ফাগুন এলেই জ্বলে আগুন

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৫, ০৭:৩৭ এএম

সংরক্ষিত বনে মচমচে পাতার স্তূপ। গহীন গজারি বনে যতদূর চোখ যায় শুধু ঝরা পাতার দেখা মেলে। মাঘের শেষেই ঝরতে থাকে পাতাগুলো। এক সময়ের গাঢ় সবুজ পাতা বিবর্ণ হয়ে বাদামি রঙ ধারণ করে ঝরে পড়ে। ফের নতুন পল্লবে কচি পাতায় রূপসী হবে বনের গাছপালা। এটিই বনের প্রকৃত রূপ। কিন্তু সেই নিরালা আর মসৃণ বনে এক ভয়াল থাবা আসে ফাগুনে। শীতের মৌসুম শেষে ফাল্গুন মাস এলেই সংরক্ষিত বনের বুকে জ্বলে দাউ দাউ আগুন। এমন ঘটনা নিয়মিত দেখা যায় গাজীপুরের শ্রীপুরের সংরক্ষিত বনের ভেতর। মচমচে ঝরা পাতাগুলো পুড়ে ছাই হয় দিনের পর দিন। আর এ সুযোগে বনখেকোরা নানা কৌশলে বনের গাছ, ডালপালা লুট করে।

স্থানীয়দের দাবি, বনের কোনো এক প্রান্তে কেউ নিজস্ব সুবিধা আদায়ে আগুনের ফুলকি ছুড়ে দেয়। তাতেই নীরবে গহীন বনের ভেতর পুড়ে ছাই হয়ে যায় গাছাপালা। কখনো কখনো চোখের সামনেই জ¦লে দাউ দাউ আগুন। কিন্তু কেউ এগিয়ে গিয়ে নেভায় না।

চলতি বছরের মাঘের শেষ থেকে ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময় শ্রীপুর পৌরসভাসহ উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের অন্তত ১০০ পয়েন্টে সংরক্ষিত বনে আগুন জ্বলার চিত্র দেখা গেছে। শুধু বনকর্তাদের চোখে পড়ে না আগুনের ভয়বহতা। তাদের কাছে বন পোড়ার আসল চিত্রের কোনো তথ্য নেই। তাদের কথা একটাই, লোকবল সংকটে সেবা নিশ্চিত করতে তারা নিরূপায়।

সাধারণ মানুষের অভিযোগ, বন বিভাগের একটি অসাধু চক্রের আশকারায় বনে আগুন দেয় দখলবাজরা। গাছ চোরেরাও এ সুযোগ কাজে লাগায়। এর ফলে আস্তে আস্তে সংরক্ষিত বন মানুষের দখলে নিতে সহজ হয়। তাদের অভিযোগ, দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত ভাওয়াল বনাঞ্চলের আরেক আতঙ্কের নাম অগ্নিকা-। এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শাল-গাজারি বনে প্রায়ই অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে। এতে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বনের গাছপালা, লতাগুল্ম ও জীববৈচিত্র্য।

সরেজমিনে ঘুরে উপজেলার গোসিংগা এলাকার সংরক্ষিত বনের নারিশ, বাউনী, হায়াতখার চালা, চাউবন বেড়াবাড়ি, বিন্দুবাড়ি, ইজ্জতপুর, রাজেন্দ্রপুর, রাজাবাড়ি, সিমলাপাড়া, বদনীভাঙ্গা, শৈলাট, জিওসি, তেলিহাটি, টেংরা মোড়, সিসিডিবি এলাকা, পোষাইদ, নিমাইচালা, সিংরাতলী, কর্ণপুর, সাতখামাইর, বারতোপা, ইন্দ্রপুরসহ সংরক্ষিত বনের অন্তত ১০০ পয়েন্টে আগুন জ্বলার চিত্র চোখে পড়ে। এসব আগুন দেখে স্থানীয়রা বন বিভাগের লোকজনকে খবর দিলেও তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

স্থানীয় সমাজকর্মী খোরশেদ আলম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই সংরক্ষিত বনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে চলেছে। বিশেষ করে শীতের শেষে এ আগুনের মাত্রা বেড়ে যায় শতগুণ। এ সময় বনের মধ্যে ঝরা পাতার স্তূপ থাকে, আর তাতেই সহজে আগুন ধরিয়ে দিলে তা জ্বলে মাস জুড়ে। বেশ কয়েকটি অসাধুচক্র বনের জমি দখল করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বনে আগুন দেয়।’

শ্রীপুর রেঞ্জের বিট অফিসার মোকলেছুর রহমান বলেন, ‘একটি অসাধু চক্র আগুন দিয়ে বন ধ্বংস করে। তারা বনভূমি দখল করার জন্য কৌশলে এ কাজগুলো করে থাকে। এ ছাড়া বন থেকে পুড়ে যাওয়া ডালপালা সংগ্রহ ও আগুনে পুড়ে যাওয়া পাতার ছাই জমিতে সার হিসেবে ব্যবহারের জন্যও কেউ কেউ আগুন দেয়। এ বছর আগের অন্যসব বছরের তুলনায় অনেক কম আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এ বছর ১০-১২ হেক্টর বন আগুনে পুড়েছে বলে ধারণা করছি।’

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) শারমিন আক্তার বলেন, ‘গাজীপুর ও শ্রীপুর এলাকায় স্থানীয়দের নিয়ে আমরা বেশ কয়েকটি জনসচেতনতামূলক সেমিনার করেছি। এ ব্যাপারে মানুষকে আগে সচেতন হতে হবে। সংরক্ষিত বনে আগুন দেখলেই ফায়ার সার্ভিসকে খবর দিতে পারেন স্থানীয়রা। এতে জাতীয় সম্পদ বন রক্ষায় ভূমিকা রাখা যাবে বলে মনে করছি।’ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত