গান সবাই পছন্দ করে। রুচি বা পছন্দের ভিন্নতার পরও, সব শ্রেণির মানুষ গান শুনতে ভালোবাসে। সব রকম গান সবার ভালো না-ও লাগতে পারে। প্রত্যেকের ভালোলাগার রকমফের নিশ্চয়ই রয়েছে। বিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপীয়র বলেছিলেন, ‘যে গান পছন্দ করে না, সে মানুষও খুন করতে পারে।’ গানকে হৃদয়বান সব মানুষই নিশ্চয় ভালোবাসে। সে কারণেই গানের চাহিদা অফুরন্ত, চাহিদার শেষ নেই। একটি জাতির সাংস্কৃতিক মান নির্ধারণে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রগামিতার বিষয়টিকে বিবেচনায় নেওয়া হয়। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আমাদের সাংস্কৃতিক শাখা-প্রশাখাকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, গান সবচেয়ে জনপ্রিয়। এই ভূখণ্ডে এ যাবৎ সংঘটিত সব আন্দোলন-সংগ্রামকে কেন্দ্র করে অজস্র গান, নাটক ইত্যাদি রচিত হয়েছে। জনপ্রিয়তাও পেয়েছে। গান কেবল ব্যক্তিগত ভালোলাগা ভাবাবেগে সীমাবদ্ধ নয়। গানের বহুমাত্রিক আবেদন ও ভূমিকা রয়েছে। প্রত্যেক দেশেরই রয়েছে পৃথক পৃথক জাতীয় সংগীত, রণসংগীত, দেশাত্মবোধক দেশপ্রেমের গান। জাতীয় পর্যায়েও গানের গুরুত্ব অপরিসীম। গ্রামীণ প্রান্তিক জীবনের সঙ্গে মিশে আছে লোকসংগীত। অঞ্চলভেদে লোকসংগীতের নানা রকমফের রয়েছে। ধর্মাশ্রয়ী আধ্যাত্মিক. মরমী, মুর্শিদী, বাউল, কীর্তন, ভজন, শরীয়তী, মারফতিসহ অনেক ধরনের গান। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুল প্রসাদ, ডিএল রায়, রজনীকান্ত, লালন, হাছন রাজা প্রমুখের গানও আমাদের গানের ভাণ্ডারকে ঋদ্ধ করেছে। শহরের মধ্যবিত্তরা আধুনিক গানের প্রতি অধিক অনুরক্ত।
আধুনিক গানের ব্যাপকতা সর্বাধিক। রেডিও, টিভি, চলচ্চিত্র সর্বত্রই আধুনিক গানের আধিক্য। প্রচার মাধ্যমগুলোতে প্রচারিত গান যে পছন্দের ক্ষেত্রে সর্বজনীন, সেটা কিন্তু নয়। পছন্দের গান শুনতে এক সময়কার কলের বাজনা, পরবর্তীকালে চেঞ্জার, টেপ রেকর্ডার, সিডি প্লেয়ার এবং বর্তমানে অধিক জনপ্রিয় সহজলভ্য ইউটিউবে অনায়াসে শোনা যায়। প্রচারযন্ত্রগুলোর পাঁচমিশালি অনুষ্ঠানের ফাঁকে গানের অনুষ্ঠানও হয়। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এখন মানুষ পছন্দের শিল্পীর গান ইউটিউবে সার্চ দিয়ে সহজেই শুনতে পারে, এমন কি দেখতেও পারে। মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট যুক্ত থাকায় ইউটিউব ব্যবহারে আর কোনো বাধা নেই। যেহেতু প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যন্ত ইন্টারনেট মোবাইলের বিস্তার ঘটেছে। এক সময় চলচ্চিত্রই ছিল বিনোদনের সর্বাধিক জনপ্রিয় মাধ্যম। চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় গানগুলোই মানুষের মুখে মুখে ফিরত। এখন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ক্রান্তিকাল। মানুষ প্রেক্ষাগৃহ এক প্রকার ত্যাগই করেছে। চলচ্চিত্রের দর্শক আকালের প্রধান কারণই হচ্ছে চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক অতিমাত্রার মুনাফার লোভ-লিপ্সা। স্থূল রুচিহীন চলচ্চিত্রের কারণে দর্শক ছবি দেখা ত্যাগ করেছে। অথচ একসময় বিনোদনে চলচ্চিত্র নির্ভর ছিল সিংহভাগ মানুষ। সে সব জনপ্রিয় ছবির গান মানুষের মুখে মুখে ফিরত। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পের ছিল স্বর্ণযুগ। স্বাধীনতার পর ক্রমান্বয়ে স্বর্ণযুগের অবসানে চলচ্চিত্র শিল্প এখন ম্রিয়মাণ। লাহোরের উর্দু ছবিকে পেছনে ঠেলে আমাদের বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত ছিল। অথচ প্রতিযোগিতাহীন সময়কালে চলচ্চিত্র শিল্প আর দাঁড়াতেই পারল না, মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।
১৯৪৭-এর মধ্য আগস্টের দেশভাগের পর হতে ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের পাক-ভারত যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘকাল আমাদের এখানে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বই, সাময়িকী, পত্রিকা এবং বোম্বের হিন্দি এবং কলকাতার বাংলা ছবির বিশাল বাজার গড়ে উঠেছিল। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় আইয়ুব খান ভারতীয় সব প্রকাশনা ও চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা গানকে কিন্তু ঠেকানো সম্ভব হয়নি। রেডিও, রেকর্ডে, টেপ রেকর্ডারে শ্রোতাদের গান শোনা থেকে বঞ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কলকাতার বাংলা গানের কিংবদিন্ত শিল্পী হেমন্ত, সতীনাথ, কিশোর কুমার, মান্না দে, আরতি ভাট্টাচার্য্য, সলিল চৌধুরী, জগন্ময় মিত্র, শ্যামল মিত্র, লতা মুঙ্গেশকর, মানবেন্দ্র, ভূপেন হাজারিকা, চিন্ময়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, সাগর সেন, তালাত মাহমুদ, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সহ অজস্র শিল্পীর বাংলা গান আমাদের এখানে ছিল জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। পশ্চিম বাংলার চলচ্চিত্রের মতো বাংলা গানও তার অতীত ঐতিহ্য-মান হারিয়ে এখন দিশাহীন। মুম্বাই-দক্ষিণের চলচ্চিত্রের রিমেক নির্মাণের পাশাপাশি হালের হিন্দি গানের বেগবান স্রোতে বাংলা গানের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলা গানের কথা ও সুর হারিয়ে গেছে। সমৃদ্ধ বাংলা গানের স্বতন্ত্রও টিকে থাকেনি। বাংলা গানের চাহিদা-কদরও আর সেখানে নেই। হিন্দি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে বাংলা গান এখন হিন্দির একচ্ছত্র দখলদারিত্বে। সার কথা হচ্ছে, বাঙালির প্রদেশ পশ্চিম বাংলা হিন্দি সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের কবলে এখন নিমজ্জিত, একইভাবে সেখানে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিও বিস্তার লাভ করেছে।
টিভিতে পছন্দের গান শোনা সম্ভব হয় না। পশ্চিম বাংলার দর্শকদের বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখার সুযোগ না থাকলেও, আমাদের দেশে ভারতীয় চ্যানেলের রমরমা সম্প্রচার চলছে। এতে হিন্দি চ্যানেলের চাহিদা-কদরই সর্বাধিক। ঢাকায় মাত্র কটি ভারতীয় বাংলা চ্যানেল রয়েছে। তারা মিউজিক চ্যানেলটিতে বাংলা গান বলতে রবীন্দ্রসংগীত সর্বাধিক সম্প্রচারিত হয়। কালেভদ্রে নজরুল গীতি। বাঙালি শিল্পীদের মুখে হরহামেশা হিন্দি গানের সম্প্রচারে তারা মিউজিক চ্যানেলটি শ্রোতা-দর্শকপ্রিয়তা লাভে ব্যর্থ হয়ে পড়েছে। সিনেমার চ্যানেলগুলোতে যেসব বাংলা ছবি প্রদর্শিত হয়; সেগুলোর সিংহভাগ হাল আমলের মারদাঙ্গা ছবি। মুম্বাই-দক্ষিণের ছবির রিমেক। টালিগঞ্জের স্বর্ণযুগের সাদাকালো বাংলা ছবির সম্প্রচার তেমন হয় না। হয়তো পশ্চিম বাংলার দর্শকদের রুচির কথা বিবেচনা করেই বাংলা সিনেমার চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অতীতের ছবির বদলে হালের স্থূল, দাঙ্গা প্রধান ছবির লাগাতার সম্প্রচার করে থাকে। ‘একটি জাতিকে সাংস্কৃতিকভাবে পরাধীন করার ক্ষেত্রে ভাষা-হরণ হচ্ছে সর্বোচ্চ উপায় বা কৌশল। যেটা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপর চেষ্টা করা হয়েছিল। ওই কাজটি অত্যন্ত সুকৌশলে প্রয়োগ করেছিল ভারতের শাসক শ্রেণি। All Indian One Nation অর্থাৎ সব ভারতীয় এক জাতি তকমা এঁটে। বাস্তবে ভারত বহুজাতির দেশ। প্রতিটি জাতির রয়েছে পৃথক ভাষা ও সংস্কৃতি। কারও সঙ্গে কারও মিল নেই। সর্বভারতীয় প্রচার ও প্রতিষ্ঠার টানে মাতৃভাষা পরিত্যাগের হিড়িক যেমন দেখা যায়, তেমনি দক্ষিণ ভারতের তামিল, অন্ধ্র, কর্নাটক, কেরালা চার রাজ্যের মানুষের তীব্র জাতীয়তাবোধে বিস্মিত হতে হয়। তামিল, কন্নর, মালায়ালম, তেলেগু ভাষার বিকল্প ভাষা হিসেবে রাষ্ট্রের সরকারি ভাষা হিন্দির পরিবর্তে ইংরেজি ভাষাকে তারা গ্রহণ করেছে, হিন্দি বিদ্বেষে।
