সেলিম আল দীনের কবিতা

প্যানোরামিক ট্রাভেলগ

আপডেট : ১৬ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০৩ এএম

সেলিম আল দীন তার রচনার কোনো একটি পঙ্ক্তিকেও গদ্যপদ্যের বাইনারি পজিশন থেকে বিচার করতেন না। তার দাবি ছিল এ দুয়ের অভেদাত্মক। অথচ তিনিই ভিন্নভাবে কবিতা, গান, নাটক, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও ডায়েরি লিখেছেন। তার মানে হলো সাহিত্যের ভিন্ন ভিন্ন জনরার প্রতি তার ‘মধ্যযুগীয় প্রত্যাখ্যান’ ততটা প্রবল ছিল না। মধ্যযুগীয় প্রত্যাখ্যান বলতে বোঝাতে চাইছি, প্রি-কলোনিয়াল বাংলা সাহিত্যের অনুপ্রেরণায় কাব্যের বাইরে কোনো সাহিত্যিক প্রচেষ্টাকে গ্রহণ না করা।

ফলে তার দাবিটা ফর্ম থেকে ন্যারো-ডাউন হয়ে ভাষায় এসে স্থিত হলো। তার বক্তব্যের সারাৎসার যা দাঁড়ায় তা হলো, সাহিত্যের ভাষামাত্রই কবিতা। আর তাই তার সব রচনাই কবিতা। এই হলো তার উচ্চাকাক্সক্ষী প্রকল্প।

এখন প্রশ্ন হলো, সেলিম আল দীনের নাটক, কবিতা-গান ও প্রবন্ধের ভাষায় তাহলে আদৌ কোনো পার্থক্য আছে কিনা? কিংবা প্রশ্নটা অন্যভাবেও তোলা যায়, ভাষা যদি একই থাকে, ফর্ম কি আর ভিন্ন হতে পারে?

এ প্রশ্নের স্পষ্ট, গাণিতিক উত্তর না দিয়ে আমরা বরং পরিস্থিতি ব্যাখ্যার আশ্রয় নেব। শিল্পসাহিত্যে সিদ্ধান্তের চেয়ে ধারণায় উপনীত হওয়া শ্রেয়। প্রথমেই আমাদের ফয়সালা করা দরকার কবিতা ও কাব্যিকতা এ দুটি জিনিস এক না অভিন্ন।

কবিতা একটি শিল্পরূপ, যার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো আছে অথবা তা নতুন একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। পক্ষান্তরে কাব্যিকতা প্রকাশভঙ্গি মাত্র। সেই বিবেচনায় কবিতার এক ধরনের দায়বদ্ধতা থাকে নিজের কাঠামো বা শর্তের প্রতি। কাব্যিকতার কোনো দায়বদ্ধতা বা প্রতিশ্রুতি নেই, চিন্তা বা অনুভূতির আত্মমুগ্ধতা ছাড়া।

কিন্তু কাব্যিকতা ধরা পড়ে কবিতার কিছু টুল বা উপকরণ ব্যবহারের আলামতে। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প, বাকস্পন্দ বা বাক্যস্রোত প্রধানত এগুলোই কাব্যিকতার আশ্রয় এবং ঠিক এ কারণেই কাব্যিকতাকেই আমরা কবিতা বলে চালিয়ে দিতে প্ররোচিত হই। একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারব, এই কাব্যিকতা ব্যাপারটা কবিতার বাইরে নানা কথকতা ও কথোপকথনে, নাটক বা উপন্যাসে যেমন থাকতে পারে, তেমনি পারে মৌখিক ভাষার বাইরে চিত্র, চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফিতেও।

সেলিম আল দীন স্পষ্টতই সারাজীবন কাঠামোকে অস্বীকার করতে করতে এগিয়েছেন। তিনি তার রচনাকে কখনোই কোনো কাঠামোর দাসত্বে উপনীত হতে দেননি। প্রবণতার দিক থেকে তিনি যে কাব্যিকতাকেই আশ্রয় করবেন, এটা খুব স্বাভাবিক। ফলে তিনি যখন কবিতা লিখতে গিয়েছেন, তখনো তিনি আসলে কাব্যিকতাই করেছেন। বলা ভালো, সেক্ষেত্রে তার রচনা কবিতার কাঠামোকে ভেঙে অন্যদিকে চলে গেছে। কোন দিকে?

তার কবিতায় মুখ্যত এক অভিযাত্রিকের সাক্ষাৎ মেলে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে তিনি ছুটে এসেছেন আজকের বাংলার সেনেরখিল গ্রামে। এবং চলেছেন শুভবোধে উদ্দীপিত মানবমুক্তির এক উজ্জ্বল ভোরের দিকে। এই শুভবোধ তাকে ব্যক্তিতান্ত্রিকতার উদযাপী আধুনিকতাবাদের বাইরে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাতারে শামিল করে রাখে। সেখানে ইতিহাস-চেতনাঋদ্ধ প্রাজ্ঞ বিদগ্ধ মন যুক্ত হতে চায় বাত্যজনের প্রাত্যহিকতার সঙ্গে। এখানে দুইটি বিপরীতমুখী টান সামলাতে গিয়ে টাল খেয়ে পড়েন সেলিম আল দীন। তার রচনায় উঠে আসে অপাঙ্ক্তেয় জনতার বুলি ও বাগভঙ্গি এবং তা যুক্ত হয় ক্ল্যাসিকাল, শাস্ত্রীয় ও বিদ্যায়তনিক বাকপ্রতিমায়। তার ভাষা হয়ে পড়ে ডিজহারোমনাইজড, ক্যাকোফোনাস। আর তাতে হোঁচট লাগে পাঠকেরও মনে।

