জীবন আমার পরিবেশ সবার

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৩৪ এএম

এরশাদ আমলের কথা। তখন স্কুলে পড়ি। পরিচিত এক উচ্চপদস্থ ব্যক্তি বান্দরবানে সরকারি বড় পদে কর্মরত ছিলেন। একবার তার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেখি, দামি কাঠের ফার্নিচারের ছড়াছড়ি। শুধু যে নিজের ফার্নিচার ভালো কাঠ দিয়ে তৈরি করেছেন তাই নয়, শুনেছিলাম প্রচুর টাকা ঘুষের বিনিময়ে অনেক গাছ কাটার অনুমতি এবং সেই সুবাদে ঢাকায় একাধিক বাড়িও করেছিলেন। সে সময় পরিবেশ রক্ষা, গাছ লাগানো এসব নিয়ে তেমন আলোচনা হতো না। তবু সেই সময়েও ‘আরণ্যক’ এবং ‘চাঁদের পাহাড়’-এর মতো বই আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভক্ত হিসেবে বান্দরবানের সেই গাছ কাটার ঘটনা শুনে দুঃখ পেয়েছিলাম। এরপর তো অনেক সময় বয়ে গেছে। বুড়িগঙ্গার টলটলে পানি দূষিত হয়েছে। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমেছে। আর আমাদের নগরী ও দেশ গাছশূন্যতার পথে গেছে।

এ বছর শুনছি, ঢাকাসহ সারা দেশে একাধিক তাপপ্রবাহের আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশ যত সবুজহীন হবে ততই এসব দুর্যোগ বাড়বে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ ধ্বংস হওয়ার কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার অন্যতম বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচার জন্য বিশে^র বড় বড় ও শক্তিধর দেশগুলোর যেমন করণীয় আছে, তেমনি আমাদেরও আছে। চীনে দেখছি, পরিবেশ রক্ষার জন্য গত কয়েক বছরে কি বিপুল কর্মযজ্ঞই না চলছে। চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ইনার মঙ্গোলিয়া। এর অনেকটা অংশ পড়েছে গোবি মরুভূমির মধ্যে। সেই মরুভূমিকে সবুজ করার জন্য গত কয়েক দশক ধরে কাজ করে চলছে চীন। তারা এটার নাম দিয়েছে, সবুজের মহাপ্রাচীর। চলছে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা। অনেকটা সফলও হয়েছে তারা। রুখে দিতে পেরেছে মরুকরণ। মরুভূমিকে সবুজ করে তোলার প্রচেষ্টায় সরকারের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ফলে গাছ লাগানোর কাজে আয়ের পথও খুলে গেছে অনেকের।

শুধু গাছ লাগানো নয়, জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্যও বিপুল কাজ চলছে। বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চীনের সাফল্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এক্ষেত্রে চীনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করছে অনেক দেশ। নদীদূষণ রোধে কাজ চলছে। ইয়াংজি নদীকে দূষণমুক্ত করার প্রচেষ্টা অনেক অগ্রগতি লাভ করেছে। ফলে প্রকৃতির কোলে ফিরছে অনেক বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী। ইয়াংজি নদীর ফিনলেস পরপয়েজ বা নদীর ডলফিন ফিরে এসেছে। চীনের বিখ্যাত জায়ান্ট পান্ডা একসময় বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল। অথচ এখন পান্ডার সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে তাকে ‘ক্রিটিকালি এনডেনজারড’ অবস্থান থেকে বাঁচিয়ে উন্নত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে। তার বিলুপ্তির ভয় কমেছে। পান্ডা সংরক্ষণের জন্য এবং পান্ডার বংশবিস্তারের জন্য চীনাদের উদ্যোগ আয়োজনের অন্ত নেই। চীনের ছাংতু শহরে পান্ডা প্রজনন কেন্দ্রে পান্ডার প্রজনন বৃদ্ধির জন্য চলছে ব্যাপক গবেষণা এবং কার্যক্রম। শুধু তাই নয়, ছাংতুর এই গবেষণাকেন্দ্র এবং অভয়ারণ্য সারা বিশ্বের পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় স্থান। এখানে জায়ান্ট পান্ডা, বিশাল পার্ক, পাহাড় ও গবেষণা কেন্দ্র দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে। ছাংতুর অর্থনীতি নতুন মাত্রা পেয়েছে এই পান্ডা প্রজনন কেন্দ্র স্থাপনের পর থেকে। চীন সরকার পান্ডা বিক্রি করে না। তবে বিভিন্ন দেশের কাছে শুভেচ্ছার নিদর্শন এবং গবেষণা সহযোগিতার জন্য কয়েক বছরের জন্য পান্ডাকে পাঠাতে পারে। কিন্তু তাকে সে রকম উপযুক্ত পরিবেশ ও যত্ন দিতে হয়। পান্ডাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং জনপ্রিয় করতে তথ্যচিত্র, ছবি, ভিডিও, অনলাইনে প্রচার কোনোটারই কমতি নেই। চীনে পান্ডা পুতুল, পান্ডা চাবির রিং থেকে শুরু করে টি-শার্ট, মগ, হেন বস্তু নেই যেখানে পান্ডার ছবি বা ‘আই লাভ পান্ডা’ লেখা নেই। পান্ডার পাশাপাশি অন্যান্য জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের ব্যাপক উদ্যোগ রয়েছে। মিলু হরিণ, টিবেটান অ্যান্টিলোপ, আমুর টাইগার, গোল্ডেন স্নাবনোজড মাংকি ইত্যাদি বিরল প্রজাতির প্রাণী রক্ষায় এখানে রীতিমতো কর্মযজ্ঞ চলছে। উত্তর চীনের হেইলংচিয়াং প্রদেশে বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য। এখানে আমুর টাইগার, আমুর লেপার্ডসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে নির্ভয়ে।

আমি যেখানে থাকি, সেই ইয়ুননান প্রদেশকে বলা হয় আরণ্যক প্রদেশ। এখানে এশিয়ান বন্যহাতিসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও অসংখ্য বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। এসব বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদ রক্ষার জন্য অভয়ারণ্য স্থাপন করা হয়েছে। চীনে বড় আকৃতির অভয়ারণ্য ও প্রাকৃতিক সংরক্ষিত অঞ্চল যেমন রয়েছে, তেমনি শহরের  ভেতরেও গড়ে তোলা হচ্ছে ছোট ছোট সবুজ পার্ক। একেবারে ব্যস্ত রাজপথের সঙ্গেই ছোট্ট একটু জায়গাকে সবুজ করে পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে শহরের অধিবাসীরা কিছুটা সবুজের দেখা পাচ্ছেন। এসব কথা যখন জানতে পারি, যখন প্রত্যক্ষভাবে এদেশে এসব কর্মকাণ্ড দেখতে পাই তখন নিজের দেশের কথা বারবার মনে পড়ে। আমাদের সুন্দরবনের কথাই ধরা যাক। এমন এক অমূল্য সম্পদকে আমরা কীভাবেই না নষ্ট করেছি। সুন্দরবনের মতো একটি অরণ্য গড়ে তুলতে প্রকৃতির লাগে হাজার বছর। আর মানুষের লোভ ও মূর্খতায় তা ধ্বংস হতে পারে অতি কম সময়ে। যখনই এগুলো দেখি, তখনই মনে পড়ে যায় বেচারা দুঃখী-গরিব বাঘমামার কথা। আমাদের রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে সংরক্ষণের জন্য কী করেছি আমরা? চোরাই শিকার করে বাঘের গোষ্ঠী নাশ করেছি। চিড়িয়াখানায় রাখা বাঘের খাবার মেরে দিয়ে বাঘগুলোকে শুকিয়ে মেরেছি। বাঘের আবাস দখল করে ঘরবাড়ি বানিয়ে আর বন ধ্বংস করে বাঘকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছি। বনে খাবার না পেয়ে বাঘ যখন খিদের জ্বালায় লোকালয়ে এসেছে তখন তাকে পিটিয়ে মেরেছি। ভাবতে অবাক লাগে, আমরা কত হতভাগ্য যে, নিজেদের সম্পদ নিজেরা চিনি না। এবং নিজেদের সম্পদ নিজেরাই নষ্ট করি। অথচ এমনি একটি সুন্দরবন ও এমনি রয়েল বেঙ্গল যদি উন্নত দেশে থাকত? সুন্দরবনকে বাঁচিয়ে রেখে পর্যটনশিল্প থেকেই হাজার হাজার কোটি টাকা উপার্জন করা যেত। বেঙ্গল টাইগারকে জনপ্রিয় করে আমরা কি পারতাম না তাদের মাধ্যমে অর্থ আয় করতে? বাংলাদেশের খেলনার দোকানগুলোতে খোঁজ করে দেখুন তো, বাঘের খেলনা কয়টি পাওয়া যায়? যে সফট টয়েজগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোও আসে চীন থেকে। বাংলাদেশে আসা একজন বিদেশি যদি বাঘের ছবি, পুতুল ও অন্যান্য সুভেনির কিনতে চান তাহলে কি দেশের তৈরি উচ্চ মানসম্পন্ন খুব বেশি সামগ্রী পাবেন? বেঙ্গল টাইগারের ওপর তথ্যচিত্র কয়টি হয়েছে? পান্ডার কার্টুন আর পান্ডার ছোট ছোট ছবি ও ভিডিওতে ফেসবুক ভরপুর। বাঘের সে রকম নেই কেন?

ছাংতুর বিখ্যাত পান্ডা প্রজনন কেন্দ্রের মতো খুলনায় বেঙ্গল টাইগার প্রজননের অত্যাধুনিক কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় না? শুধু কি বাঘ? সুন্দরবন উজাড় হলে কত প্রজাতির পশুপাখি আর গাছপালা যে উজাড় হবে তার ইয়ত্তা আছে? ধ্বংস হবে বিশ্বের বিরল ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট। এখন দরকার জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং ইকো ট্যুরিজমকে বিকশিত করা। বাংলার বাঘের ব্র্যান্ডিং করে বিশ্বে একে জনপ্রিয় করে তোলা দরকার। বাঘের বংশবৃদ্ধি ও চোরা শিকারির হাত থেকে এদের রক্ষা করতে হবে। আমরা যদি ঠিকঠাকভাবে বাঘের প্রচার করতে পারি তাহলে সুন্দরবন পর্যটনের জন্য এবং বাঘকে দেখতেই তো বিদেশি পর্যটকরা আসবে। পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতি বিকশিত হতে পারে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশের মাধ্যমে, গ্রিন ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে। ঢাকা মহানগরীর পরিবেশ রক্ষায় সবুজায়নে এখন অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার। ঢাকা শহরের বায়ু ভীষণ দূষিত। অথচ সড়কের আইল্যান্ডগুলোতে নিমগাছ এবং অন্যান্য গাছ লাগিয়ে সবুজ করে তোলা সম্ভব। লাগানো হোক না ফলের গাছ।

এক টুকরো সবুজ কীভাবে পুরো এলাকার দৃশ্যপট বদলে দিতে পারে সেটা তো আমরা হাতিরঝিলেই দেখেছি। কয়েক দশক আগেও বেগুনবাড়ির পেছনের বস্তি ও বদ্ধ জলাশয় ছিল ঢাকার সবচেয়ে কুশ্রী ও অপরাধপ্রবণ অঞ্চল। এখানকার জলাবদ্ধতার ফলে ঢাকায় মশার প্রকোপ বাড়ত। অথচ সেই হাতিরঝিল এখন ঢাকার সবচেয়ে সুন্দর এলাকা। এভাবে অন্যান্য এলাকাকেও গড়ে তুলতে হবে। পুরান ঢাকার পরিবেশ জঘন্য। এখানে সবুজের কোনো চিহ্নই নেই বলতে গেলে। পুরান ঢাকার বিলুপ্ত জলাশয়, পুকুরগুলোকে আবার খনন করে সেগুলোর চারপাশে গাছ লাগিয়ে পরিবেশ উন্নত করা সম্ভব। ধোলাই খালকে আবার বাঁচিয়ে তোলা দরকার। তাহলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাবে ঢাকা। সবসময় আশা জাগে, ধোলাই খালকে আবার বাঁচিয়ে তুলে আমরা আমস্টারডামের মতো ক্যানেল নগরী গড়ে তুলতে পারি কিনা। দরকার বুড়িগঙ্গার পানিকে দূষণমুক্ত করা। নদী খনন করা। আর দরকার সরকারি জমিগুলোকে দখলমুক্ত করে সেখানে গাছ লাগানো, ইকো পার্ক গড়ে তোলা। কিন্তু আমাদের কাজ কারবার হলো, শুধু নিজের ক্ষুদ্র লাভের ব্যবস্থা করা। আমরা নদী আর লেক দখল করে সেখানে মাটি ভরাট করে হাউজিং করি। নাম দিই ‘রিভার ভিউ’, ‘লেক ভিউ’ হাউজিং। মনে হয়, পারলে আমরা বঙ্গোপসাগরও ভরাট করে ‘সি ভিউ’ হাউজিং বানাতাম। এসব থেকে দেশ, পরিবেশকে বাঁচাতে হবে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ধারণা হলো, সবুজ উন্নয়ন এবং পরিচ্ছন্ন শক্তির জ্বালানি। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার এর মধ্যেই সোলার পাওয়ার প্রকল্পে মনোযোগ দিয়েছে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করছে। সেই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার জন্যও দরকার যথাযথ মনোযোগ দেওয়া। অনেক কাজের ভিড়ে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভুলে গেলে চলবে না। সবুজ বিশ্ব গড়ে তুলতে বাংলাদেশ যেন তার করণীয়টুকু সঠিকভাবে করে। আমরা যেন একটি উন্নত সবুজ, পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে সগৌরবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারি।

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক  শিক্ষক, ইয়ুননান বিশ্ববিদ্যালয় কুনমিং, চীন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত