বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে নবযুগের সন্ধিক্ষণে। জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তিগত বিপ্লব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য মোকাবিলার লক্ষ্যে ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণাটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল বিজয়ী অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনুস ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ ধারণার মাধ্যমে একটি সুন্দর, সমতাভিত্তিক ও টেকসই সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিঃসরণ এমন এক আদর্শ পৃথিবী তৈরি করতে পারে, যেখানে উন্নয়নের অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হবে। এই ধারণাটি একটি সম্ভাবনাময় পৃথিবীর রচনা করবে যেখানে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন শূন্যীকরণ নিশ্চিত হবে। এই ধারণার সফলতার মূল চাবিকাঠি হলো একটি আধুনিক, সমতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নতুন বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপান্তরই কেবল তিন শূন্যের পৃথিবীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন বেকারত্ব দূর করার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সুশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির বদলে এক অদক্ষ কিন্তু সনদধারী বেকার শ্রেণি সৃষ্টি করে চলেছে। অন্যদিকে মানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি পূরণে বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে প্রতি বছর দেশ থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। একদিকে অদক্ষ বিশাল বেকার শ্রেণির চাপ, অন্যদিকে দক্ষ কর্মীর অভাব এই বিপরীতমুখী অবস্থান বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অদূরদর্শিতা, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র প্রকটভাবে তুলে ধরে।
তিন শূন্যের পৃথিবী বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তর প্রয়োজন। বইকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে বাস্তবমুখী, প্রযুক্তিনির্ভর এবং টেকসই উন্নয়ন-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ ও নবায়নযোগ্য শক্তি শিক্ষার অংশ করার জন্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে পাঠ্যক্রমে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পরিবেশগত সচেতনতা এবং নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব শেখানো জরুরি। শিক্ষার্থীদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার এবং উদ্ভাবনে উৎসাহী করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় সবুজ প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করে তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। কেননা প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের জন্য অপরিহার্য। তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, রোবটিক্স এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি শেখানো অপরিহার্য। ভার্চুয়াল ল্যাব এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স চালু রয়েছে। যেগুলোর কর্মক্ষেত্র খুবই সংকুচিত কিংবা নেই বললেই চলে। এক কথায়, সেগুলো জীবন ও কর্মোপযোগী নয়। উচ্চশিক্ষিত বেকার সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই কোর্সগুলোর ভূমিকা বিশাল। সুতরাং এই কোর্সগুলো বন্ধ করে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে কর্মমুখী বিভিন্ন ধরনের স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু করলে দক্ষ কর্মী সৃষ্টি হবে এবং শিক্ষিত বেকারের হার কমে আসবে। প্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসা, আইন, টেক্সটাইল, নার্সিং, ফাইন আর্টস, মেরিটাইম ও এভিয়েশনসহ বিভিন্ন পেশাদারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের না হলে বিদেশিদের ওপর নির্ভরতা কমবে না এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগও বন্ধ হবে না। বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে গেলে, উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা যেমন দরকার তেমনি তাদের মাইক্রোফিন্যান্স অর্থাৎ ছোট পুঁজিতে বড় উদ্যোগ গ্রহণের কৌশল শেখাতে হবে। শিক্ষার মাধ্যমে দরিদ্র দূরীকরণে সামাজিক ব্যবসার কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা দেওয়া প্রয়োজন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের চর্চা দেশের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য একটি শর্ত। তাই পাঠ্যক্রমে নৈতিকতা এবং সহমর্মিতার গুরুত্ব তুলে ধরে দরিদ্রতা দূরীকরণ ও সামাজিক বৈষম্য কমাতে শিক্ষার্থীদের সামাজিক প্রকল্পে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তত শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা ছাড়া দারিদ্র্য কিংবা বেকারত্বের শূন্যীকরণ সম্ভব নয়। সবার জন্য সমান শিক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও নারীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা ক্ষেত্রে আরও একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন প্রয়োজন। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কারিগরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো দরকার। তাহলে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত হবে। মানুষ গড়ার কারিগরদের সম্মান ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা মেধাবী শিক্ষক পাবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে এবং সঠিক পথপ্রদর্শনে আরও একধাপ এগিয়ে দিতে সাহায্য করবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং তাদের জবাবদিহির মধ্যে নিয়ে এসে শিক্ষা ক্ষেত্রে এসব পরিবর্তনের ফলে তিন শূন্যের পৃথিবী রচনার পথ প্রশস্ত হবে। যে উদ্দেশ্যে তিন শূন্যের পৃথিবী ধারণাটি প্রবর্তন করা হয়েছিল, বাংলাদেশ সেদিকে এগিয়ে যাবে। তখন পরিবেশবান্ধব, ন্যায়সংগত এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক এক পৃথিবী নির্মিত হবে, যেখানে মানুষ দারিদ্র্য ও বেকারত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত হয়ে কার্বন দূষণের অন্ধকার দূর করবে এবং নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত হবে। সর্বোপরি তিন শূন্যের পৃথিবী নির্মাণ কখনোই একক কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজ, রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান এবং তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে তিন শূন্যের পৃথিবী রচিত হলেই লক্ষ্যগুলো সফলভাবে অর্জিত হবে। তখনই এই বাস্তব ধারণার সুষ্ঠু প্রয়োগ দেশকে নিয়ে যাবে উন্নতির নতুন দিগন্তে। তিন শূন্যের পৃথিবীর হাত ধরেই আমরা যেতে চাই পূর্ণতার দিকে।
লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ ইডেন মহিলা কলেজ
