আ.লীগ নেতার চাপে ভুয়া সনদেই চাকরি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৫, ০৭:৩৯ এএম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) মার্কেটিং বিভাগে বিতর্কিতভাবে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক আবু ওবায়দা রাহিদের বিরুদ্ধে এবার নিয়োগের সময় ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ দেখিয়ে শিক্ষক হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। নিয়োগের সময় কুমিল্লার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার সনদ প্রদর্শন করেছিলেন তিনি। যদিও অনুসন্ধানে এর সত্যতা মেলেনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের সময় আবু ওবায়দা রাহিদ সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৬ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ২০২২ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা প্রদর্শন করেন। অভিজ্ঞতা সনদের একটি কপি এ প্রতিবেদকের সংরক্ষণে রয়েছে। তিনি বেসরকারি এ বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন বলে সনদে উল্লেখ করা হয়। সিসিএন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সিসিএনের অন্তত ১৫ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ এক নেতা ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন এই অভিজ্ঞতা সনদের জন্য সিসিএন কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, এ সনদের জন্য আর্থিক লেনদেনও হয়েছে।

সিসিএনে কর্মরত একজন সিনিয়র শিক্ষক এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘রাহিদ এডহকে সম্ভবত কিছুদিন সিসিএনে কর্মরত ছিল। কিন্তু সেটা কয়েক মাস হবে। ছয় বছর তো কোনভাবেই নয়।’ তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ এক নেতা ও কুবির সাবেক উপাচার্যের চাপ প্রয়োগের কারণে অভিজ্ঞতা সনদ দিতে সিসিএনকে বাধ্য করা হয়েছিল বলে জানান তিনি। সিসিএনের আরেক শিক্ষক বলেন, ‘এখানে বিরাট একটা অর্থের লেনদেন হয়েছে সিসিএনের সঙ্গে। যার কারণে সিসিএন এই ইস্যুটা এড়িয়ে যাচ্ছে।’

চাকরির নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা কেউই নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

২০১৮ শিক্ষাবর্ষের সাকিব নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এই নামের কোনো শিক্ষক যদি আমাদের ক্লাস নিতেন তাহলে তো আমরা চিনতাম। আমি আমাদের ব্যাচের গ্রুপেও মেসেজ দিয়েছি, কিন্তু কেউই তাকে চিনে না।’

রাহিদের ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদের বিষয়ে জানতে সিসিএন প্রশাসন ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক মাসেরও বেশি সময় যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। তারা বার বার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিসিএনের মানবসম্পদ কর্মকর্তা নয়ন চন্দ্র গত ৬ জানুয়ারি এ বিষয়ে বলেন, ‘উনাকে (রাহিদ) ২০১৯ সালের দিকে করোনার সময় এখানে কিছুদিন দেখেছি। এরপর আর দেখি নাই।’

একই দিন চেয়ারম্যান তারিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, ‘উনি ২০১৯ সালে এডহক হিসেবে দুই এক মাস জব করেছেন।’ এরপর তিনি ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এরপর আবার ১২ জানুয়ারি যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘উনি আমাদের এখানে ২০১৬ সাল থেকে ছিলেন।’ তবে এর পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেননি।

এদিকে আবু ওবায়দা রাহিদের অবৈধ নিয়োগ বাতিলের দাবিতে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত ২৯ জানুয়ারী উপাচার্য বরাবর এই লিখিত দেন তারা। এর  প্রেক্ষিতে রাহিদের নিয়োগ নিয়ে অনুসন্ধানের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. আহসান উল্লাহ বলেন, ‘আমরা দুই একদিনের মধ্যে কমিটি মেম্বাররা বসব। এটা যেহেতু সত্যটা উদঘাটন করতে বলা হয়েছে, সেহেতু আমরা সিসিএনসহ সংশ্লিষ্ট সব জায়গায় খোঁজ নিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে রিপোর্ট তুলে ধরব।’

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে আবু ওবায়দা রাহিদ বলেন, ‘আপনি আমার ভাই। আপনিও কুবিয়ান আমিও কুবিয়ান। আপনার প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা রয়েছে। কিন্তু আপনি আমার নিয়োগ এবং সিসিএনের চাকরির ব্যাপারে যা জানতে চাচ্ছেন আমি এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করব না।’

উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলী বলেন, ওই প্রার্থীর নিয়োগে যদি কোনো অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায় তাহলে আমরা বিষয়টি সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করব। এরপর সিন্ডিকেটের সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

২০২৩ সালের ২৯ জানুয়ারি যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করলেও আবু ওবায়দা রাহিদকে নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ দেন তৎকালীন আওয়ামী সমর্থিত উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল মঈন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত