প্রয়োজন সমবেত প্রচেষ্টা

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:৫১ এএম

গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই ঢাকা পরিণত হয় দাবি’র শহরে। গত ১৫ বছরে কোনো গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান, ছাত্রসমাজ, নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারী এমনকি রাজনৈতিক দল গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ে রাস্তায় নেমে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কোনো অন্দোলন করতে পারেনি। তাই দেখা যায়, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়েছে কি হয়নি, তারপরই একের পর এক নানা শ্রেণি, পেশা ও কর্মজীবী মানুষজন দাবি আদায়ে রাস্তায় নেমে আসেন। জনাকীর্ণ হয়ে ওঠে শাহবাগ, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকার জনপথ। এমনকি অত্যন্ত সুরক্ষিত সচিবালয়ের ভেতরেও নানা শোডাউন হয়েছে। একাধিক পত্রিকার রিপোর্ট বলছে, ঢাকায় এ পর্যন্ত একশোর বেশি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দাবি আদায়ের মিছিল-মিটিং-প্রতিবাদ-আন্দোলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব প্রতিবাদ-আন্দোলনের কোনো কোনোটিতে সরকারকে বেসামাল করার চক্রান্ত রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। যার রেশ এখন অবধি চলছে। অবশ্য আজ অবধি হিসাব করলে এর সংখ্যা আরও বাড়বে।

মোটের ওপর এসব আন্দোলন-প্রতিবাদের মূল বিষয় ছিল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিবর্গের/ছাত্রদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি-দাওয়া পেশ করা। ছাত্ররা আন্দোলন করেছেন সরকারি চাকরিতে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের জন্য। তারপর নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা স্বেচ্ছাসেবী (মহিলা) দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ, জাতীয় মহিলা সংস্থা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রাম’-এ কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের চাকরি জাতীয়করণ ও রাজস্ব খাতে নেওয়ার জন্য আন্দোলনে নামেন। মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে এত আন্দোলন এমন একটি সরকারেকে দেখতে হলো, যারা মূলত নানাবিধ সংস্কার ও একটি অবাধ, মুক্ত ও ভীতিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য জাতির কাছে দায়বদ্ধ। কেবল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল নিজেদের জাতীয়তা ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষিত করার জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরা। আর বাকি সব আন্দোলনের মূল কথা হলো চাকরির নিশ্চয়তা দেওয়া, চাকরি উন্নয়ন বাজেট থেকে রাজস্ব খাতে পরিবর্তন করা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাদি বৃদ্ধি করা, ইত্যাদি। অর্থাৎ, এগুলো ভোটের আন্দোলন নয় বরং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন ও আর্থিক বৈষম্য কমানোর আন্দোলন। চূড়ান্ত অর্থে সব আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ব্যক্তি ও সমাজের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ শক্তিশালী করা।

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন

আন্দোলন মৌসুমে সড়ক অবরোধ, সরকারি স্থাপনা ঘেরাও এবং কখনো কখনো সহিংস পথ বেছে নেওয়ার হিড়িক দেখে মনে হয়েছে, দেশ বিশৃঙ্খলার মধ্যে রয়েছে অথবা বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানের আলোকে ‘সামাজিক বিশৃঙ্খলা’ বলতে বোঝায় অস্থিরতা বা কাঠামো ও নিয়মের ভাঙন। এটি নানা মাধ্যমে প্রকাশিত হতে পারে। যেমন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, সরকারের পতন, দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া বা আইন প্রয়োগে ব্যর্থতা। এছাড়া অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ-বেকারত্ব উচ্চ-মুদ্রাস্ফীতি বা গুরুতর আর্থিক সংকট। সামাজিক অস্থিরতার সময় প্রতিবাদ, দাঙ্গা বা ব্যাপক নাগরিক অবাধ্যতা তৈরি হতে পারে। সমাজে অপরাধ, সহিংসতা, অনাচার, গ্যাং কার্যকলাপ বা সন্ত্রাসী কর্মকা- বেড়ে যেতে পারে। জাতি, ধর্ম, আদর্শ বা শ্রেণির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে গভীর সাংস্কৃতিক বিভাজন। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া বা নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস অনেকটাই কমে যেতে পারে। তখন নাগরিকদের মধ্যে নানাবিধ অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের ভয় কাজ করে। বিশৃঙ্খলা থেকে আবারও নিয়মতান্ত্রিক একটি পরিবেশে ফিরে যাওয়ার জন্য দেশের জনগণকে মৌলিক কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। এ মুহূর্তে যেমন বাংলাদেশের সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ভেঙে যাওয়া সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার ও মেরামত করা। যখন কোনো প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন তার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কারণ, দুর্বল কোনো প্রতিষ্ঠান তার ওপর অর্পিত কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষমতা রাখে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে তাই সংস্কারের চ্যালেঞ্জগুলো অনেক কঠিন।   

