রোজায় বিক্রির পণ্যসহ পুড়েছে ৬০ দোকান

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২৫, ০৭:৩৭ এএম

আগুনে পুড়েছে রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় মেট্রো স্টেশনের পাশের কাঁচাবাজার। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে লাগা এ আগুন ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিটের প্রায় ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় নিয়ন্ত্রণে আসে। এতে রোজা উপলক্ষে বিক্রির জন্য দোকানিদের মজুদ করা চিড়া, মুড়ি, ছোলা, খেজুর ও গুড়সহ নানা মুদি পণ্যের ছোট-বড় ৬০টির বেশি দোকান পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। ফায়ার সার্ভিস জানায়, রাত ২টা ৪২ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং ৩টা ২৭ মিনিটে তা নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে গতকাল সকালে ফায়ার সার্ভিসের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার খালেদা ইয়াসমিন বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ২টা ৪২ মিনিটের দিকে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। প্রথমে ৪ ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে যায়। এরপর আরও দুটি করে আটটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। রাত ৩টা ২৭ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ভোর ৫টা ৫০ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা হয়।’ তবে কীভাবে এই আগুন লাগে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর। এ ছাড়া কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তদন্ত শেষে বলা যাবে বলে জানিয়েছেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হারুনুর রশিদ বলেন, ‘মাঝ রাতে ঘর ধোঁয়ায় ভরে গেলে আমাদের সবার ঘুম ভেঙে যায়। পরে বের হয়ে দেখি, মার্কেটে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে।’ আগুনে একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলার কয়েকটি দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। আর কাঁচাবাজারের অধিকাংশ দোকান পুড়ে যাওয়ায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

গতকাল সরজমিনে দেখা যায়, আগুনে কাঁচাবাজারের প্রায় সবকটি দোকান পুড়ে গেছে। পুড়েছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও সবজিসহ নানান মুদিপণ্য। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পোড়া এসব পণ্য। পুড়ে যাওয়া আর অবশিষ্টাংশ পণ্য আগুন নেভানোর কাজে ব্যাবহার করা পানিতে ভাসছে। কয়েকটি দুদি দোকান থেকে গতকাল সকালেও ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানি ও স্থানীয় বাসিন্দারা পুড়ে যাওয়া পণ্যের ভেতরে খুঁজে ফিরছিলেন অক্ষত পণ্য। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের স্ত্রী-সন্তানরাও ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তাদের কাউকে কাউকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। কাঁচাবাজার থেকে ভেসে আসছিল কটু পোড়া গন্ধ। আর সব হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিরা কাঁচাবাজারের সামনে মাতম করছিলেন। তারা বলেন, সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে দোকান সাজিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বনাশা আগুনে তাদের আশা-ভরসা সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। পুড়ে যাওয়া কিছু দোকানের পণ্যসামগ্রী ও ফলফলাদি পাশের ফুটপাতে স্তূপ করে রাখা ছিল। দোকান পুড়ে যাওয়ায় মাছ বিক্রেতারা ফুটপাতে মাছ নিয়ে বসেছিলেন।

ক্ষতিগ্রস্ত এক দোকানির ছেলে লোকমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবার মুদি দোকান ছিল এই বাজারে। আগুনে পুরো দোকান ও নগদ টাকা পুড়ে গেছে। ছোট্ট এই দোকানের আয় দিয়েই আমাদের সংসার চলত। মাসে ৫০ হাজার টাকা দোকান ভাড়া। দোকানে ছিল ৫-৬ লাখ টাকার মালামাল। ক্যাশে নগদ লাখ টাকার মতো ছিল। আগুনে সব পুড়ে গেছে। আমাদের এখন কী হবে? বাবা ভেঙে পড়েছেন। এই দুর্দিনে এত টাকার ক্ষতি বাবা কীভাবে পুষিয়ে উঠবেন তা বুঝে আসছে না।’ লোকমানের মতো ক্ষতিগ্রস্ত আরও অনেক ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্য সেখানে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়।

রমজান মাসে বিক্রিন জন্য বেশকিছু পণ্য মজুদ করেছিলেন মুদি দোকানি শাহ আলম। আগুন লাগার খবরে গভীর রাতে বাসা থেকে ছুটে এসে দেখেন, দোকানে আগুন জ্বলছে। তিনি মাতম করতে করতে বলেন, ‘চোখের সামনে নিমেষেই দোকানের সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। শুক্র (গতকাল) ও শনিবার (আজ) রোজা উপলক্ষে দোকানে বিক্রি বেশি হবে, এমন আশায় চিড়া, মুড়ি, গুড়, কলা এনেছিলাম। কিন্তু আগুনে সব পুড়ে গেছে।’

পশ্চিম শেওড়াপাড়া মেট্রোরেলের পাশে অলি মিয়ার কাঁচাবাজার নামে পরিচিত ছিল এই বাজার। আগুনে পুড়েছে সেখানকার একটি বাটা শোরুম এবং বৈদ্যুতিক সামগ্রীর দোকান।

মাছ বিক্রেতা ফিরোজ মিয়া জানান, তার দোকানে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকার মাছ পুড়ে গেছে। আরেক মাছ বিক্রেতা জসিম উদ্দিন জানান, তার দোকানে থাকা ৫০ হাজার টাকার মাছ পুড়েছে। বাজারের ভেতরে অন্তত ২০টি হাঁস-মুরগির দোকান ছিল। আগুন সেখানেও ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে কয়েকশ হাঁস-মুরগি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এছাড়া রাস্তার পাশের ফলের দোকাগুলোতেও আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, কাঁচাবাজারে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। একই রকম ধারণা ফায়ার সার্ভিক কর্মকর্তাদেরও।

ঘটনাস্থলে যাওয়া ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (উন্নয়ন) লে. কর্নেল এএম আজাদ আনোয়ার বলেন, ‘কাঁচাবাজারে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুনে কাঁচাবাজারের টিনশেডের ৫১টি ( বিভিন্ন ধরনের দোকান) পুড়ে গেছে। পরে আগুন পাশের ছয়তলা একটি ভবনের নিচ তলায় ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আটটি মুদি দোকান, একটি বাটার শো-রুম ও একটি ইলেকট্রিক দোকান পুড়ে গেছে। আগুনে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে প্রায় ২ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত