ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের সঙ্গে মোহাম্মদ আশরাফুল -এর সম্পর্ক দীর্ঘ ২৫ বছরের। দুই যুগ ক্রিকেটার হিসেবে কাটানোর পর এবার নাম লিখিয়েছেন কোচিংয়ে। এবার ডিপিএলে তিনি প্রধান কোচ ধানমন্ডি স্পোর্টস ক্লাবের। কোচ ও ক্রিকেটারের রোমাঞ্চটা এই প্রতিযোগিতায় কেমন সে গল্পই শোনালেন দেশ রূপান্তরের রাফিদ চৌধুরীকে
দুই যুগ ক্রিকেটার হিসেবে খেলেছেন। এবার কোচের ভূমিকায়। কেমন উপভোগ করছেন?
মোহাম্মদ আশরাফুল: শুরুটা তো হয়েছিল দারুণ। প্রথম দুই ম্যাচের দুটিতেই জয়। যার মধ্যে একটি ছিল এবারের আসরের অন্যতম বড় দল লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের বিপক্ষে। তারপর লিজেন্ডস লিগের জন্য চলে গিয়েছিলাম ভারতে। সেখানে যাওয়ায় দলের প্রথম হার। আসার পরও দুটি হার। প্রত্যাশানুযায়ী হচ্ছে না। বাকি আছে আরও তিন ম্যাচ, যদি সবগুলোতে জয় পাই তাহলে পয়েন্ট হবে ১২। সুপার লিগের আগে কঠিন এক সমীকরণের সামনে পড়ে গেছি। দেখা যাক সামনের ম্যাচগুলোতে কী হয়।
ক্রিকেটার আর কোচ, দুই ভূমিকার মধ্যে পার্থক্যটা কেমন লাগছে?
আশরাফুল: ক্রিকেটার থাকার সময় শুধু নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে ভাবতাম। এখন দলের পারফরম্যান্স নিয়ে ভাবতে হয়। পার্থক্যটা এখানেই। তাছাড়া কিছু বাড়তি দায়িত্ব আছে। দলের পরিবেশ ভালো রাখা। প্রতিপক্ষকে নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো। ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাসী করা, তাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে কাজ করা। শুধু মাঠে গিয়েই কোচ খেলতে পারে না (হা হা হা...)।
পরিকল্পনা কাজে না এলে ক্রিকেটার হিসেবে যেমন হতাশ হতেন, এখনো কি তেমনই হয়?
আশরাফুল: আগে তো শুধু ম্যাচ হারলেই খারাপ লাগত। এখন আসলে ১১ ক্রিকেটার হতাশ করলে খারাপ লাগে। কোচের সফলতা তো ক্রিকেটাররাই এনে দেয়। তাদের যে পরিকল্পনা দেবেন, তারা যদি সেভাবেই খেলে সফল হয় তাহলে কোচ হিসেবে আমাকেও আনন্দ দেয়। না পারলে খারাপ লাগে।
আপনার তো প্রিয় দল মোহামেডান। তাদের বিপক্ষে খেলার সময়ের অভিজ্ঞতা আর কোচ হিসেবে তাদের হারানোর পরিকল্পনা সাজানোর অভিজ্ঞতাটা কেমন?
আশরাফুল: হারাতে পারলে তো অনেক ভালো লাগত। কারণ মোহামেডান বড় বাজেটের দল। অনেক ভালো ক্রিকেটার আছে তাদের দলে। এমন দলকে হারাতে পারা তো বড় বিষয় হতো, যেভাবে লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জকে আমরা হারিয়েছিলাম। কিন্তু মোহামেডানের সঙ্গে আমাদের আরও ভালো ক্রিকেট খেলা উচিত ছিল। পাশাপাশি গাজীর বিপক্ষেও। এই ম্যাচগুলোতে না জেতায় পয়েন্ট টেবিলে আমাদের অবস্থান যেখানে থাকা উচিত ছিল, সেখানে নেই। এজন্য একটু খারাপ তো লাগবেই।
আপনি বড় বাজেটের দল বললেন মোহামেডানকে। তাহলে আপনার দল কি ছোট বাজেটের?
