পাহাড়ের লালমাটিতে কালো থাবা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ০৬:১৪ এএম

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবাধে চলছে লালমাটির টিলা কাটার মহোৎসব। মাটি খেকোদের ভেকুর (মাটি কাটার যন্ত্র) থাবায় প্রতিনিয়ত ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে লালমাটির পাহাড়। রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সক্রিয় হয় মাটি ব্যবসায়ীরা। নির্বিচারে মাটি কাটায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে পাহাড় ও কৃষিজমি। হুমকির মুখে পড়ছে জীববৈচিত্র্য। এই কার্যক্রম বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে করছে জরিমানা, দেওয়া হচ্ছে জেল। তারপরও থামানো যাচ্ছে না মাটি কাটা। স্থানীয়দের অভিযোগ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এসব মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী একটি মহল।

জানা যায়, উপজেলার পূর্বে এক তৃতীয়াংশ এলাকা জুড়ে রয়েছে বিশাল পাহাড়ি বনাঞ্চল। রাতের আঁধারে মাটি খেকোরা এক্সকাভেটর (ভেকু) দিয়ে পাহাড়ি লালমাটি ও ফসলি জমি কেটে বাড়িঘর নির্মাণ ও ইটভাটায় বিক্রি করছে। প্রশাসনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ভেকু দিয়ে সন্ধানপুর ইউনিয়নের ফকিরবাড়ি, গিলাবড়ি, ধলাপাড়া, বড় মেধাগ্রাম, হরিনাচালা, রসুলপুর ইউনিয়নের ঘোড়ার টেকি, সংগ্রামপুর ইউনিয়নের কাউটেনগর, কামারচার, বোয়ালীচালাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় প্রতি রাতেই অবৈধভাবে ১০-১৫ ফুট গর্ত করে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ট্রাক দিয়ে মাটি নেওয়ার সময় গ্রামীণ জনপথ এবং পাকা রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। খানাখন্দের সৃষ্টি হওয়ায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে এসব রাস্তা। রাস্তার ধুলায় প্রলেপ পড়ে যায় দোকানপাট ও বসতবাড়ির ঘরের ভেতর। এতে অনেকেই সর্দি-কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছে। ফলে পরিবেশের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে স্থানীয়দের।

এলাকাবাসী জানান, উপজেলার ঝড়কা থেকে টিলার কোল ঘেঁষে প্রায় ১০ কিলোমিটার পাকা সড়ক চলে গেছে দেওপাড়া বাজার পর্যন্ত। এ রাস্তার পাশেই ছিল ৫০-৬০ ফুট উঁচু বেশ কিছু টিলা। গত দু-তিন বছরে এসব টিলা কেটে ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে। গত তিন বছরে উপজেলার দেওপাড়া, চেচুয়াপাড়া, ঘোড়ামারা, সিংহেরচালা, খাগড়াটা, বারইপাড়া, নলমা, কুশারিয়া, চেড়াভাঙ্গা, কাজলা, শালিয়াবহ, সরাবাড়ী ও বগা এলাকার টিলাও কেটে ধ্বংস করা হয়েছে।

উপজেলার কালিকাপুর গ্রামের কৃষক মাইন উদ্দিন, রসুলপুর গ্রামের রিফাত ইসলাম ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই উপজেলায় শতাধিক মাটি ব্যবসায়ী রয়েছেন। তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে ফসলি জমি ও লালমাটি কাটার সঙ্গে জড়িত। তারা স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি করেন। তারা এসব মাটি কেটে বিক্রি করছেন বসতবাড়িসহ স্থানীয় ইটভাটার মালিকদের কাছে।

সংগ্রামপুর ইউনিয়নের নলমা গ্রামের অটোচালক মুজাফফর আলী বলেন, ‘টিলা এবং জমি থেকে মাটি কেটে রাস্তা দিয়ে নেওয়ার ফলে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাস্তায় চলাচলে তৈরি হয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। যানবাহন এসব গর্তে পড়লে মারাত্মক দুর্ঘটনায় শিকার হতে হয়।

রসুলপুর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মর্তুজ আলী বলেন, ‘লালমাটি ও ফসলি জমি কাটা বন্ধে আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঘাটাইল ধলাপাড়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা ওয়াদুদুর রহমান বলেন, ‘কেউ বন বিভাগের জমি থেকে লালমাটি কাটলে আমরা জানার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিন আক্তার বলেন, ‘গত কয়েক দিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পাঁচটি ভেকু থেকে ১০টি ব্যাটারি জব্দ করা হয়েছে। তথ্য পেলে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত