প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও কবি হিসেবে রাজু আলাউদ্দিন নন্দিত ও বন্দিত সৃজনশীলতা ও মননের এক অনন্য ভুবন নির্মাণের কারণে। দুই বাংলায় তিনি আমাদের একমাত্র বোর্হেস-বিশেষজ্ঞ। তার কবিতা ও প্রবন্ধ ইতিমধ্যে ইংরেজি, সুইডিশ এবং স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। কর্মজীবনের শুরু থেকেই তিনি সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত, কিছু বছর বিদেশেও কাটিয়েছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪৪ পেরিয়ে গেছে। রাজু আলাউদ্দিন একজন সমকালীন ও সংস্কৃতিবান্ধব স্বাধীনচেতা মানুষ। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অসংগতির ব্যাপারে তিনি আগাগোড়াই সোচ্চার ও স্পষ্টভাষী। প্রমাণ পেলাম এবার বইমেলায় গিয়ে, দেখি, তিনি ব্যানার হাতে সবান্ধব দাঁড়িয়ে আছেন একজন কবি ও শিক্ষককে রিমান্ড ও কারাগার থেকে মুক্ত করার ক্ষিপ্ত ও দুর্দম অভিপ্রায় নিয়ে। এক কবিকে জেলে রেখে আরেক কবিকে নিয়ে শহীদ মিনারে ফেনা তোলেন (সংস্কৃতির) রাবণ। কী সেলুকাস! দেশে এই মুহূর্তে এত এত মানুষবিরোধী কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাই বলে এত রক্তপাত, লড়াই বৃথা যেতে পারে না। একটা ইনক্লুসিভনেস সমাজের নিরেট, বিস্তারিত আখ্যানের জন্য লড়াই চলমান রাখতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিনের চেতনার ভূমি বিশ্বময় বিরাজিত। ‘মার্কেসযাপন ও কলম্বিয়া ভ্রমণ’ বইটি তার তেমনই একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এটি মূলত গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে গভীর ও নিবিড়ভাবে জানা, চেনা ও বোঝার বই। এখানে আছে মার্কেসের লেখার অনুবাদ, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন কয়েকটি আলোচনা, সালমান রুশদি, ব্রাউলিও পেরালতা ও মানুয়েল ওসোরিওর মতো লেখকদের সঙ্গে মার্কেসের আলাপচারিতা এবং জীবনপঞ্জিসহ কলম্বিয়া ভ্রমণের এক বর্ণিল আখ্যান।
কাফকা প্রাণিত কথাসাহিত্যিক মার্কেস জীবনের বেশিরভাগ সময় বসবাস করেছেন মেক্সিকো এবং ইউরোপে। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের সবচেয়ে আলোচিত, প্রভাবশালী লেখক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তার গল্প-উপন্যাসে লাতিন আমেরিকার ইতিহাসের রূঢ় বাস্তবতার উপকথা, কিংবদন্তি, পুরাণ, স্মৃতিচারণ ও কুসংস্কার একই সুতায় গাঁথা। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মনদীর মাঝি’ (১৯৩৬) উপন্যাসের সঙ্গে ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’র (১৯৬৭) তুলনামূলক আলোচনাটি চমৎকার। অনেক দিক থেকে মানিক অনেক এগিয়ে ছিলেন, যা রীতিমতো বিস্ময়কর। দুটো উপন্যাসের মধ্যে কিছু মিলও আছে, তবে দুজনের শিল্পীমন ও শিল্পদর্শনের ঐক্য ও যোগসূত্র এমন যা ভাষা ও ভৌগোলিক দূরত্বকে ভেদ করে দুজনই অভিন্ন বিন্দুতে এসে মিলেছেন। বামপন্থি মার্কেস রক্ষণশীল বোর্হেসকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দ্বিধাদীর্ণ ও সংশয়াচ্ছন্ন ছিলেন। হেমিংওয়ে, হুয়ান রুলফো, হুলিও কোর্তাসার প্রমুখকে নিয়ে প্রবন্ধ থাকলেও নিত্য পাঠ করা বোর্হেসকে নিয়ে মার্কেস একটাও প্রবন্ধ লেখেননি। তিনি বলেছেন, ‘এটা অনস্বীকার্য যে, ভালো লেখক মানেই বামপন্থি। সর্বোচ্চ ব্যতিক্রমটিও বিরাট : হোর্হে লুইস বোর্হেস।’ আলেহ কার্পেন্তিয়ের, আস্তুরিয়াসের মতো মার্কেসও কেন বোর্হেসকে শেকড়হীন মনে করতেন, এটা কি ঈর্ষা নাকি সহজাত তা রাজু আলাউদ্দিন স্পষ্ট করে বলেছেন। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর মার্কেস বলেছেন, ‘বোর্হেসের সাহিত্যকর্মের বিরাট মূল্যকে স্বীকার করা আর ডানপন্থি ধারণা প্রকাশ করার কারণে তাকে নোবেল পুরস্কার না দেওয়াটা এক বিরাট ভুল... এক শতাব্দীর মধ্যেই বোর্হেস, কানেত্তি কিংবা মার্কেস তাদের রাজনৈতিক ধারণার জন্য নয়, বরং স্মরণ করা হবে তাদের কাজের জন্য। প্রকৃত লেখক, প্রকৃত স্রষ্টার ক্ষেত্রে রাজনীতি সব সময়ই বাড়তি এক মূল্য।’
আরাকাতার রেস্তোরাঁর সেই মেয়ে ওয়েটারের প্রাণস্পর্শী
আতিথেয়তা লেখকের প্রেমমহল উন্মাতাল করে দেয়। সংস্কৃতি নিয়ে লেখকের ছুঁৎমার্গ নেই, খাবারের ব্যাপারেও, ‘উচ্চবর্গীয় থেকে নিম্নবর্গীয়, অখাদ্য থেকে সুখাদ্য, হারাম থেকে হালাল, সবই প্রায়-কেবল একটাই শর্ত : সুস্বাদু হতে হবে।’
আরাকাতাকা নিয়ে লেখকের যে ব্যাকুলতা ছিল, তাক-লাগানিয়া ছিল, সেটা কেটে গিয়ে বেড়ে যায় বিস্ময় ‘মার্কেসের কারণে এ গ্রামটির অলিগলি, প্রতি রাস্তা, প্রায় প্রতিটি বাড়ি তার নিজস্ব ইতিহাস নিয়ে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।’
কলম্বিয়ার স্থানীয় লেখকদের সঙ্গে রাজু আলাউদ্দিনের সখ্য ও হৃদ্যতা, তার কবিতা পাঠের আয়োজন করা, সম্মানী প্রদান বিষয়গুলো আপামর বাঙালির জন্য আত্মশ্লাঘার।
সিনেমা নিয়ে মার্কেস কিছুটা উন্নাসিক ছিলেন। তিনি চাইতেন না তার কোনো লেখা সিনেমা হোক। তিনি চাইতেন, শব্দের মাধ্যমে পাঠকদের সঙ্গে তার যোগাযোগ অব্যাহত থাক। তা ছাড়া প্রযোজকদের তিনি ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারতেন না। তার মনে হতো, প্রযোজকরা কেবল টাকার কথা বলে, এরা অভাবিত, অনির্ভরশীল, কেবল লম্বা লম্বা কথার লোক। তিনি বলেছেন, ‘খুব বাজে উপন্যাস নিয়ে অনেক ভালো সিনেমা হতে দেখেছি, কিন্তু ভালো উপন্যাস নিয়ে কখনোই ভালো সিনেমা হতে দেখিনি।’
মার্কেস সাহিত্যের চেয়ে সংগীত বেশি ভালোবাসতেন। তিনি মনে করতেন, জনপ্রিয় সংগতিই বেশি পরিশীলিত। তিনি ক্যারিবীয় উপকূলের ঐতিহ্যবাহী কান্তোস বাইয়েনাতো মুগ্ধ হয়ে শুনতেন।
ব্রাউলিও পেরালতা এবং মানুয়েল ওসোরিওর সঙ্গে মার্কেসের আলাপচারিতা জুড়ি মেলাভার। রাজনীতি, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, আগ্রাসন, পুরস্কার, সাংবাদিকতা প্রভৃতি বিষয় উঠে এসেছে। নোবেল পুরস্কার কীভাবে কাকে দেয়, তা নিয়ে মার্কেস অকপটে মতামত ব্যক্ত করেছেন। পত্রিকার সম্পাদকীয় মনোভাব, সাংবাদিকদের পেশাদারত্বের ব্যাপারে তার অভিজ্ঞতা বিশেষজ্ঞের পর্যায়ে পড়ে। তিনি ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ লেখার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে অসাধারণ শৈশবের কথা বলেছেন, যা ছিল কল্পনাপ্রবণ ও কুসংস্কারময়।
তার প্রভাব নিয়ে এ সময়ের আরেকজন প্রথিতযশা লেখক সালমান রুশদির স্মৃতি অমলিন। তিনি কার্লোস ফুয়েন্তেসের বরাত দিয়ে বলছেন, ‘তুমি হয়তো জানো, One hundred Years of solitude-এর কথা না ভেবে আমাদের কারোর পক্ষেই Solitude শব্দটা এখন উচ্চারণ করা অসম্ভব।’
অন্যান্য খ্যাতিমানদের মতো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বিতর্ক ছিল না। একমাত্র স্ত্রী মের্সেদেস বার্চা, দুটি ছেলে এটাই জানত পৃথিবীর মানুষ। কিন্তু সম্প্রতি ইন্দিরা নামের মেয়ের হদিস পাওয়া গেছে। কে ইনি? কোথায়? কীভাবে? রাজু আলাউদ্দিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তার হদিস দিয়েছেন, যা জেনে পাঠক পুলকিত হবেন। এডিথ গ্রসম্যান বলেন, ‘মার্কেস যা লিখেছেন তার সবই সোনা।’ নিজস্ব সাহিত্যভাবনা ও শৈলীতে গোটা সাহিত্যবিশ্বকে প্লাবিত করে রেখেছেন মার্কেস; অনতিক্রম্য তিনি। মার্কেসে আছে স্বদেশ, মহাদেশ, মানুষ এবং মানুষের ছন্দ; বিশাল জনগোষ্ঠীকে শাসন করার মতো অসাধারণ ক্ষমতা আর কোনো লেখকের নেই। স্প্যানিশ সাহিত্য-বিশেষজ্ঞ রাজু আলাউদ্দিনের ‘মার্কেসযাপন ও কলম্বিয়া ভ্রমণ’ বইটি মার্কেসের লেখকসত্তার সমগ্রতার বাইবেল বলা যায়। লেখক ও বোদ্ধা পাঠকদের জন্য এটি একটি অনিবার্য গ্রন্থ।
