দাবি পূরণে সরকারের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন দেশের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসক ও ইন্টার্নি চিকিৎসকরা এবং ক্লাসে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা।
গত শনিবার রাতে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের এক বৈঠকে দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন।
বৈঠকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসক, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। রাত সাড়ে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিশেষ সহকারীর রাজধানীর হেয়ার রোডের বাসভবনে এ বৈঠক হয়।
এ ব্যাপারে আন্দোলনরত ‘ডক্টসর মুভমেন্ট ফর জাস্টিস’র সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুন নবী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে তারা (সরকারের প্রতিনিধিরা) দাবি মেনে নিয়েছেন ও দাবি পূরণে সময় চেয়েছেন। বলেছেন, সময়ের মধ্যেই তারা কাজ করবেন। সবার সর্মসম্মতিতে আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে নিয়েছি। যদি প্রয়োজন হয় তাহলে আমরা অবস্থান কর্মসূচি ও সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় কর্মসূচি করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোগীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করেই আমরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করেছি। এই আন্দোলন মূলত রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা ও অপচিকিৎসা বন্ধ করার জন্য। মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রেনিং স্কুল-ম্যাক্স শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পাস করে একটা কোর্স করে নিজেদের নামের আগে “ডাক্তার” লিখতে চান। শহরের কেউ যদি একজন ম্যাটসের থেকে চিকিৎসা না নেন, তাহলে প্রান্তিক জনগণ কেন নেবে? সরকারের উচিত সবার জন্য সমান সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা। ঢাকা শহরের মানুষ যদি এমবিবিএস চিকিৎসকের থেকে চিকিৎসা পায়, তাহলে ঢাকার বাইরের মানুষেরও সেই চিকিৎসা পাওয়ায় অধিকার রয়েছে। এটা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আমাদের দায়িত্ব সচেতনতা সৃষ্টি করা ও অপচিকিৎসা বন্ধ করা। অপচিকিৎসা বন্ধ না হলে জীবনের ঝুঁকি বেড়ে যাবে। অপচিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলে সবাই মারা যাবে।
পরে ডক্টরস মুভমেন্ট ফর জাস্টিস এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকে দেওয়া সরকারের আশ্বাসের বিষয়টি জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. জাবির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. নুরুন নবী।
এমবিবিএস ও বিডিএস ছাড়া কেউ ‘ডাক্তার’ লিখতে পারবেন না এমন দফাসহ পাঁচ দাবিতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। এরপর তাদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে গত শনিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতির ঘোষণা দেন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেইনি চিকিৎসকরা। এমন অবস্থায় গত শনিবার রাতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দাবি পূরণের আশ্বাস দেয় সরকার। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেন চিকিৎসক ও মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিএমডিসি অ্যাক্ট-২০১০-কে চ্যালেঞ্জ করে যে রিট করা হয়েছে, যার রায় আগামী ১২ মার্চ হওয়ার কথা। বৈঠকে সে রায়ের ব্যাপারে আন্দোলনকারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা রাখতে বলা হয়েছে। তারপরও আন্দোলনকারীদের রায় ঘোষণার দিন ১২ মার্চ সন্ধ্যার জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, স্বাস্থ্য খাতের সংকট নিরসনে পর্যায়ক্রমে পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হবে। পরে এমবিবিএস পাস করা প্রত্যেক ব্যাচ বৈষম্যহীনভাবে যাতে সমান ও সর্বোচ্চসংখ্যক বিসিএস লাভ করে, সে কাজ চলমান।
বৈঠকে আরও বলা হয়, ৯০ দিনের মধ্যেই চিকিৎসক সুরক্ষা আইনের পূর্ববর্তী অসামঞ্জস্যগুলো পরিমার্জন করে নতুন করে প্রণয়ন করা হবে।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিকিৎসকদের চাকরির বয়স ৩২ থেকে ৩৪ বছর করার আবেদন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী দুই কর্মদিবসের মধ্যেই চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ থেকে ৩৪ করার জন্য আবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালে ডাক্তার, নার্স এবং অন্যান্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত লোকজনদের ড্রেসকোডের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আসবে। সুনির্দিষ্ট তালিকাভুক্ত ওষুধের বাইরে কেউ কোনো ওষুধ প্রেসক্রিপশন করলে সিভিল সার্জন বরাবর অভিযোগের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মানহীন সব স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতিদ্রুত বন্ধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বিডিএস কোর্সের জন্য বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) ও রেফারেল সিস্টেম নিয়ে কাজ ইতিমধ্যেই চলমান রয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘উক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আজকে থেকে ১২ মার্চ পর্যন্ত সকল চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রত্যাহার করলাম।’
কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি ম্যাটস শিক্ষার্থীদের : চার দফা দাবি আদায় না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) শিক্ষার্থীরা। তারা বলেছেন, নতুন কর্মসূচির ফলে কোনো ধরনের ‘অপ্রীতিকর ঘটনা’ ঘটলে তার দায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তাবে।
গতকাল রবিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএমএ), বাংলাদেশ ডিপ্লোমা মেডিকেল প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএমপিপিএ) ও সাধারণ ম্যাটস শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে ম্যাটস সাধারণ শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সমন্বয়ক মো. মুজাহিদুল ইসলাম, হাসিবুল ইসলাম শান্ত ও আহসান হাবীব স্বাক্ষরিত মূল বক্তব্য পাঠ করেন মো. মুজাহিদুল ইসলাম।
মূল বক্তব্যে বলা হয়, চার দফা দাবিতে ম্যাটস শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে কিছু চিকিৎসক ‘উসকানি’ দিচ্ছেন। তাতে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা ম্যাটস শিক্ষার্থীদের নিয়ে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ছড়াচ্ছেন। তাতে উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার এবং ডিএমএফ (ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) ডিগ্রিধারীদের সুনাম ‘ক্ষুণœ’ হচ্ছে। এ ধরনের অপপ্রচার দেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ডিএমএফদের অধিকার আদায়ের জন্য উচ্চ আদালতে একটি মামলা চলমান। এই মামলার রায়কে প্রভাবিত করতে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কর্মবিরতি, সভা-সমাবেশ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাবিরোধী এবং আদালত অবমাননার শামিল। আমরা এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, আমাদের যে দাবি তা আদালতেই সমাপ্ত হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, ‘ম্যাটস শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চলে আসা দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর হয়নি। এ জন্য ম্যাটস শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন। গত ২২ জানুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৭ দিনের মধ্যে দাবি মানার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো পূরণ হয়নি। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না হওয়ায় ৯ ফেব্রুয়ারি আমরা আবার রাস্তায় নামি। সে সময় তিন কর্মদিবসের মধ্যে আমাদের নিয়োগ সম্পাদন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখনো তার কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। যেহেতু মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, তাই আমরা আবার কঠোর কর্মসূচির দিকে অগ্রসর হতে বাধ্য হব। এ সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ অধিদপ্তরগুলোর ওপর বর্তাবে।’
শূন্য পদে নিয়োগ এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে পদ সৃজন, দ্রুত কোর্স কারিকুলাম সংশোধন ও ইন্টার্নশিপ ভাতা দেওয়া, প্রস্তাবিত অ্যালায়েড হেলথ প্রফেশনাল বোর্ড বাতিল করে স্বতন্ত্র মেডিকেল এডুকেশন বোর্ড গঠন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বিএমঅ্যান্ডডিসি স্বীকৃতি ক্লিনিক্যাল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন ম্যাটস শিক্ষার্থীরা। সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ ম্যাটস শিক্ষার্থী ঐক্য পরিষদের সিনিয়র সমন্বয়ক হাসিবুল ইসলাম শান্ত, ঢাকা জেলার সমন্বয়ক গোলাম কিবরিয়াসহ শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
