ইউক্রেনের খনিজ নিতে অনড় যুক্তরাষ্ট্র!

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১১:১৭ এএম

ইউক্রেনের খনিজসম্পদ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। লিথিয়াম, টাইটানিয়াম, ইউরেনিয়াম, গ্রাফাইট এবং বিরল মৃত্তিকা উপাদানের বিশাল ভাণ্ডারের কারণে এ দেশটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই সম্পদের প্রতি গভীর আগ্রহ দেখিয়েছে, বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে। তবে এই আগ্রহের পেছনে কতটা বাস্তবতা ও কতটা ভূ-রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, খনিজসম্পদের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বা ইলন মাস্ক যাই বলুন না কেন, তিনি দেশের সম্পদ বিকিয়ে দেওয়ার মতো কোনো কাজ করবেন না। এর মধ্যে গত শুক্রবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে, ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে কিয়েভের ওপর চাপ তৈরি করতে ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট-ব্যবস্থা ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছে, ইউক্রেনে স্টারলিংক ব্যবহারের অব্যাহত সুযোগ নিয়ে মার্কিন ও ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। জেলেনস্কি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টের প্রাথমিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর এ প্রসঙ্গে আলোচনা করেছেন তারা।

এদিকে গতকাল ট্রাম্প বলেছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দ্রুতই দেশটির খনিজসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তিতে উপনীত হবেন বলে আশা করেন তিনি। সেদিন ওভাল অফিসে খনিজসম্পদ নিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে চুক্তির অগ্রগতি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা একটি চুক্তি সই করতে যাচ্ছি, আশা করি যত দ্রুত সম্ভব।’

ইউক্রেনের খনিজসম্পদের মূল্য আনুমানিক ১০ থেকে ১২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এটিকে ইউরোপের সম্ভাব্য ধনীতম দেশে পরিণত করতে পারে। এই সম্পদের মধ্যে বিরল খনিজ আছে, যেগুলো প্রযুক্তি শিল্পে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন থেকে পেয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হতে পারে। চীন বর্তমানে এই উপাদানগুলোর বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইউক্রেন একটি বিকল্প উৎস হিসেবে উঠে এসেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সামরিক সহায়তার বিনিময়ে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজসম্পদ দিতে সম্মত হয়েছে। তিনি এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগের প্রতিদান হিসেবে দেখছেন।

কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাস্তবতা এত সরল নয়। ইউক্রেনের জেলেনস্কি এ ধরনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে নিরাপত্তার কোনো গ্যারান্টি ছিল না, যা রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনের জন্য অপরিহার্য। জেলেনস্কির মতে, যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, তারা ইউক্রেনের ৯০ শতাংশ সহায়তা দিয়েছে, কিন্তু প্রকৃত চিত্র ভিন্ন।

এ ছাড়া ইউক্রেনের খনিজসম্পদের একটি বড় অংশ রাশিয়া-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে অবস্থিত, যা এই সম্পদে প্রবেশাধিকারকে জটিল করে তুলেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিকও। রাশিয়া ও চীনের প্রভাব কমাতে ইউক্রেনের সম্পদে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তাদের কৌশলের অংশ। মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম বলেছেন, পুতিনকে এই সম্পদে হাত দিতে দেওয়া যাবে না, কারণ তিনি তা চীনের সঙ্গে ভাগ করবেন।

গ্রাহামের এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে একটি ব্যবসায়িক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখছে। তবে এই পরিকল্পনায় ঝুঁকিও কম নয়। ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার অস্বচ্ছতা মার্কিন বিনিয়োগের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।

ইউক্রেনের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা এই সম্পদকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে দেখে। যুদ্ধের মধ্যেও তারা এটি হারাতে চায় না। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের চাপ, যেমন স্টারলিংক সেবা বন্ধের হুমকি ইউক্রেনের সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাসও তৈরি করছে। এরপরও বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বিষয়টি নিয়ে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চুক্তিই হতে পারে উভয়ের জন্য সর্বোত্তম পথ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত