গত ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) । প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এলে জনতার মাঝে স্বাধীনতার প্রকৃত স্বাদ আস্বাদনের আকাক্সক্ষা সৃষ্টি হলেও তার প্রতিফলন মূলত ঘটেনি। সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা দেখাতে পারেনি। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও মানবাধিকার পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা হতাশাজনক।’ গতকাল সোমবার এইচআরএসএস’র নির্বাহী পরিচালক মো. ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
ফেব্রয়ারি মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এইচআরএসএস বলছে, মাস জুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনিতে হত্যা, সাংবাদিক নির্যাতন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। এই মাসে চাঁদাবাজি, চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, হত্যা, ধর্ষণসহ বেশ কিছু সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে যা জনমনে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার বক্তব্য নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে প্রচারের ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা ৫,৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি, শেখ হাসিনার বাসভবন সুধা সদন এবং সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস ও নেতাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষ শিক্ষার্থীদের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলার শিকার হয়ে আবুল কাসেম নামে একজন শিক্ষার্থী নিহত ও আহত হয়েছেন ১৫ থেকে ১৬ জন শিক্ষার্থী।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশে সন্ত্রাসবাদ দমন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতে যৌথ বাহিনীর সমন্বয়ে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ নামে বিশেষ অভিযানে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এইচআরএসএস’র তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে কমপক্ষে ১০৪টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্ত ৯ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭৫৫ জন। এর মধ্যে সহিংসতার ১০৪টি ঘটনার মধ্যে ৫৮টি বিএনপির অন্তর্কোন্দলে। এতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন ও ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন। নিহত ৯ জনের মধ্যে বিএনপির ৫ জন, আওয়ামী লীগের একজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একজন নিহত হয়েছেন। অপর দুইজনের রাজনৈতিক পরিচয় মেলেনি যার মধ্যে একজন নারী রয়েছেন। এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার ১৬টি ঘটনা ঘটেছে ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংষর্ষে তিনজন নিহত হয়েছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় ২০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মিরাজ হোসেন ও মো. জুম্মন নামে দুই যুবক নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টার দিকে কক্সবাজারে অবস্থিত বিমান বাহিনী ঘাঁটি কক্সবাজারসংলগ্ন সমিতিপাড়ার স্থানীয়দের সঙ্গে বিমান বাহিনীর সংষর্ষে শিহাব কবির নাহিদ (৩০) নামে একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এইচআরএসএস’র তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ১৯টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৩৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ১৬ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন দুইজন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন চারজন ও গ্রেপ্তার হয়েছেন একজন। এছাড়াও পাঁচটি মামলায় ১১ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে তিনটি হামলার ঘটনায় ছয়টি প্রতিমা ভাঙচুর ও জমি দখলের মতো একটি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এ মাসে ২৬টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১২ জন এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৮৭ জন। এইচআরএসএস বলছে, ফেব্রুয়ারি মাসে কমপক্ষে ১০৭ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৫৩ জন, যাদের মধ্যে ৩৮ জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এ ছাড়া ১০৪ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ২৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৭৫ শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
