অকেজো যন্ত্রে বিপর্যস্ত চিকিৎসা

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৭:২৮ এএম

দক্ষিণাঞ্চলের সর্ববৃহৎ সরকারি চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে নানা গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি থাকলেও অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ফলে দক্ষিণাঞ্চলের সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে এসেও শতভাগ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা শুধু অতিরিক্ত খরচ নয়, রোগীদের জন্যও বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

শহরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র বরিশাল সদর (জেনারেল) হাসপাতালেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। সেখানে রক্ত পরীক্ষার জন্য আনা অ্যানালাইজার মেশিন ছয় মাসের বেশি সময় ধরে প্যাকেটবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতিও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে আছে। 

শেবাচিম সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে থাকা তিনটি সিটি স্ক্যান মেশিনের মধ্যে মাত্র একটি চালু রয়েছে, একটি একেবারে অকেজো এবং অপরটি মেরামতের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে যেসব রোগী দ্রুত সিটি স্ক্যান করাতে চান, তাদের বাধ্য হয়ে বাইরে গিয়ে দ্বিগুণ খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এছাড়া এনজিওগ্রামের একটি মেশিন দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে পড়ে আছে, যা হৃদরোগী ও অন্যান্য জটিল রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি ক্যানসার রোগীরা। হাসপাতালের কোবাল্ট-৬০ যন্ত্রটি অকেজো হয়ে গেছে, যার ফলে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ এমআরই মেশিন ২০১৮ সালের পর থেকে বিকল হয়ে আছে। দীর্ঘ ছয় বছর ধরে অত্যাধুনিক ল্যাসিক মেশিন অকেজো থাকায় রোগীরা চক্ষু চিকিৎসার ক্ষেত্রে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া চোখের ছানি অপারেশনের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাকো মেশিনটিও বিকল অবস্থায় রয়েছে। 

এ বিষয়ে রোগীর স্বজন কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসক সিটি স্ক্যান করতে বলেছেন, কিন্তু এখানে সম্ভব নয় বলে বাইরে নিয়ে যেতে হচ্ছে। আবার তাকে ট্রলিতে করে প্রধান সড়ক ধরে হাসপাতালের সামনে নিয়ে যেতে হবে, যা রোগীর শারীরিক অবস্থার জন্য আরও বিপজ্জনক। কিন্তু কিছু করার নেই।’

অপর এক রোগী ফাতেহা খানুম বলেন, ‘গত ছয় মাস ধরে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করছি, কিন্তু ল্যাসিক মেশিন বিকল থাকায় চোখের চিকিৎসা করাতে পারছি না। বাইরে করানোর সামর্থ্যও নেই।’

হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ তথ্যমতে, শেবাচিম হাসপাতালে কাগজে-কলমে ১৫০০ শয্যা থাকলেও কার্যত ১০০০ শয্যার লোকবল দিয়েই এটি পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ১৫০০-২০০০ রোগী ভর্তি হন এবং বহির্বিভাগে ২০০০-এরও বেশি রোগী চিকিৎসাসেবা নেন। এদের অধিকাংশকেই চিকিৎসা শুরু করার আগে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হয়, যা হাসপাতালে সম্ভব না হওয়ায় বাইরের ক্লিনিকের দ্বারস্থ হতে হয়। 

এ বিষয়ে নগরীর বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, ‘হাসপাতালের ভেতরে পরীক্ষা করাতে যে টাকা খরচ হয়, বাইরে গেলে তার দ্বিগুণ হয়ে যায়। আমরা চাই, শেবাচিম হাসপাতালেই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা হোক। আগের কোনো পরিচালক সব মেশিন সচল রাখতে পারেননি। আবার অভিযোগ রয়েছে হাসপাতালের স্টাফদের অদক্ষতার কারণেও অনেক মেশিন বিকল হয়ে যায়। তবে এবার মানুষ নতুন পরিচালককে নিয়ে অনেক আশাবাদী। আশা করি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেবাচিম ভালো হবে।’

শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, ‘বর্তমানে হাসপাতালের ল্যাবের যাবতীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ ও রিপোর্ট প্রদানের প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। আশা করছি, আগামী দুই মাসের মধ্যে ল্যাবের কোনো পরীক্ষার জন্য রোগীদের বাইরে যেতে হবে না। ইতিমধ্যে তিনটি নতুন যন্ত্র বরাদ্দ হয়েছে এবং আরও কিছু যন্ত্রের জন্য চাহিদা পাঠানো হয়েছে। তবে এমআরই ও কোবাল্ট-৬ যন্ত্রের বিষয়ে এখনই কিছু করা সম্ভব নয়। অন্যান্য যন্ত্রের সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হবে।’

সদর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব : বরিশাল নগরের পূর্ব ও উত্তরাংশের মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বরিশাল সদর হাসপাতালও নানা সংকটে জর্জরিত। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন এবং বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৫০০-৬০০ রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। কিন্তু এখানে প্রয়োজনীয় অনেক যন্ত্র নেই, আর যেগুলো আছে তার অনেকগুলোই অকেজো হয়ে পড়ে আছে। 

বরিশাল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মলয় কৃষ্ণ বড়াল জানান, ‘হাসপাতালের অ্যানালাইজার মেশিনটি ছয় মাস ধরে প্যাকেটবন্দি অবস্থায় রয়েছে। সরবরাহকারী সংস্থা এটি চালু না করায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও কিছু করতে পারছে না। বিষয়টি সিএমএইচডির মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিশু ছাড়া জেলায় ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত প্রায় সব রোগী সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাই এখানে একটি ইলেকট্রোলাইট যন্ত্র থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আমাদের হাসপাতালে এটি নেই। ইতিমধ্যে যন্ত্রটির চাহিদা পাঠানো হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের দুটি এক্স-রে মেশিন নষ্ট, যা মেরামতের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত