বাঘের গায়ে শীত ফিরুক

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০২:৩৩ এএম

কথায় আছে, বাঘের শীত মাঘে পড়ে। অর্থাৎ মাঘে প্রচন্ড শীত পড়ে। কিন্তু এবার তেমন শীত আমরা পড়তে দেখলাম না। আমরা দুটি শব্দ ব্যবহার করি। শব্দ দুটি হলো জলবায়ু আর আবহাওয়া। জলবায়ু হলো গত তিন দশকের আবহাওয়ার গড় অবস্থা। তিন দশকের আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য নিলে দেখতে পাব তার মধ্যে কিছু নিয়ম আছে। যেমন আষাঢ়-শ্রাবণে প্রচুর বৃষ্টি হয়, পৌষ-মাঘে প্রচন্ড শীত পড়ে। এগুলোকে কেন্দ্র করে অনেক ধরনের প্রচলিত জ্ঞান, প্রবাদ-প্রবচন চালু আছে। যেমন একটি খনার বচন উনো বর্ষায় দুনো শীত। অর্থাৎ যে বছর বৃষ্টি কম হবে সে বছর শীত বেশি পড়বে। এ বছর বৃষ্টি কম হয়েছে। তাহলে তো শীত বেশি পড়বে। কিন্তু শীত তেমন পড়ল না।

দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এবারের শীতকাল এতই উষ্ণ ছিল যে, গত ১৬ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এবারের শীতে। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শ্রীমঙ্গলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছিল। এরপর থেকে জানুয়ারিতে তাপমাত্রার পারদ আর বাড়েনি। কিন্তু দেশের শীতলতম মাসখ্যাত জানুয়ারিতে এবার গত ১০ জানুয়ারি তেঁতুলিয়ায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০০৯ সালের পর জানুয়ারিতে দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি নির্দেশ করছে। কিন্তু আবহাওয়ায় এই পরিবর্তন কেন? গত বছর একটানা ২৩ দিন শৈত্যপ্রবাহ ছিল দেশ জুড়ে। এবার হঠাৎ করে তাপমাত্রার পারদ বেশি বেড়ে গেল কেন? দেশসেরা আবহাওয়াবিদরা তিনটি কারণকে সামনে নিয়ে এসেছেন। তাদের মতে, বৃষ্টিপাত না হওয়া, পশ্চিমা লঘুচাপ সক্রিয় না থাকা, বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ কম থাকা এবং সাগরে একাধিক লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ার জন্য এবার কাক্সিক্ষত শীতের দেখা পাওয়া যায়নি। তবে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ কম থাকাও কারণ হতে পারে বলে মনে করেন একজন আবহাওয়াবিদ। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বাস্তবতায় পতিত রেজিমের উন্নয়নের নামে লুটপাট ও পরিবেশ ধ্বংসের বিপরীতে বর্তমানে উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় এমনটি হতেও পারে।

এ কথা সত্যি যে, বৈশ্বিক আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে যে নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল তা ভেঙে পড়তে শুরু করছে। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিকভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধি। এর ফলে আবহাওয়ার উপাদানগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বন্যার সময় বদলে যাচ্ছে। খরার সময় বদলে যাচ্ছে। আগে যেমন একটানা শীত পড়ত সেটা আর এখন হয় না। কুয়াশার প্রকোপ বাড়ছে। ঘন কুয়াশা পড়ছে। বজ্রপাত বাড়ছে। উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। অদ্ভুত জায়গায় বন্যা হচ্ছে। দুবাই ভেসে গেল বন্যায়, সৌদি আরবে প্রায়ই বন্যা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশকে দুর্যোগপ্রবণ বলা যায় না। এখন পুরো পৃথিবীই জলবায়ু পরিবর্তনের দুর্যোগের মুখোমুখি, যাকে বলে ‘প্লানেটারি ইমার্জেন্সি’। দুবাইয়ের মতো ধনী শহরগুলো হয়তো সাময়িকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারবে, বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের শহরকে আরও বেশি বৃষ্টিপাত সহিষ্ণু করে গড়ে তুলতে পারবে কিন্তু বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো যখন এ ধরনের হঠাৎ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় তাদের জন্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু এই সমস্যা সমাধানে আমাদের কয়টি রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি রয়েছে? এই যে বছরের পর বছর মানুষ দূষিত পরিবেশে বেড়ে উঠছে, জীবনযাপন করছে, সে বিষয়েও কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর রহস্যজনকভাবে শুধু জরিমানা করেই ক্ষান্ত হয়। বাংলাদেশ ২০০৯ সালে জলবায়ু পরিবর্তনে দলিল তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক দেশ এ ব্যাপারে এগিয়ে গেছে কিন্তু আমরা পিছিয়ে গেছি। এই অবস্থা থেকে উত্তরণ জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রকোপ হ্রাস করার জন্য বৈশ্বিকভাবে অর্থায়ন চলছে। বাংলাদেশকে এই অর্থ সংগ্রহে আরও তৎপর হতে হবে। নতুন সরকার এ বিষয়ে আরও উদ্যোগী ও তৎপর হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। আমরা চাই, মাঘের শীত ফিরে আসুক বাঘের গায়ে এবং বর্ষা ভাসুক শ্রাবণ ধারায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত