অচলাবস্থা কাটিয়ে গতকাল সোমবার যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলে ফিরতে শুরু করেছে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে আরও ছয় বন্দি মুক্ত করার চুক্তি হওয়ার পর সকালে সড়ক থেকে অবরোধ সরিয়ে নেয় ইসরায়েলি বাহিনী। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, সোমবার সকাল থেকে উত্তর গাজা অভিমুখে ফিলিস্তিনিদের ঢল নেমেছে। বাস্তুচ্যুত এ জনগোষ্ঠীর সিংহভাগই হেঁটে সেখানে যাচ্ছে। তবে যারা স্থলপথে গাড়িতে করে গাজায় প্রবেশ করেছে তাদের গাজায় প্রবেশ করতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। নানা জায়গায় ইসরায়েলি চেকপয়েন্টে সড়কপথে যাওয়া প্রতিটি বাহন ও ব্যক্তিকে তীব্র তল্লাশির ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে।
উপত্যকাটিতে যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গত সপ্তাহের শেষেই উত্তরাঞ্চলীয় গাজার অধিবাসীদের প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসে ইসরায়েল। তাদের অভিযোগ, বেসামরিক নারী ইয়েহুদকে মুক্তি না দিয়ে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেছে হামাস। ফলে বাড়ি ফিরতে চাওয়া ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে বাধা দিচ্ছিল ইসরায়েলি বাহিনী। রবিবার রাতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, হামাস দাবি মেনে নেওয়ায় উত্তর গাজায় প্রবেশ করতে পারবে ফিলিস্তিনিরা।
স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে গাজার মধ্যাঞ্চলের নেটজারিম করিডর খুলে দেওয়ার পর থেকেই উত্তর গাজা অভিমুখে ফিলিস্তিনিদের ঢল নামে। সড়ক উন্মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে যেতেই আশ্রয়শিবিরে থাকা বাস্তচ্যুত ফিলিস্তিনিরা কান্নায় ভেঙে পড়ে। এ করিডর গাজার উত্তর ও দক্ষিণ অংশের সংযোগকারী প্রধান চেকপয়েন্ট। গাজার নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, ক্রসিং খুলে দেওয়ার পর প্রথম দুই ঘণ্টায় অন্তত দুই লাখ ফিলিস্তিনি গাজার উত্তরাঞ্চলে প্রবেশ করেছে। যাদের বেশিরভাগই উপকূলীয় সড়ক ধরে মালামালসহ উত্তর গাজায় ফিরেছে। গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা ইব্রাহিম আবু হাসসেরা এএফপিকে বলেন, নিজের ঘরে ফেরা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রিয়জনদের কাছে ফেরার অনুভূতি অন্যরকম। ফিলিস্তিনিদের এ প্রত্যাবর্তনকে বিজয় বলে আখ্যা দিয়ে হামাস বলেছে, এর মাধ্যমে গাজা অধিগ্রহণ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা ব্যর্থ হলো।
এদিকে, ট্রাম্পের দেওয়া গাজা খালি করার প্রস্তাব নাকচ করেছে জর্ডান ও মিসর। ট্রাম্পের প্রস্তাবের প্রতিক্রিয়ায় জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইমান সাফাদি বলেন, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির ব্যাপারে আমাদের অবস্থান কঠোর এবং অপরিবর্তিত। জর্ডান জর্ডানীয়দের জন্য আর ফিলিস্তিন ফিলিস্তিনিদের জন্য। মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের অখণ্ডতার অধিকার লঙ্ঘন করার যেকোনো প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করে মিসর। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে আরব লিগও। এক বিবৃতিতে জোটটি বলেছে, ফিলিস্তিনি জনগণকে তাদের ভূমি থেকে উৎখাত করার যেকোনো প্রচেষ্টা কেবল জাতিগত নিধন বলেই অভিহিত করা সম্ভব। এর আগে রবিবার ট্রাম্পের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার শপথ নিয়েছিলেন ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। একই শপথ নিয়েছে দেশটির স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসও। দলটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য বাসেম নাইম এএফপিকে বলেন, কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও বিকল্প স্বদেশ দেওয়ার পরিকল্পনাগুলো তারা প্রতিহত করেছেন। এ পরিকল্পনাকেও ফিলিস্তিনিরা সেভাবেই প্রতিহত করবে।
গাজা ছেড়ে যাওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল সৃষ্টির সময় হওয়া ‘নাকবা’র স্মৃতি উসকে দেবে। তখন ইসরায়েল রাষ্ট্র তৈরির জন্য লাখো ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছিল। গাজার বাস্তুচ্যুত বাসিন্দা রাশাদ আল নাজি এএফপিকে বলেন, ট্রাম্প ও পুরো বিশ্বকে বলতে চাইÑ আপনারা যত কিছুই করুন না কেন, আমরা ফিলিস্তিন বা গাজা ছাড়ব না।
অন্যদিকে, আরও ছয় বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার কথা জানিয়েছে হামাস। তাদের মধ্যে তিনজন মুক্তি পাবেন বৃহস্পতিবার। মুক্তি পেতে যাওয়া তিন জিম্মি হলেন বেসামরিক মানুষ আরবেল ইয়েহুদ, সেনা আগাম বার্গার ও আরও একজন জিম্মি। এর মধ্যে ইয়েহুদ ইসরায়েলের পাশাপাশি জার্মানিরও নাগরিক। নেতানিয়াহুর অফিস জানিয়েছে, বাকি তিনজন জিম্মি আগামী শনিবার মুক্তি পাবে। সেই সঙ্গে লেবানন-ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় বেড়েছে। এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, চলতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চালু থাকবে।