকাছি বসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রচ- দুর্গন্ধের কারণে বসতে পারিনি। তাই একটু দূরত্বে বসলাম।’

আবদুল হাকিম নামে আরেকজন বলেন, টয়লেটে গিয়েছিলাম। কিন্তু পরিবেশ দেখে টয়লেটে ঢুকতে পারিনি।

আদালতে বিচারপ্রার্থী মানুষ ও সাক্ষীদের বিশ্রাম বা বসার তেমন ব্যবস্থা না থাকায় সারা দেশের মতো ২০২৩ সালে ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে এই ‘ন্যায়কুঞ্জ’ গড়ে তোলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। এটি দেখাশোনার দায়িত্ব জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজিরের। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, চট্টগ্রামের ন্যায়কুঞ্জে দুটি শৌচাগার ও একটি ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার তৈরি করা হলেও এসব দেখভাল বা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কাউকে রাখা হয়নি। পুরুষ শৌচাগারের পাশে থাকা একটি স্টেশনারি দোকান টেন্ডার ছাড়াই বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে এক ব্যক্তিকে ইজারা দেন জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সাবেক নাজির এনামুল হক।

স্টেশনারি দোকান করার কথা থাকলেও ইজারাদার টয়লেটের পাশেই ‘ফাস্টফুডের’ দোকান বানিয়ে নেন। উদ্বোধনের পর থেকে এক বছর পর্যন্ত বিচারপ্রার্থী মানুষের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো খাবারের দাম আদায় করতেন তিনি। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ওই ইজারাদার দোকান ফেলে চলে যান। এরপর থেকে ‘ন্যায়কুঞ্জ’ যেন অভিভাবকহীন।

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা জানান, আদালতে আসা বিচারপ্রার্থীদের আধুনিক নাগরিক সুবিধা সংবলিত নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিতের লক্ষ্যে চট্টগ্রামের নতুন ও পুরাতন আদালত ভবনের মাঝখানে ‘ন্যায়কুঞ্জ’ নির্মাণ করা হয়। দূর-দূরান্ত থেকে যারা বিচারের জন্য আসেন, দিনভর তাদের অপেক্ষা করতে হয় আদালত চত্বরে কিংবা বাইরে। রোদে পুড়ে বা বৃষ্টিতে ভিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘদিনের সেই ভোগান্তি লাঘব হতো ন্যায়কুঞ্জে। কিন্তু এটি এখন বিচারপ্রার্থীদের কাছে ‘অস্বস্তিকর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারপ্রার্থীরা এটির পাশ দিয়েও যেতে চান না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত