বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করেই উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দিয়েছে। ইউএসএআইডির সহায়তা বন্ধের ফলে অনেক দেশই এখন চীনের দ্বারস্থ হতে পারে। দেশটির নিউজার্সির ডেমোক্রেটিক সিনেটর এন্ডি কিম সরাসরিই বলেছেন, চীনের অর্থ এবং অর্থনীতিবিষয়ক প্রভাবের বিপরীতে লড়াইয়ে ইউএসএআইডি তাদের সেরা অস্ত্র। তার শঙ্কা, ট্রাম্প প্রশাসনের এমন পদক্ষেপ বিশ্ব জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাববলয়কে সীমিত করবে। আর সেটি হওয়া মানে অবধারিতভাবে ইউএসএআইডি যে ১৩০টির মতো দেশে সহায়তা করত, সেসব দেশ বিকল্প পথ খুঁজবে।
জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে বলছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এবং উন্নয়নকর্মীদের ওপর নাটকীয় প্রভাব পড়বে। তার অভিঘাত সামলাতে হবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রকেই।
ট্রাম্পবিরোধী রাজনীতিবিদরা ইতিমধ্যে অভিযোগ করেছেন, রোগবালাই আর সংঘাতের বিপরীতে লড়াইকে ঝুঁকিতে ফেলেছে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত। তবে ট্রাম্পের অভিযোগ, ইউএসএআইডির মাধ্যমে অর্থের অপচয় হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার তার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, মনে হচ্ছে কোটি কোটি ডলার ইউএসএইডে চুরি হয়েছে। অবশ্য কথিত এ চুরি ঠেকাতে গিয়ে ট্রাম্প অজ্ঞাতেই চীনকে সুবিধা দিচ্ছেন বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ডয়চে ভেলে বলছে, বিশ্বের মধ্যে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উন্নয়ন সহায়তা ব্যবহার করে। তাদের বৈরিতা ইন্দো-প্যাসিফিকে বেশ স্পষ্ট। সংবাদমাধ্যমটি এখানে বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে বলেছে, বাংলাদেশ চীনের কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশটি চীনা পণ্যেরও বড় বাজার।
চীন কী পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশকে সহায়তা হিসেবে দেয়, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার কলেজ অব উইলিয়াম অ্যান্ড মেরির গবেষকদের ধারণা, ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৩৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়ন করেছে চীন। অবশ্য দেশটিতে এখনো যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু ২০২৪ সালেই বাংলাদেশকে ৩৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সহায়তা হিসেবে দিয়েছে দেশটি। তবে বড় প্রকল্পের দিকে নজর আছে চীনের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউএসএআইডি মূলত স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করে। আর ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চায়না এইড মূলত ঋণ এবং বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পে মনোযোগ দেয়। দুই সংস্থারই উদ্দেশ্য একই। আর তা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার রাষ্ট্রগুলোয় তাদের সরকারের প্রভাব নিশ্চিত করা। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় চীন বর্তমানে ১৪৫টিরও বেশি দেশকে সেতু, মহাসড়ক এবং বন্দর নির্মাণের মতো যৌথ প্রকল্পের মাধ্যমে সংযুক্ত করতে চাচ্ছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বছর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে মার্কিন উন্নয়ন সহায়তাকে ‘স্বার্থপর, অহংকারী, কপট এবং কুৎসিত’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, নিজেদের স্বার্থে অযৌক্তিকভাবে বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করা হয়। বিদেশে মার্কিন উন্নয়ন সহায়তা শান্তি এবং উন্নয়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে চীনের প্রতিবেদনে। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের ‘রিইমাজিনিং ইউএস ডিপ্লোমেসি’ প্রকল্পের প্রধান ইভান কুপার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রভাব বিস্তারের এই লড়াই শুধু হারজিতের ব্যাপার নয়। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘আমি মনে করি না, ইউএসএইড বন্ধ করে অর্থায়ন বাতিল এবং কর্মী ছাঁটাই করলে হঠাৎ করে বিশ্বে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রভাব ব্যাপক আকারে বেড়ে যাবে। তবে মার্কিন অর্থ স্থগিতের কারণে উন্নয়ন সহায়তাভিত্তিক খাত ধসে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষ্য, সেই ঘাটতি পূরণে চীন অগ্রণী ভূমিকা পালনে আগ্রহী হবে না।’ তবে বিষয়টি নিয়ে জার্মানির রক্ষণশীল খ্রিস্টীয় গণতন্ত্রী দল সিডিইউ এবং খ্রিস্টীয় সামাজিক দল সিএসইউর অর্থনৈতিক সহায়তা এবং উন্নয়ন বিষয় সংসদীয় গ্রুপের মুখপাত্র ফল্কমার ক্লাইন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাহারের (সহায়তা) চেয়ে ভালো কিছু চীনের জন্য হতে পারে না। বেইজিং তার বিক্রির বাজার নিরাপদ করতে, তার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি করতে এবং নানা দেশকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় নিজের পক্ষে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এর ফলে চীনের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা ক্ষয়ে যাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের পর জার্মানি বিশ্বের সবচেয়ে বড় দাতা রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত জার্মানির উন্নয়ন সহায়তা নীতির ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি না আমাদের সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্রে যে আস্থা রয়েছে, তার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়বে। বরং আমরা নির্ভরযোগ্য সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত এবং সেটা অব্যাহত থাকা উচিত।’
জার্মানির মধ্যবাম সামাজিক গণতন্ত্রী দল এসপিডির উন্নয়নমন্ত্রী স্যোয়েনিয়া শ্যুলৎসে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরবিবিকে একই ধরনের মতামত জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এখন যৌথভাবে কী অর্জন করা সম্ভব সেদিকে ইউরোপের নজর দিতে হবে। শ্যুলৎসে বলেন, ‘আমাদের উন্নয়ন সহায়তা আরও মজবুত করার পরামর্শ নিতে হবে, কমানো যাবে না।’
ফল্কমার ক্লাইনের রক্ষণশীলরা মতামত জরিপে এগিয়ে আছে। আগামী ২৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করলে তিনি আরও আন্তর্জাতিক দায়িত্ব নিতে তার দলকে উদ্বুদ্ধ করবেন বলে জানিয়েছেন। তবে তিনি বলেন, ‘তবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাটতি কাটাতে পারব না। যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির তুলনায় ছয় গুণ বেশি অর্থ উন্নয়ন সহায়তায় ব্যয় করত। ফলে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা আমাদের পক্ষে পূরণ করার ভাবনাটাও অলীক কল্পনা।’
গবেষক ইভান কুপারের শঙ্কা হচ্ছে, হঠাৎ করে উন্নয়ন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্বব্যাপী সংঘাত এবং অভিবাসন বেড়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি অভিবাসনের স্রোত বাড়লে কীভাবে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয় এবং পপুলিজমের উত্থান ঘটে। আমি মনে করি, মধ্য এবং দীর্ঘ মেয়াদে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।’
মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএসএআইডির ১০ হাজার কর্মীর মধ্যে মাত্র কয়েকশ কর্মীকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এটাও নিশ্চিত নয় যে, নব্বই দিনের পুনর্মূল্যায়ন শেষে কতগুলো উন্নয়ন প্রকল্প আবার শুরু করতে সম্মত হবে ট্রাম্প প্রশাসন।
আর সেটি হলে আক্ষরিক অর্থেই শত শত দেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার দরজা। সে ক্ষেত্রে চীন দেশগুলোকে কোলে তুলে নেওয়ার জন্য বসেই আছে।