কোনো মানুষই সংস্কৃতিবিহীন নয়। সংস্কৃতি জাতীয়তার পরিচয়ন বহন করে। বলা বাহুল্য জাতীয়তার প্রধান উপাদান হচ্ছে ভাষা। ভাষা সংস্কৃতির অনিবার্য অংশ। ভাষা আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ভাষাই আমাদের নিকটবর্তী করে তোলে। পরস্পরের যোগাযোগ, আদান প্রদানে, চিন্তার বিনিময়ে ভাষার বিকল্প নেই। নিজ মাতৃভাষায় যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে-সাবলীলভাবে পরস্পরকে একাত্ম করতে পারে ভিন্ন ভাষায় সেটা সম্ভব যদি হয়ও তবুও প্রাণবন্ত হয় বলা যাবে না। তাই ভাষা প্রতিটি মানুষের জন্য অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবেই যোগাযোগের, আদান-প্রদানের সর্বজনীন মাধ্যম।
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। দেশের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ বাঙালি। পাশাপাশি কিছু ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষও এদেশে বসবাস করে। যাদের আমরা উপজাতি বলে থাকি। তারাও অনিবার্যরূপে জাতি। ক্ষুদ্র বলেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যে মূলধারা বিচ্যুত উপজাতি বলে তাদের অবজ্ঞা করে থাকি। সেটা জাত্যভিমান ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তাদের জাতিসত্তাকে অবশ্যই আমাদের স্বীকার ও স্বীকৃতি দেওয়া বাঞ্ছনীয়। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর ভিত্তিতে বিবেচনা করা অন্যায় বলেই মনে করি। নয়তো ক্ষমতার দাম্ভিকতায় পাকিস্তানি শাসক থেকে আমাদের পার্থক্যটা রইল কোথায়! ভাষা প্রতিটি জাতিসত্তার জন্মগত অধিকার। এই অধিকার হরণের অজস্র ঘটনা বিশ্বব্যাপী ঘটে চলেছে। ভাষার আধিপত্যে বিশে^ জাতীয়তার সংকটে বিভিন্ন ভাষাভাষীরা আক্রান্ত হচ্ছে। যেমনটি আমাদের মাতৃভাষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে উর্দু ভাষা চাপানোর চেষ্টা হয়েছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পরপরই। আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলে মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিলাম, ত্যাগ আত্মত্যাগে। আমরা জয়ী হয়েছিলাম। বিশ্বের প্রচুর দেশে ভাষার সংগ্রাম কিন্তু চলেছে এবং ক্রমাগত চলছে।
জাতীয়তার মীমাংসাটা তাই প্রাথমিক। জাতীয়তার মীমাংসাকে অসম্পূর্ণ রাখার ফলে বহু দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। সংখ্যাগুরু ও সংখ্যালঘুর জাতি-বৈষম্যের ভিত্তিতে। জাতিগত নিপীড়নের মুখে বাধ্য হয়ে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম গণতান্ত্রিক এবং সশস্ত্র পন্থায় বিভিন্ন দেশে বিরাজ করছে। ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণি তাদের বাণিজ্যের অভিপ্রায়ে অভিন্ন ভাষার বলয় গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে পরাধীন ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে যুক্ত করে হিন্দি ভাষার প্রচার ও প্রসারে অজস্র কর্মকাণ্ড করেছিল। স্বাধীন ভারতে হিন্দি সরকারি ভাষার স্বীকৃতি লাভে তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণ হলেও, হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে বিজেপি সরকারের ঘোষণা ও তৎপরতার পেছনে পুঁজিবাদী গোষ্ঠীর আশীর্বাদ কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। ভাষা আন্দোলনই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সূতিকাগার। ভাষা আন্দোলনই আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের পথে এগিয়ে নিয়েছে। তাই প্রকৃতভাবে বলতে গেলে বলা যায় স্বাধীনতার মাসে শুধু এটুকুই চাওয়া, আমরা যেন নিজস্ব সংস্কৃতি-ঐতিহ্য এবং সংগ্রামকে হৃদয়ে ধারণ করি। বাংলাদেশ নিজস্ব পরিচয়ে এগিয়ে যাবে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