কিন্তু এ এক অনিবার্য পরিণতি। ব্যাপারটা খোলাসা করতে আমরা একটা ট্রেন-জার্নির কথা ভাবতে পারি। যার সব দিকে স্বচ্ছ দেয়াল। ডানে-বাঁয়ে, উপরে-নিচে যেদিকেই দৃষ্টি যায় কেবলই দৃশ্য, প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন দৃশ্যের জন্ম হচ্ছে কখনো নদী, পাহাড়, কখনো অরণ্য, শস্যক্ষেত্র, কোথাও বৃষ্টি, কোথাও আগুন। সিঙ্গেল ইফেক্ট বলে কিছু নেই। বহুবিচিত্রের সমাবেশ, সমারোহ যা একই সঙ্গে অপস্রিয়মান ও জায়মান। একটির সঙ্গে আরেকটির ভাবগত, চিন্তাগত ঐক্য নেই। এই আদিগন্ত অনৈক্যকে যখন একটি ঐক্যসূত্রে আমরা বাঁধতে চাইব, তা অসমঞ্জস ও বিসদৃশ হতে বাধ্য। সেটাই এই বাস্তবতার সৌন্দর্য।

সেলিম আল দীনের রচনাও তেমনি সমগ্রতাস্পর্শী, অখন্ড ম-লাকার। ছিন্ন-খন্ড, চিলতে চিলেকোঠায় এক টুকরো আলো সে নয়। অনন্ত নীলাকাশগামী দৃষ্টিপাত যেন। এজন্য তার শিল্পপ্রয়াসকে আমরা বলতে পারি ‘প্যানোরামিক ট্রাভেলগ’। যে কোনো বস্তু বা চিন্তাকে যা দৃশ্যমান করে তুলতে চায় চারপাশ থেকে। তার রচনার ভেতর দিয়ে আমাদের এক প্রকার প্যানোরামিক ট্যুর হয়ে যায়। স্থানকালের সীমা পার হয়ে ভার্চুয়ালি আমরা হয়ে উঠি তার আলেখ্যের সঙ্গী।

একটি উদাহরণ দিয়ে আলোচনায় ইতি টানব। উদাহরণটা নেওয়া যেত কবি ও তিমি বই থেকে। কিন্তু এখানে উদ্ধৃত করছি হাদ হদাই নাটকের ‘প্রস্তাবনা’-র অংশবিশেষ। তাতে কোনো ইতর-বিশেষ হবে না বলেই আমাদের বিশ্বাস।

‘অবশেষে পৌঁছে গেছি দক্ষিণের সমুদ্রকূলে। আশ্বিনে মৌসুমি বায়ুর শরীরে লেগেছে উত্তরের কুয়াশাকণা। তার ভাটি স্রোতের স্তরে স্তরে মন্থরতার সুগন্ধ। দুধাল চরের বালু ঝুরঝুর হঠাৎ পেয়ে বসে খামখা বাতাস উড়ে যায় এক মুঠো। মোহনার খোল থেকে ঝলকে আসা নোনা গন্ধে নাসারন্ধ্র ভরে যায়। বিশাল চরের মধ্যিখানে একা দাঁড়িয়ে চরের হাতের তালুতে তালুতে ভাগ্যরেখা অজস্র শীর্ণ খালের। আমার পায়ের লোদকাদা শুকিয়ে এসেছে দুর্ধর্ষ সামুদ্রিক জীবনের জলকাদা।

এখানে সমুদ্রসম্ভূত মানবের তীর্থ তার পথে পথে জোয়ারভাটার সর্পক্ষত।

ঐ যে দূরে একটা পলিমাটির ঢিবি এক জোড়া সমুদ্র-ইগল গতরাতের মৃত ভেড়ার কোনো ভ্রুণ বাঁকা চঞ্চুতে ঠুকরে ঠুকরে খায়। দীর্ঘ পাখা মেলে উড়ে যাবে আহার শেষে কিন্তু সে পাখার ছায়ার নিচে তোমার মনের শঙ্কা কিছুতেই কাটবে না।

মৃত্যু এখানে এত ঘনিষ্ঠ হাত ধরাধরি করে চলে যে তোমার সুপেয় পানির দেশের মন উপকূল ছেড়ে বেরোবার রাস্তাটি খুঁজবে। কিন্তু ততক্ষণে নেমে আসে সন্ধ্যা। ভরা কাটালের চাঁদ এসে তার আলোয় সমগ্র উপকূলের দুধসাদা চরকে রূপান্তরিত করবে এক কুহকের দেশে।....

তারপর তোমাকে খুব পছন্দ হলে সে রাতেই একটু সুপুষ্ট ভেড়া জবাই হবে। হাতে হাতে উঠে আসবে উপকূলীয় নারীর নিপুণ হাতে বানানো গোল গোল রুটির চাঁদিমা। উঠানের চারপাশে নেচে নেচে গাইবে এখন বয়াতি কোনো এক পীর অথবা সমুদ্র-নবীর গান।

কিংবা সে বৃদ্ধ শোনাবে সমুদ্রভ্রমণের নতুন কোনো গল্প। সে তার জীবনের শোক থেকে জরা থেকে বেহিসাবি নাবিকের বেপরোয়া ব্যয় থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে কয়েকটি অডিসি’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত