বাংলাদেশ জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের অধীনে জনগণকে সঞ্চয়ী হতে উৎসাহিত করা ও বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় জাতীয় সঞ্চয় স্কিমের মাধ্যমে আহরণ করার উদ্দেশ্যে এবং সাধারণের নির্ঝঞ্ঝাট অর্থ বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করার অন্য নাম সঞ্চয়পত্র। সাধারণ মানুষের হাতে জমানো টাকা লম্বা সময়ের জন্য ফেলে না রেখে ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগে মুনাফা লাভ, দেশের বিশেষ বিশেষ জনগোষ্ঠী যেমন মহিলা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারী, বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং শারীরিক প্রতিবন্ধীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আসার সুযোগ এবং সরকারের সঞ্চয় স্কিমের মাধ্যমে আহরিত অর্থ দ্বারা জাতীয় বাজেট ঘাটতি পূরণ করার সুযোগও এনে দেয় সঞ্চয়পত্র।
সঞ্চয়পত্র করার হার বেড়ে যাওয়া মানে, সরকার জনগণের কাছ থেকে ঋণ পাচ্ছে আর গ্রহীতাদের নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলার হার মানে হচ্ছে সরকারের পুরনো ঋণ শোধ করার চাপ এবং জনগণের, বিশেষত নারী ও অবসরপ্রাপ্তদের জমানো সঞ্চয়ে হাতে দেওয়া। সেই হিসেবে সঞ্চয়পত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি, বিশেষত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার একটি ভালো নির্দেশক। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, দেশে চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি ইতিবাচক ধারায় ছিল। তবে গত নভেম্বরে এসে হঠাৎ এ খাতে বিনিয়োগ কমিয়েছেন সাধারণ মানুষ। ক্রয় বা নবায়নের চেয়ে বেশি অঙ্কে ভাঙা হয়েছে সঞ্চয়পত্র। ফলে এ খাত থেকে ঋণ পাওয়ার বদলে সরকারকে উল্টো আগের ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে। গত ডিসেম্বরে নিট বিক্রি ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা ঋণাত্মক হয়েছিল, নভেম্বরেও নিট বিক্রি ৩ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ঋণাত্মক ছিল। ওই মাসেও কেনার চেয়ে ভাঙানোর চাপ বেশি ছিল। চলতি বছরের শুরুতে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ইতিবাচক ছিল, তবে নভেম্বর থেকেই এই ধারা উল্টে যায়।
এই উল্টে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে। নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার কারণে চাহিদা অনুযায়ী সঞ্চয় করতে পারেনি, বরং কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সঞ্চয়পত্র ভেঙে প্রাত্যহিত খরচ মেটাতে হয়েছে। আবার গত জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ধনী গোষ্ঠীর অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। এ ছাড়া ব্যাংক আমানত ও সরকারের বিল-বন্ডের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিপর্যায়ের বিনিয়োগের একটি বড় অংশ ব্যাংক ও বিল-বন্ডে স্থানান্তর হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের এই নেতিবাচক ধারা আপাতদৃষ্টিতে দুশ্চিন্তার। রাষ্ট্র ও সরকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিক দিয়ে যারা প্রান্তিক শ্রেণিতে আছেন তাদের কিছুটা নিরাপত্তার সুযোগ করে দেয় এই সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। তাদের যদি সেই সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হতে হয় তাতে একদিকে তাদের যেমন আশঙ্কা, অন্যদিকে সরকারের তরফেও ঋণ শোধের চাপ থাকে। দীর্ঘ স্বৈরশাসনের লুটপাটের পর, অর্থনীতিকে সচল রাখতে যেকোনো খাত থেকেই সরকারের তহবিল বৃদ্ধি জরুরি। সঞ্চয়পত্র একটি জরুরি উৎস। আশার কথা, সঞ্চয়পত্রের ইতিবাচক ধারা ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার মুনাফা বাড়িয়েছে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে, যা চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর হচ্ছে। সুদ বাড়ার কারণে গত জানুয়ারি থেকে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়ানো হয়েছে। পরিবার সঞ্চয়পত্রে মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার হার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ থাকলেও এখন এই সঞ্চয়পত্রে সাড়ে ৭ লাখ টাকার কম বিনিয়োগে মুনাফা মিলবে সাড়ে ১২ শতাংশ। আর সাড়ে ৭ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে মুনাফা আসবে ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একইভাবে বাড়ানো হয়েছে পেনশনার সঞ্চয়পত্র, বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফার সঞ্চয়পত্র এবং ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার। সরকার চলতি অর্থবছরে, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর জন্য মুনাফার হার বাড়ানোর পাশাপাশি আরও বেশি মানুষকে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
