রমজান মানেই ইফতারের এলাহি আয়োজন। এখন অনেক রেস্টুরেন্ট এবং তারকা হোটেলে রকমারি বাহারি ইফতারির পসরা সাজানো থাকে; আর নগরবাসীও এসব ইফতার কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বিকেল ৪টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় ইফতারির বাজার। তিন থেকে চার দশক আগেও কি এমন চিত্র ছিল? ইফতারিতে সেকাল ও একালের চিত্র তুলে ধরতেই দেশ রূপান্তরের বিশেষ আয়োজন
ভূঁইয়া নজরুল, চট্টগ্রাম
ইফতার এখন উৎসবে পরিণত হয়েছে। একসময় ঘরে তৈরি ইফতারি পণ্যের কদর থাকলেও এখন কে কোন রেস্টুরেন্ট বা হোটেল থেকে ইফতারি এনেছে তাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুবিলী রোডের রয়েল বাংলার জিলাপি কিনতে নগরবাসী যেভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে; মনে হয় যেন মারামারি লেগে যাবে। মানুষের হাতের চেয়ে জিলাপিও কম মনে হয়। ‘আমাকে দেন, আমাকে দেন’ এই চিৎকার চেঁচামেচি যেন দুপুরের পর থেকে ইফতারের আগ পর্যন্ত চলতেই থাকে। রয়েল বাংলার জিলাপি কিনতে যখন মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা তখন স্টেডিয়াম পাড়ার রোদেলা বিকেলের ১ হাজার ২০০ টাকা কেজির জিলাপি কিন্তু একটি শ্রেণির ক্রেতারা ঠিকই কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহরের সেকাল ও একালের ইফতারির চিত্র বর্ণনা করতে গিয়ে ইতিহাস গবেষক ও ইতিহাসের খসড়ার সম্পাদক মুহাম্মদ শামসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮০-এর দশকে এই নগরের বর্তমান ব্যস্ততম ওয়াসা মোড়, কাজীরদেউড়ি, জামালখান ও আন্দরকিল্লা এলাকায় হাতেগোনা কয়েকটি রেস্তোরাঁ ছিল। ওয়াসা মোড়ের ব্রাহ্মণবাড়ীয়া হোটেল, চেরাগী পাহাড়ে চেরাগী হোটেল, ূেমামিন রোডে দস্তগীর হোটেল ও আন্দরকিল্লায় চৌরঙ্গী হোটেল ছিল। সেগুলোতে চনাবুট, পেঁয়াজু, বেগুনি বিক্রি হলেও মানুষ ঘরে তৈরি করা ইফতারিতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত।
তিনি আরও বলেন, এখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যেমন বেড়েছে তেমনিভাবে বিভিন্ন শ্রেণির উপযোগী রেস্তোরাঁও বেড়েছে। ঘরের তৈরির ইফতারির পাশাপাশি রেস্তোরাঁ থেকে কিনে আনার প্রথাও এখন চালু হয়েছে এবং এখন এটা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে।
পাঁচতারকা হোটেল র্যাডিসন
ল্যাম্ব কাবাব, বিফ আখনি, ফ্রায়েড ফিসের পাশাপাশি মাটন তেহারি এবং মধ্যপ্রাচ্যের মিষ্টান্ন বাকলাভা ও রেশমি জিলাপির সমাহার চট্টগ্রামের একমাত্র পাঁচ তারকা হোটেল র্যাডিসনে। এগুলোর পাশাপাশি রয়েছে নানা পদের হালিম, চিকেন চাপ, ফিশ কাটলেট, টেংরি কাবাব, আফগানি কাবাব, মাশরুম তন্দুরি। এসব আইটেমের সঙ্গে রয়েছে প্রচলিত পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, ফিরনি, গুলাব জামুনসহ দেশি-বিদেশি ৪১ আইটেমের পণ্য।
চার তারকা হোটেল পেনিনসুলা
বারবিকিউ চিকেন, চিকেন তন্দুরি, কাবাব, হালিম, ফিরনি, জিলাপি, শ্রীলঙ্কান চিকেন রোল, চিকেন স্টিক রোল, দই কাবাব, লাচ্ছি, তেহারিসহ দেশি-বিদেশি আইটেম দিয়ে ইফতারির পসরা সাজিয়েছে চার তারকা হোটেল পেনিনসুলা চিটাগং। এখানে বসে খাবারের পাশাপাশি পাঁচ আইটেমের ইফতার বক্স রাখা হয়েছে গ্রাহকদের জন্য। অর্থাৎ যারা এখানে বসে না খেয়ে পরিবারের জন্য কিংবা গিফট দেওয়ার জন্য নিতে চাইবেন সেই সুযোগ রয়েছে। সর্বনিম্ন প্যাকেজ ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত রয়েছে।
বারকোডের ইফতার বাজার
কেউবা প্রচলিত ইফতারির মেনুর পরিবর্তে পশ্চিমা, চীনা, কোরিয়ান কিংবা মালয়েশিয়ান টেস্ট পেতে ভিড় করছে মুরাদপুরে বারকোডের ইফতার বাজারে। সেখানে ইফতারের দীর্ঘ সারি যেন শেষই হতে চায় না। ২০০ আইটেমের ইফতারি নিয়ে সাজানো এই বারকোডে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের মাংস যেমন রয়েছে তেমনি চিকেনের চোপা রুস্তম, চিকেন সিক কাবাব, মোরগ মালাই কাবাব, তন্দুরি মাশরুম, অ্যারাবিয়ান গ্রিলড চিকেনসহ নানাবিধ আইটেম। বারকোডের ম্যানেজার (অপারেশন) কিং মারমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এখানে দেশি-বিদেশি সব আইটেমের ইফতারি রেখেছি। শুধু ফিস আইটেম রয়েছে ২০ ধরনের। এ ছাড়া মাংস ও মিস্টি তো রয়েছেই। আর সব আইটেম আমরা এখানেই তৈরি করে সঙ্গে সঙ্গে সার্ভ করছি। সম্পূর্ণ ফ্রেশ খাবারের আয়োজন।
রোদেলা বিকেল
ভোজন রসিকদের পছন্দের শীর্ষে থাকা স্টেডিয়াম পাড়ার রোদেলা বিকেলে রয়েছে বাহারি ইফতারি আইটেম। নিজেদের জিলাপি, ফিরনি ও সেমাইয়ের সিগনেচার আইটেমের পাশাপাশি রয়েছে দেশি চিকেন হালিম, মাটন হালিম, চিকেন তন্দুরি, বিরিয়ানি, চিকেন ললিপপ, শামি কাবাব, মাটন পায়া, মাটন লেগ কোরমা, বিফ আখনি বিরিয়ানি। জিইসি মোড়ের ওয়েল পার্ক রেসিডেন্সে রয়েছে আরবের ১৬টি বিশেষ আইটেম। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মানুষের পছন্দের খাবারগুলো এখানে পরিবেশন করা হয়। এসবের পাশাপাশি রয়েছে হালিম, বিরিয়ানি, আখনি, বিফ তেহারি, জিলাপি, ফিরনিসহ নানা পদের ইফতার।
বড় আয়োজনের এসব রেস্টুরেন্ট ছাড়াও সাধারণ মানুষের ইফতারির জন্য নগর জুড়ে থাকা রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন ব্র্যান্ডের আউটলেটগুলোতে থাকে বিভিন্ন ইফতারির সমাহার। নগরীর অ্যামব্রোশিয়া, সিলভার স্পুন, কপার চিমনি, গাউছিয়া, ওয়েল ফুড, হাইওয়ে, বনফুল, ফুলকলি, কে বেকারি, ফ্লেভারসের আউটলেটগুলোতে যেমন ইফতারির সমাহার থাকে তেমনিভাবে সুপারশপ উৎসব, খুলশি মার্ট, বাস্কেটে থাকছে ইফতারির বিশেষ আয়োজন।
নগর জুড়ে ইফতারি বাজার
এসবের পাশাপাশি চকবাজার, কাজীর দেউড়ি, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, নিউ মার্কেট, আগ্রাবাদ, হালিশহর, পাহাড়তলী, অক্সিজেন, ওয়াসা মোড়সহ বিভিন্ন এলাকার রেস্টুরেন্টের বাইরে সামিয়ানা টানিয়ে ইফতারের বাহারি পদ নিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। অনেকে ফুটপাতেই সাজিয়েছে ইফতারির পসরা। বিকেল গড়াতেই বিক্রেতাদের নানা হাঁকডাকে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এসব হোটেল-রেস্তোরাঁর বাইরে ভিড় বাড়তে থাকে ক্রেতাদের। আবার বিভিন্ন প্রয়োজনে বের হওয়া ঘরমুখো মানুষও পছন্দের ইফতারি নিয়ে বাসায় ফেরেন পরিবারের কাছে। ক্রেতা-বিক্রেতার হই-হুল্লোড়ে মুখরিত থাকে পুরো ইফতার বাজার। চলছে বেচাকেনাও। এসব এলাকার অস্থায়ী দোকানগুলোতে বিক্রি হচ্ছে সুতি কাবাব, জালি কাবাব, টিক্কাসহ প্রায় ১০-১৫ ধরনের কাবাব। কাবাবের পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে ডিম চপ, পেঁয়াজু, চনাবুট, কাবাবসহ বিভিন্ন ইফতারসামগ্রী। মিষ্টির মধ্যে বিক্রি হচ্ছে শাহি জিলাপি, মিষ্টি, দইসহ নানা খাবার।
