উচ্চফলনশীল সবজি ক্যাপসিকাম চাষ করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের ৩০ জন কৃষক। এই মৌসুমে তারা ইউনিয়নের নিয়ামতবাড়িয়া গ্রামের মাঠপাড়ায় প্রায় দশ বিঘা জমিতে ‘ইন্দ্রা গোল্ড’ জাতের ক্যাপসিকাম চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা দরে প্রায় দুই হাজার কেজি ক্যাপসিকাম তিন লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ক্যাপসিকাম চাষ থেকে খরচ বাদ দিয়ে ১৪ লক্ষাধিক টাকা লাভ হবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। গাছে ভালো ফল ধরায় এবং লাভজনক চাষ হওয়ায় ক্যাপসিকামে স্বপ্ন বুনছেন অন্য কৃষকরাও। কৃষক লিখন আলী জানান, জমির ইজারা, চারা, সার, পরিচর্চাসহ দশ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষে তাদের খরচ হয়েছে প্রায় দশ লাখ টাকা। গত সাত দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ক্যাপসিকাম তুলেছেন। প্রতি কেজি ক্যাপসিকাম পাইকারি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে তিন লাখ টাকা বিক্রি করেছেন। জমিতে যে পরিমাণ ক্যাপসিকাম হচ্ছে তাতে উৎপাদন আগামী দুই মাসে আরও প্রায় ১৪ হাজার কেজির প্রত্যাশা করছেন। এতে অনায়াসেই ২১ থেকে ২২ লাখ টাকার ক্যাপসিকাম বিক্রি সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদী।
জানা গেছে, চাঁদপুর ইউনিয়নে জংগলী আধুনিক কৃষি সমবায় সমিতি নামে কৃষকদের একটি সংগঠন রয়েছে। সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন খসরু ২০২৪ সালে কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে দুই বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষ করেন। সে বছর চাষে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি প্রায় চার লাখ টাকা মুনাফা পান। এতে ক্যাপসিকাম চাষে আগ্রহ বাড়ে সমিতির অন্য সদস্যদের মধ্যে। তাদের মধ্যে ৩০ জন নানা বয়সী কৃষক রয়েছেন। যারা যশোর অঞ্চলের টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় নিয়ামতবাড়িয়া মাঠপাড়া এলাকায় দশ বিঘা জমিতে নিরাপদ উচ্চফলনশীল সবজি ‘ইন্দ্রা গোল্ড’ জাতের ক্যাপসিকাম চাষ করেন। ১২০ দিন জীবনকালের এ সবজির চারা রোপণের ৬০ দিনের মাথায় ফল দেওয়া শুরু হয়েছে।
মাঠপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, পাকা সড়ক ঘেঁষে নিয়ামতবাড়িয়া মাঠপাড়া এলাকা। চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে মালচিং পদ্ধতিতে ক্যাপসিকাম চাষ করা হয়েছে। সবুজ গাছে ঝুলছে ক্যাপসিকাম। ৪ থেকে ৫ জন করে কৃষকরা দল বেঁধে ক্যাপসিকাম তুলছেন, কেউ পরিষ্কার করছেন। কেউবা আধুনিক যন্ত্রে পরিমাপ করে প্যাকেট করছেন বাজারে নেওয়ার জন্য।
ষাটোর্ধ্ব কৃষক মুন্সী মো. তরিকুল ইসলাম জানান, প্রথমবারের মতো ক্যাপসিকাম চাষ করা হয়েছে। গাছে প্রচুর ক্যাপসিকাম দেখে খুব ভালো লাগছে। বাজারে ভালো দাম থাকায় ভালো লাভের আশা করছি।
ধান, পাট, পেঁয়াজসহ অন্যান্য চাষাবাদের পাশাপাশি এ বছর ৩০ জন মিলে ক্যাপসিকাম চাষ করেছি। গেল সাত দিন ধরে ক্যাপসিকাম তুলে কুষ্টিয়া, রাজশাহী, পাবনা, খুলনা ও ঢাকাতে বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানান কৃষক গোলাম মোস্তফা। সমিতির অন্যতম সদস্য নজরুল ইসলাম বলেন, আগামী দুমাস ধরে ক্যাপসিকাম পাওয়া যাবে। এরপর আধুনিক জাতের পেঁপের চারা রোপণ করবেন।
বিদেশি সবজি চাষের খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন কুষ্টিয়া ইবি থানার মৃত্তিকাপাড়া এলাকার কৃষক আতিয়ার রহমান। তিনি বলেন, গাছে রোগবালাই নেই, মালচিং পদ্ধতিতে বিষমুক্ত চাষাবাদ হয়েছে। দেখে শুনে খুব ভালো লাগছে। আগামীতে তিন বিঘা জমিতে চাষ করব।
জংগলী আধুনিক কৃষি সমবায় সমিতির সভাপতি ইলিয়াস হোসেন খসরু বলেন, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে গত বছর দুই বিঘা জমিতে প্রথম ক্যাপসিকাম চাষ করেছিলাম। এতে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা খরচে প্রায় চার লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। আমার দেখাদেখি সমিতির অন্য সদস্যদের আগ্রহ বাড়ে এ চাষে। সে জন্য এ বছর ৩০ জন মিলে ১০ বিঘা জমিতে চাষ করেছি। আগামী বছর ২৫ বিঘা জমিতে ক্যাপসিকাম চাষের পরিকল্পনা রয়েছে। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একদল কৃষক উচ্চমূল্যের সবজি ক্যাপসিকাম চাষ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। কৃষি অফিসের পরামর্শ, উপকরণ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকরা প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা খরচ করে ২৪ লাখ টাকার ক্যাপসিকাম বিক্রির স্বপ্ন দেখছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, উচ্চমূল্যের সবজি ও ফসল চাষাবাদে যশোর টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের পরামর্শ, উপকরণ প্রদান ও প্রশিক্ষণের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
