সকালেই জাতীয় স্টেডিয়ামে ফুটবলারদের নিয়ে তিন ঘণ্টা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন নারী জাতীয় ফুটবল দলের ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলার। সহকারী কোচ মাহবুবুর রহমান লিটু এবং গোলকিপিং কোচ মাসুদ আহমেদ উজ্জ্বলও ছিলেন নিজ নিজ দায়িত্বে। অথচ এর ঘণ্টা তিনেক পর জাতীয় স্টেডিয়ামের হাঁটা দূরত্বের ওসমানী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে তারা উপস্থিত হননি। তাদের ছাড়াই রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক স্বীকৃতি একুশে পদক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত থেকে গ্রহণ করেছেন সাফজয়ী নারী ফুটবলাররা। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়া সত্ত্বেও তিন কোচের অনুপস্থিতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে নানা অঙ্গনে অবদান রাখা মনোনীত ব্যক্তিদের সঙ্গে সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকেও একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। দলের ২৩ ফুটবলার ছাড়াও ৯ জন কোচ-কর্মকর্তাকে দেওয়া হয় এই স্বীকৃতি। অথচ তিন কোচ নানা অজুহাত দেখিয়ে উপস্থিত হননি অনুষ্ঠানে। বাটলার এক প্রকার স্বীকার করেছেন, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দেওয়া সাফজয়ী দলের ১৫ ফুটবলারকে এড়াতেই তিনি জাননি এই অনুষ্ঠানে, ‘সকালে (বৃহস্পতিবার) মেয়েদের কঠোর অনুশীলন করিয়েছি। তাছাড়া আমি যেতে চাইনি কারণ আমি ভেবেছি ওই মেয়েরা হয়তো অন্যরকম ভাববে, যদি আমি যাই।’ এদিকে সহকারী কোচ লিটু ভোরের সেশনে ঠিকঠাক দলের সঙ্গে কাজ করলেও অনুষ্ঠানে যাননি পেটের সমস্যার কারণে, ‘আমার পেট খারাপ হয়েছে বলে যাইনি। অন্য কোনো কারণ নেই।’ গোলকিপিং কোচ উজ্জ্বল দাবি করেন, তিনি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েই অনুশীলনে এসেছিলেন। তবে পারিবারিক একটা সমস্যা সৃষ্টি হওয়ায় তাকে নারায়ণগঞ্জে বাসায় যেতে হয়েছে।
এদিকে বাফুফের কর্তারা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিন কোচের অনুপস্থিতিতে বিব্রত হয়েছেন। বাফুফের মিডিয়া বিভাগের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ খালিদ মাহমুদ নওমি জানান, দুই স্থানীয় কোচকে তিনি যাওয়ার অনুরোধ করেন। তবে দুজনই যাবেন না বলে জানিয়েছেন। আর সাফজয়ী দলের ম্যানেজার মাহমুদা অনন্যা বাটলারকে প্রশ্ন করে ‘না’ সূচক জবাব পান।
কোচরা নানা অজুহাত দিলেও বোঝা গেছে, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে সম্মানিত ব্যক্তিদের সামনে বিদ্রোহী ফুটবলারদের মুখোমুখি হতে চাননি তারা। তবে ২৩ ফুটবলার ঠিকই অনুষ্ঠানে যান। তাদের পক্ষে থেকে প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন অধিনায়ক সাবিনা খাতুন। এ সময় তার পাশে ছিলেন সহ-অধিনায়ক মারিয়া মান্ডা। বাকি ফুটবলাররাও ফটোসেশনে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে। লিখিত বক্তব্যে সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমি প্রথমেই ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আমাদের এই পদকে ভূষিত করার জন্য। তার পাশাপাশি আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই আমাদের ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন স্যার, আমাদের মহিলা কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তার, বর্তমান সভাপতি তাবিথ আউয়াল স্যার এবং ফুটবল ফেডারেশনের সব কর্মকর্তাকে। যারা সবসময় আমাদের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন বাংলাদেশের ফুটবলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।’ সাবিনা বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন আমাদের ইতিহাসের একটি অমর অধ্যায়। ১৯৫২ সালের সেই আত্মদান আমাদের শিখিয়েছে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় কী অসীম সাহস ও সংকল্প প্রয়োজন। আজ আমরা এই পদক পেয়ে মনে করছি সেই বীর শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা এই বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার পেয়েছি। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাবে আমাদের আজ ভূষিত করা হয়েছে, আমরা গৌরবান্বিত, আমরা অনুপ্রাণিত। ক্রীড়াঙ্গনের জন্য এটি মর্যাদার ও নারীদের জন্য অনেক বড় স্বীকৃতি। বলতে দ্বিধা নেই, এই স্বীকৃতি আমাদের দায়িত্ববোধ আরও বাড়িয়েছে। একুশে পদক প্রদান প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা। আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমি আবারও ধন্যবাদ জানাতে চাই প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের। আপনারা সবসময় আমাদের সাহস জুগিয়েছেন। আর আজকে যেভাবে আমাদের সম্মান জানানো হয়েছে, এটা আসলেই অনেক বড় পাওয়া। আমরা যাতে দেশের জন্য আরও সম্মান বয়ে আনতে পারি, সেই দোয়া সবার কাছে কামনা করছি।’
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান সাফজয়ী নারী ফুটবলারদের, ‘আজকে এই অনুষ্ঠানে আমাদের জাতির কৃতি সন্তানদের এখানে পেয়ে, তাদের সম্মাননা দেওয়ার সুযোগ পেয়ে আমরা সবাই আনন্দে আকূল। সবাই তাদের জন্য একটা জোড়ে হাততালি। বিশেষ করে নারী ফুটবল দলের জন্য। তারা আমাদের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে আসন নিয়েছে। তারা আমাদের জাতিকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করছে। সেজন্য আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’
