লাভ হয়নি ইসরায়েলের ক্ষতি হামাসেরও

১৫ মাস পর যুদ্ধবিরতি

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:২০ এএম

১৫ মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসান ঘটাতে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও জিম্মি মুক্তি নিয়ে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতার। আগামী ১৯ জানুয়ারি থেকে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার কথা। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের মন্ত্রিসভা চুক্তিটি অনুমোদন করার কথা ছিল। তবে হামাস চুক্তির কিছু শর্ত না মানার অভিযোগ তুলে সে বৈঠকটি স্থগিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যদিও হামাস নেতানিয়াহুর অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করে চুক্তির শর্ত পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকার কথা জানিয়েছে। বিশ্বের অবহেলিত ছিটমহলটিতে সংঘাত বন্ধ ও শান্তি ফেরাতে এই চুক্তিটি আশার আলো দেখাচ্ছে। এমনকি অতীতের যেকোনো সময়ের থেকে এবারই হামাস-ইসরায়েল দুই পক্ষই চুক্তির পক্ষে নিজের অবস্থান দেখিয়েছেন। ফলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উদ্ভূত এই প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে চুক্তিটি সফলভাবে কার্যকর হবে। আর তেমনটা হলে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ হবে গাজা উপত্যকায়।

চুক্তিতে কী আছে

তিন ধাপে এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথম ধাপে, যুদ্ধবিরতি শুরুর ৪২ দিনের মধ্যে ৩৩ জন ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দেবে হামাস। বেসামরিক নারী এবং নারী সেনা, শিশু, বয়স্ক ও বেসামরিক লোকজন যারা অসুস্থ ও আহত, তাদের প্রথমে মুক্তি দেওয়া হবে। অন্যদিকে ইসরায়েল প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে। যার মধ্যে দীর্ঘ কারাদ- পাওয়া ব্যক্তিরাও থাকবেন। ইসরায়েলি বাহিনী গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে পূর্ব দিকে সরে যাবে। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা ঘরে ফিরতে পারবেন এবং প্রতিদিন শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাবে। যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপের আলোচনা শুর হবে ১৬তম দিনে। এই ধাপে বাকি জিম্মিদের মুক্তি, ইসরায়েলি সেনাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে গাজার পুনর্গঠন এবং যেকোনো জিম্মির মৃতদেহ ফেরত দেওয়ার কাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। তবে গাজার পুনর্গঠন সম্পন্ন হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।

কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুল রহমান আল থানি বলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপের আলোচনার জন্য একটি পরিষ্কার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে। চুক্তির বিস্তারিত আগামী কয়েক দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে। তিনি আরও বলেন, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র ও মিসর যৌথভাবে ইসরায়েল ও হামাসকে তাদের দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার জন্য কাজ করবে। এটিকে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পরিণত করা হবে বলেও জানান তিনি।

ইসরায়েলের লাভ-ক্ষতি

হামাসের বিরুদ্ধে এই দীর্ঘ যুদ্ধে ইসরায়েল কৌশলগতভাবে নানা সাফল্য অর্জন করার দাবি করতে পারে। ইসমাইল হানিয়া-ইয়াহিয়া সিনওয়ারসহ হামাসের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেই সঙ্গে তাদের মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহর ওপর ব্যাপক অভিযান চালিয়ে সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসারাল্লাহকে হত্যাসহ তাদের অবকাঠামো ধ্বংস করেছে তেল আবিব। এমনকি ইরানের সঙ্গেও প্রকাশ্য সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসরায়েল। তবে দখলদার দেশটি তাদের প্রধান দুই লক্ষ্য হাসিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো হামাসকে নির্মূল করা। অন্যটি হামাসের হাতে জিম্মি ব্যক্তিদের ইসরায়েলে ফেরত আনা। গাজায় বিরামহীন নিষ্ঠুর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ইসরায়েল ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনটিকে অনেকটাই দুর্বল করতে পেরেছে, কিন্তু তারা আজও টিকে আছে। আবার গাজায় আটক জিম্মিদের কেউ কেউ ইসরায়েলি বাহিনীর হামলাতেই নিহত হয়েছেন। কাউকে কাউকে হামাস নিজে থেকে মুক্তি দিয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে ইসরায়েলি সেনাদের অগ্রযাত্রার মুখে কিছু জিম্মিকে হামাস হত্যা করেছে।

তবে নেতানিয়াহু হামাসের সঙ্গে যুদ্ধে সার্বিক বিজয় ও গাজা থেকে সব জিম্মিকে দেশে ফেরানোর যে অঙ্গীকার করেছিলেন সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। উল্টো দেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সমালোচকদের অভিযোগ, জিম্মিদের দ্রুত ফিরিয়ে আনার বদলে তিনি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে চলেছেন।

হামাসের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ

ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলার মধ্য দিয়ে ছিল ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা ও স্বাধীনতার ইস্যুকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিগোচরে নিয়ে আসতে চেয়েছিল হামাস। ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে হামাস তাদের প্রত্যাশিত ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়তে পেরেছে। তবে এর জন্য চুকাতে হয়েছে চরম মূল্য। গাজায় ইসরায়েলের তা-বে কোনো পরিবারের সবাই নিহত হয়েছেন, কেউ স্বামী-সন্তান-বাবা হারিয়েছেন, বাড়ির পর বাড়ি-স্কুল-হাসপাতাল ধ্বংস হয়েছে। সব মিলিয়ে নিহত ৪৬ হাজার মানুষ। তাদের বড় অংশই নারী ও শিশু। আর এ উপত্যকা পরিণত হয়েছে এক নরকপুরিতে।

জাতিসংঘ বলছে, ১৫ মাসের গাজার ২৩ লাখ বাসিন্দার ১৯ লাখই যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শতকরা হিসেবে যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ। বাস্তুচ্যুত এসব মানুষের একটি বড় অংশ ক্ষুধা ও রোগের সঙ্গে লড়াই করছে। শরণার্থী শিবিরগুলোতে অস্থায়ী তাঁবুতে ভীষণ রকমের অস্বাস্থ্যকর ও মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েলের আগ্রাসন ও হামলায় গাজায় হামাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হারানোর পাশাপাশি সামরিক সক্ষমতাও কমেছে হামাসের। ধ্বংস হয়ে গেছে বেশ কয়েকটি ভূগর্ভস্থ টানেল। হামাসের রকেটের মজুদও অনেকটা ফুরিয়ে এসেছে। তবুও ধ্বসংস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছে হামাস। প্রাণঘাতী হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর। দৃশ্যত হামাসকে শেষ করা ইসরায়েলের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে যাওয়া ও দেশটির কারাগার থেকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্ত করে আনার পর সংগঠনটির জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে পারে। উনিশ শতকের আটের দশকে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সশস্ত্র সংগঠন হামাস ফিলিস্তিনি সমাজের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গেছে। গাজা ছাড়াও তার শক্ত উপস্থিতি রয়েছে পশ্চিম তীর ও লেবাননের শরণার্থীশিবিরগুলোতে।

চুক্তির কৃতিত্ব নিয়ে টানাটানি

যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয়ই এই চুক্তিকে নিজের কৃতিত্ব বলে দাবি করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হওয়ার কিছুটা কৃতিত্ব পাওয়ার দাবিদার ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কয়েক দিন আগে হওয়া চুক্তিটিকে বিদায়ী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য এক তিতা-মিঠা বিজয় বলে মনে করা হচ্ছে। বাইডেন গত ৩১ মে সর্বপ্রথম ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে চুক্তির রূপরেখা প্রস্তাব করেছিলেন। তবে এই ব্যাপারে কয়েক দফায় কূটনৈতিক তৎপরতা নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়।

বিশ্বনেতাদের প্রতিক্রিয়া

গাজায় যুদ্ধবিরতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিশ্বনেতারা। কাতারের প্রধানমন্ত্রী আল থানি বলেন, আমরা আশা করি, এটি হবে যুদ্ধের শেষ অধ্যায়। আমরা প্রত্যাশা করি, সব পক্ষ এই চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে। জাতিসংঘের মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতিসংঘ এই চুক্তি বাস্তবায়নে সমর্থন করতে এবং এখনো ভোগান্তিতে থাকা অগণিত ফিলিস্তিনির জন্য টেকসই মানবিক ত্রাণ সরবরাহ বাড়াতে প্রস্তুত। এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রেসিডেন্ট মির্জানা স্পোলজারিক বলেছেন, আমরা আশা করি এই চুক্তি একটি নতুনের সূচনা করবে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লিয়েনও চুক্তিটিকে নতুন দিনের শুরু হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, জার্মানি, ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেনসহ অধিকাংশ দেশের প্রধানই চুক্তিটিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে হামাসের আরেক মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণে ইসরায়েলে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হয় ও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল হামাসকে ধ্বংসের জন্য গাজায় সামরিক অভিযান শুরু করে। তার জবাবে গাজায় সর্বাত্মক আগ্রাসনে মৃত্যু হয়েছে ৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষ। অধিকাংশই বাস্তুহারা হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য, জ¦ালানি, ওষুধ ও আবাসনের মারাত্মক সংকট দেখা গিয়েছে। মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। এখন অপেক্ষা সব প্রতিবন্ধকতা উতরে চুক্তিটির আলোর মুখ দেখার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত