আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একজন বাংলাদেশি ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার। তার ‘দুধভাতে উৎপাত’ গল্পটি নিরাপদ খাদ্য নিয়ে লিখতে বসে মনে পড়ছে। গল্পে অসুস্থ জয়নাবের খুব ইচ্ছে হয় দুধভাত খেতে, একসময় দুধভাত খাওয়ার অপূর্ণতা নিয়ে শেষযাত্রা করে জয়নাব। বর্তমান বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বাজারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নিদারুণ টানাপড়েন চললেও ভাতের যে সেই অভাব নেই বিতর্কসহ এ দাবি করা যেতে পারে। দুধের অভাব আছে, তবে আগের মতো অত প্রকট নেই। তাহলে উৎপাত কীসে? উৎপাতটা সেই দুধভাতেই। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্যে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ ও সরকারের নানা সংস্থা থাকার পরও শতভাগ নিরাপদ খাদ্যের পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। খাবারে অতিমাত্রায় কেমিক্যালের ব্যবহারের ফলে দিন দিন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে মানুষ। অধিক হারে নানামুখী রোগাক্রান্ত হচ্ছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুখাদ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারে শিশুরাও জটিল রোগাক্রান্তসহ মরণব্যাধি ক্যানসারেও আক্রান্ত হচ্ছে। সম্প্রতি নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ‘জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস’ উপলক্ষে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এমনটাই জানা যাচ্ছে। আইন অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি জনগণের অধিকার হলেও খাদ্যে অতিরিক্ত মাত্রায় কেমিক্যালের ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ ৩০ পণ্যের ১৫২ নমুনা পরীক্ষা ও বিশ্লেষণ করে। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষার ২৬ শতাংশ খাদ্যের অতিমাত্রায় রাসায়নিক কেমিক্যালের উপস্থিতি রয়েছে। কেমিক্যাল পাওয়া পণ্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশ পণ্যই শিশুখাদ্য। পাউরুটি, মুড়ি, আচার, মধু, ফ্লেভার ড্রিংকস, কুল লাচ্ছি, এডিবল জেলের মতো শিশুপণ্যে নমুনা পরীক্ষায় শতভাগ মাত্রাসীমার বাইরে রাসায়নিক কেমিক্যাল ব্যবহার হচ্ছে। এর মধ্যে সব থেকে বেশি ক্ষতিকারক কেমিক্যালের উপস্থিতি পাওয়া গেছে পাউরুটি, আচার, মধু ও ড্রিংকস জাতীর শিশুখাদ্যে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুখাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল থাকার কথা না থাকলেও আমাদের দেশে তার ব্যবহার বেশি হচ্ছে। এসব খেয়ে শিশুরা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারাচ্ছে। বিশেষ করে কেমিক্যালযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে শিশুদের পাকস্থলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুরা গ্যাসট্রিক, শ^াসকষ্ট, অ্যালার্জি, কিডনি, লিভার, থাইরয়েড, হরমোনজনিত সমস্যাসহ মরণব্যাধি ক্যানসারেও আক্রান্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শিশুখাদ্যে অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার হওয়ার কথা না। কিন্তু আমাদের দেশে তা ব্যবহার হচ্ছে। এসব খাবার গ্রহণ করা শিশুরা নানা জটিল রোগে ভুগছে। দিন দিন এর হার বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী ভোজ্যতেল ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ ছাড়া বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ হলেও তা মানা হচ্ছে না। ভোজ্যতেলে ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধকরণ আইন, ২০১৩ বাস্তবায়নে ড্রামের খোলা ভোজ্যতেল বাজারজাতকরণ একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষ ও সরকারের অন্য সংস্থাগুলোর কাজ করার কথা। কিন্তু আমরা দেখতে পাই, খাবারে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের খবর গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়। প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারের সংস্থাগুলো মানুষের পক্ষে কাজ না করে কি ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছে?
নাগরিকদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ অনুসারে ২০১৫ সালে ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’ গঠিত হয়। দেশে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকার জরিমানার বিধানও আছে। কিন্তু খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যে ভেজাল ও দূষণের অভিযোগ থাকলেও কখনোই কারোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা শোনা যায়নি। এমনকি খাদ্যে ভেজাল ও দূষণ রোধে উচ্চ আদালতের নানা নির্দেশনাও যথাযথভাবে অনুসৃত হতে দেখা যায় না। সর্বোপরি, শিশুখাদ্য এবং ভোগ্যপণ্যে ভেজাল-দূষণ বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাসহ সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে। আর ভুলে গেলে চলবে না যে, আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। ফলে শিশুখাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দেশের ভবিষ্যৎকেই হুমকিতে ফেলছে।
