একজন জেলা প্রশাসকের হাতেই জেলার সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব। তিনি কেন্দ্র থেকে আসা সব আদেশ-নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবেন। তাদের মূল কাজ হচ্ছে প্রশাসনিক, রাজস্ব সংক্রান্ত ও আর্থিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়নমূলক এবং স্থানীয় শাসনসংক্রান্ত। তিনিই একটি জেলার মুখ্য আমলা ও ভূমিরাজস্ব কর্মকর্তা। আবার এদের মধ্যে রয়েছেন অনেক অতি উৎসাহী। যদিও জেলা প্রশাসকদের মূলত নিয়ন্ত্রণ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এখানেও উৎসাহী, অতিতৎপর পদলেহনকারীর অভাব নেই। তারা ক্ষমতার জায়গামতো মালিশ করেন। এতদিন যেভাবে করেছেন। ফলে অতীত নির্বাচনের জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ক্ষত এখনো তাজা। যে কারণে প্রশ্ন উঠেছে, সেই জেলা প্রশাসক, যারা বিগত সরকারের সময় দিনের ভোট রাতে সম্পন্ন করার সমস্ত ধাপ দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন, সেই তাদের প্রশাসনের উচ্চ স্তরে রেখে কতটুকু নিরপেক্ষতা বজায় রাখা সম্ভব? কথা ছিল, তারা থাকবেন জনগণের পক্ষে। অথচ বাস্তবে দেখা গেছে, তারা কাজ করেছেন একটি দলীয় সরকারের সমর্থনে। যে কারণে বিভিন্ন মহলে তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথে প্রশাসনই সবচেয়ে বড় বাধা। এমনটিই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, ক্ষমতাসীনরা ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলেও প্রশাসন নিরপেক্ষ না হওয়ায় সেটি সম্ভব হবে না। বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে প্রশাসন নিরপেক্ষ আচরণ না করায় দিনের ভোট রাতেই সম্পন্ন হয়ে গেছে। সেই তারাই প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছেন। রীতিমতো দায়িত্ব পালন করছিলেন সচিবালয়ের বিভিন্ন উচ্চপদে। এবার ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত একাদশ জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৩৩ ডিসিকে ওএসডি করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে যুগ্ম সচিব ও সমপর্যায়ের পদে দায়িত্ব পালন করছিলেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মানসুর হোসেন জানাচ্ছেন, ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ওই ৩৩ কর্মকর্তা ওএসডি হয়েছেন। এর আগে একই কারণে ওএসডি হয়েছে আরও ১২ কর্মকর্তা। এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে বৃহস্পতিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কেন এমন হলো? তাহলে কি এরাই রাতের ভোটের কুশীলব ছিলেন?
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ সালের দশম ও ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি-জামায়াত ও সমমনারা বর্জন করে। তবে ২০১৮ সালে তারা ভোটে এলেও আগের রাতেই সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ী হওয়ার অভিযোগ ওঠে। সরকারের পালাবদলের প্রেক্ষাপটে গত ৯ ডিসেম্বর দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদের তিনটি নির্বাচনে নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে ৩০ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ডেকেছিল নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। তখন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, “উনারা (কর্মকর্তারা) উনাদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছেন। উনারা বলেছেন উনাদের তেমন কিছু করার ছিল না। ‘কলকাঠি’ অন্য জায়গা থেকে নাড়ানো হয়েছে। এক অর্থে বলতে গেলে, উনারা অসহায় ছিলেন। তবে যারা নিচের কর্মকর্তা, তারা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মূল কথা বলেছেন, আমাদের দেশ একটি ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ হয়ে গিয়েছিল।”
জেলা প্রশাসকের কাজ হচ্ছে, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা। অথচ তারা থাকেননি। তারা জনগণের পক্ষে না থেকে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়েছেন। নিজের মেরুদ-কে নেতিয়ে রেখে, তারা তেজ দেখিয়েছেন জনগণের বিরুদ্ধে। ফল হিসেবে যা পাওনা, এবার তারা পেয়েছেন। বিষয়টি অবশ্যই বর্তমান জেলা প্রশাসকদের জন্য একটি বার্তা। এখান থেকে বুঝে নিতে হবে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নিজেকে কীভাবে নিরপেক্ষ রেখে জনগণের পক্ষে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, জনগণের জন্য সরকার। তারা যখন মনে করেন, সরকারের জন্য জনগণ তখনই সমস্যা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জেলা প্রশাসকদের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, ৩৩ ডিসি ওএসডি হওয়ার নেপথ্য কারণ একটু বিশ্লেষণ করলেই পরিষ্কার হওয়া যায়। প্রত্যাশা থাকল, ভবিষ্যতে যেন দায়িত্বহীনতা এবং পক্ষপাতিত্বের কারণে কোনো ডিসিকে ওএসডি না হতে হয়। ডিসিদের পরিচয় কালিমালিপ্ত না হোক।