পুলিশের থানায় ফেরা ও অন্যান্য আন্দোলন

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সবচেয়ে জটিল ও সংবেদনশীল বিষয় ছিল পুলিশকে থানায় ফেরানো। সরকার পতনের পর সারা দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে অন্তত ৪৫০টি ‘আক্রান্ত’ হয়েছিল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন। সরকার পতনের আগে-পরে সহিংসতায় সারা দেশে পুলিশের কমপক্ষে ৪৪ জন সদস্য নিহত হন বলে কর্মকর্তারা জানান। এহেন পরিস্থিতিতে পুলিশের মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। ফলে, কর্মস্থলে নিরাপত্তা, পুলিশ হত্যার বিচার, ক্ষতিপূরণসহ বেশ কিছু দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় চুরি-ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়াসহ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। এক পর্যায়ে, স্থানীয় বাসিন্দা ও স্বেচ্ছাসেবীরা রাত জেগে পাড়া-মহল্লায় পাহারা দেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে তা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ১২ দিনের মাথায় ২০ আগস্ট দেশের গ্রাম পুলিশরা আন্দোলনে নামেন। তারা গ্রাম পুলিশের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার দাবি জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। বৈষম্যবিরোধী গ্রাম পুলিশ সংগঠনের সভাপতি লাল মিয়া বলেন, ‘আমরা ৪৭ হাজার গ্রাম পুলিশ সদস্য। আমাদের ২০০৯ সালে জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেট হওয়া সত্ত্বেও আমরা সেই মোতাবেক বেতন পাচ্ছি না। এই বেতনবৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে আমরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন সময় অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছি।’ শাহবাগ এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বসেছিল, প্যাডেলচালিত শত শত রিকশাচালক। তাদের দাবি, ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার সড়কে চলতে পারবে না। এ ঘটনার আড়াই মাস পর হাইকোর্টের এক নির্দেশনার বিরোধিতা করে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনে নামেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়ক অবরোধ করে শুরু করেন আন্দোলন। ওই আন্দোলনের মধ্যে ঢাকার মহাখালীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। শেষ পর্যন্ত ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা সফল হন। অপরদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ৭ কলেজকে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আনবার জন্য শত শত ছাত্র-ছাত্রী রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করেন। তার মধ্যে তিতুমীর কলেজকে পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় করার জন্য লাগাতার আন্দোলন করছেন বেশ কিছু ছাত্র। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছেন বলে মন্তব্য করেছিলেন স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।

উপায় তাহলে কী?

সভ্যতার বিকাশে নানা পর্যায়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বৈষম্যবিরোধী নানা আন্দোলন হয়েছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা থেকে আধুনিক কালের সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উত্তরণের প্রতিটি ধাপে সহিংস আন্দোলন হয়েছে, রক্ত ঝরেছে লাখ-লাখ মানুষের। অন্যান্য বিষয় বাদ দিয়ে কেবল ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলকে যারা গণতন্ত্র আখ্যা দিচ্ছেন, তারা তোষণমূলক ক্যাপিটালিজমকেই সমর্থন করছেন। এই ব্যবস্থা আধুনিক মানুষের অনেক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। ফলে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে, আয়-বৈষম্য চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, দেশে দেশে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে সব ধরনের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করার পর এখন অন্তর্বর্তী সরকার পেয়েছে বেশ কিছু হাড়হাড্ডি। এই অস্থি-চর্মসার প্রতিষ্ঠানগুলো বিনির্মাণ করা সহজ কথা নয়। আর কাজটি মূলত চলমান একটি প্রক্রিয়া। বর্তমান অস্থায়ী সরকার সেই প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। কিন্তু তা পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যেতে হবে একটি রাজনৈতিক সরকারকেই।

সম্ভাবনার জায়গাটি অনেক উর্বর

জুলাই অভ্যুত্থান পুরো জাতিকে এক প্ল্যাটফরমে এনেছে, যা কিনা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনকালে জাতিকে বহুধা বিভক্ত করা হয়েছে। নানা কৌশলে সব সামাজিক দাবি-দাওয়াকে ‘জামাতি’ তকমা দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে। কঠোর হস্তে দমন করা হয়েছে অনেক ন্যায্য আন্দোলন। মানুষকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেওয়া হয়নি। মানববন্ধনের মতো একটি নীরব প্রতিবাদের অনুষ্ঠানে বর্বর আক্রমণ চালানো হয়েছে। প্রতিবাদকারীদের ধরে ধরে নানা মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু বিগত আন্দোলন সব বিভাজন দূর করে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে একত্র করে দেশবাসীকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি সুগম করেছে। সেই সামনে যাওয়ার লক্ষ্যটি যেন একটি সম্ভাবনাময় সাগর, যেখানে অনেক বিচিত্র নদী যেন মিলিত হয়েছে। কিন্তু এই ক্রান্তিকালে, নানামুখী দাবি যেন বিভক্তি ও বিভ্রান্তি তৈরি না করে। মনে রাখতে হবে, দাবি পূরণ করা রাজনৈতিক সরকারের কাজ। কিছু দাবি বাদ দিলে, অনেক অন্দোলন ও প্রতিবাদ সমাজের নানাবিধ বৈষম্য দূর করে সামাজিক সংহতিকে ইস্পাতের মতো শক্তিশালী করার সুযোগ এনে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সমবেত প্রচেষ্টাই নাগরিকদের অধিকার আরও প্রসারিত ও নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। প্রতিষ্ঠিত করা যাবে শ্রম অধিকার, দূর হবে পরিবেশের মারাত্মক দূষণ, কমবে ধনী-দরিদ্রের আয়-বৈষম্য। আর এজন্য দরকার রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা ও একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাওয়ার দৃঢ় মানসিকতা। জনগণের ম্যান্ডেট পাওয়া রাজনৈতিক দলের পক্ষেই এসব দাবি পূরণ করা সম্ভব। এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করা।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত