তিন বছরের বেশি সময় ধরে চলমান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিলেও বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে মস্কো। রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছে, তাতে এ সংঘাতের মূল কারণ বলে মস্কোর বিবেচিত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা হয়নি। আর তাই এটি এখন যে রূপে আছে, সে অবস্থায় রাশিয়া এ প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। এ বিষয়টি নিয়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনা স্থবির হয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ এ রুশ কূটনীতিক।
রুশ সাময়িকী ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স এ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ রিয়াবকভ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে মডেল ও সমাধানগুলো প্রস্তাব করেছে আমরা সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। কিন্তু এগুলো বর্তমানে যে রূপে আছে আমরা তার সব গ্রহণ করতে পারব না। তিনি আরও বলেন, আমরা যতদূর দেখতে পাচ্ছি, আজ পর্যন্ত সেগুলোতে আমাদের প্রধান দাবির জন্য কোনো জায়গা রাখা হয়নি। অর্থাৎ এ সংঘাতের মূল কারণগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যাগুলোর সমাধান নিয়ে। এটি পুরোপুরি অনুপস্থিত, যা অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে।
রিয়াবকভের এ মন্তব্য থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে পার্থক্যগুলো দেখা দিয়েছে তার সমাধান থেকে অনেক দূরে আছে মস্কো ও ওয়াশিংটন। দুই সপ্তাহ আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবগুলো নিয়ে ফের কাজ করা দরকার। পুতিন বলেছিলেন, তিনি চান ইউক্রেন ন্যাটো সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার উচ্চাশা ত্যাগ করবে। পাশাপাশি ইউক্রেনের যে চারটি অঞ্চলকে রাশিয়া নিজের বলে দাবি করেছে সেগুলো পুরোপুরি মস্কো নিয়ন্ত্রণ করবে এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার সীমিত করতে হবে। তবে পুতিনের এসব দাবিকে ‘আত্মসমর্পণের সমতুল্য’ বলে পাল্টা জবাব দিয়েছিল কিয়েভ। ইউক্রেনের সঙ্গে একটি চুক্তি করার বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ গত মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, মস্কো ওয়াশিংটনের সঙ্গে অব্যাহত যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। ইউক্রেনের বন্দোবস্ত নিয়ে আমরা যে আলোচনা করছি, তার সারাংশ অত্যন্ত জটিল। এর জন্য অনেক অতিরিক্ত প্রচেষ্টার প্রয়োজন।
গত সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ওপর বিরক্ত। ট্রাম্পের ধারণা, বিস্তারিত একটি চুক্তি করতে মস্কো হয়তো ইচ্ছা করেই দেরি করছে। এসব নিয়ে ট্রাম্প ক্রমাগত ধৈর্যহারা হয়ে উঠছেন এমন লক্ষণ প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি বলেন, মস্কো চুক্তি আটকে দিচ্ছে এমনটি অনুভব করলে যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করছে তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে এ যুদ্ধের সূচনা হয়। তার আগে ২০১৪ সালে তারা ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে নেয়। গত মাসে সৌদি আরবে রাশিয়া-ইউক্রেন উভয়পক্ষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের দীর্ঘ আলোচনার পর ৩০ দিনের জন্য একে অন্যের জ্বালানি অবকাঠামো ও কৃষ্ণসাগরে হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয় দুই দেশই।
এদিকে ইউক্রেনকে ৩৫০ কোটি ইউরো দিয়েছে ইউরোপীয় কমিশন। ইউক্রেনের অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৩১০ কোটি ইউরো সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হয়েছে। আর বাকি অর্থ অনুদান। এই সাহায্য হলো ইইউর ইউক্রেন ফ্যাসিলিটি প্রোগ্রামের অংশ। ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইইউ কিয়েভকে এ সহয়তা প্রদান করবে। এখনো পর্যন্ত ইউক্রেনকে ১ হাজার ৬০০ কোটি ইউরো সহায়তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডে রাশিয়ার ৮০০ কোটি ডলারেরও বেশি সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর মস্কোর সম্পদ জব্দ করা শুরু হয়। মঙ্গলবার সুইস সরকার জানিয়েছে, চলতি বছর ৩১ মার্চ পর্যন্ত সেই সম্পদের পরিমাণ হলো ৮৪০ কোটি ডলার। সেই সঙ্গে আরও ১৮০ কোটি ডলারের সম্পদ চিহ্নিত করে জব্দ করা হয়েছে। জব্দকৃত এসব সম্পদের মধ্যে রিয়েল এস্টেট, বিলাসবহুল গাড়ি এবং শিল্পদ্রব্য রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশ না হওয়া সত্ত্বেও তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইইউর নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি সমর্থন করে সুইজারল্যান্ড।