আশরাফুল: দল হিসেবে আমরা বড়। তবে বাজেট অনুযায়ী আমাদের দলটা ‘ঠিক আছে’ বলা যায়। যদি নাম্বারিং করতে বলেন তাহলে আমাদের অবস্থান ৮ থেকে ৯ নম্বরে আছে। আমাদের দলের বাজেট এবার খুবই কম। তবুও পারফরম্যান্সটা আরেকটু ভালো করলে খুশি হতাম। কারণ আমাদের দলের ক্রিকেটাররা সবাই অভিজ্ঞ, অনেকদিন ধরেই তারা খেলছে। কিন্তু ব্যক্তিগত কয়েকটি পারফরম্যান্স থাকলেও দলগত পারফরম্যান্স প্রত্যাশানুযায়ী হয়নি। ম্যাচ তো একা জেতানো যায় না। দুই-তিন জনকে দায়িত্ব নিতে হয়, বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে যদি একজন ভালো খেলত আর তার সঙ্গে আরও দুজন অবদান রাখত তাহলে ভালো হতো। এটারই ঘাটতি ছিল।
গত বছরের চেয়ে এবার ক্রিকেটাররা অনেক কম টাকা নিয়ে খেলছেন। মোহাম্মদ মিঠুন তো সরাসরিই বলেছেন, ৬০ শতাংশ কম টাকা নিয়েও এই আসরে ক্রিকেটাররা খেলছেন। কম টাকা নিয়ে মিঠুন ভালো খেললেও বাকিরাও নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিচ্ছেন? নাকি হতাশ তারা?
আশরাফুল: আসলে এই ক্রিকেটারদের আপনি টাকা না দিলেও তারা খেলবে। কারণ তাদের পেশাটাই তো ক্রিকেট। এছাড়া তো আর তাদের জীবনে কিছু নেই। বেশি টাকা পান আর কম টাকা পান, খেলতেই তো হবে। কিন্তু খারাপ লাগা কাজ করে, কারণ আমি নিজেও তো ক্রিকেটার ছিলাম। যোগ্যতা অনুযায়ী ক্রিকেটারদের টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা তো অবশ্যই থাকা দরকার। আমার কাছে মনে হয় ‘প্লেয়ার বাই চয়েজ’ অপশনটা থাকলে ক্রিকেটাররা নিশ্চিন্তে ডিপিএলের ম্যাচগুলো খেলতে পারত। কারণ তখন বিসিবির কাছে ক্লাবগুলো দায়বদ্ধ থাকত। এই অপশনটা না থাকাতে ক্রিকেটারদের অনেকেরই সমস্যা হচ্ছে।
একটু চিন্তা করে দেখুন, প্রতিটা সিজনে একজন ক্রিকেটারের দুটো ব্যাট চার জোড়া গ্লাভস, স্পাইক, প্যাড, হেলমেট এসব কিছু মিলিয়ে কিনতে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ পড়ে যায়। সেখানে একজন ক্রিকেটারকে দেওয়া হচ্ছে ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা। তাহলে একজন ক্রিকেটারের মৌলিক চাহিদাই তো পূরণ করা সম্ভব হবে না। তাই আমি মনে করি বিসিবির সবকিছুরই দায়িত্ব নেওয়া উচিত এখানে। ক্লাবগুলোর সঙ্গে যে চুক্তিগুলো হয় সেটা যদি প্লেয়ার বাই চয়েজের মাধ্যমে হয় তাহলে ক্রিকেটাররা উপকৃত হবে।
প্লেয়ার বাই চয়েজে ক্রিকেটাররা কীভাবে উপকৃত হবে? তাতে কি মান বাড়বে?
আশরাফুল: এই পদ্ধতি চালু হলে ক্রিকেটারদের দলে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিসিবি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বাজেট নির্ধারণ করে দেবে। যেখানে একটা ক্যাটাগরি থাকবে যেখানে সর্বনিম্ন হবে ধরেন ১০ লাখ টাকা। আর সর্বোচ্চ একটা ক্যাটাগরিতে ৫০ বা ৬০ লাখ টাকা হতে পারে। তাহলে ক্লাবগুলোও তাদের বাজেট সেভাবেই করে নিত। ক্রিকেটাররাও তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী পারিশ্রমিক পেতে পারত। তাছাড়া আগে যেমন পুল পদ্ধতি ছিল। যেখানে ধরেন প্রতিটা ক্লাবে বাধ্যতামূলক তিনজন জাতীয় দলের ক্রিকেটার থাকতেই হবে। গত কয়েকটি আসরে সেটা একটি ক্লাবের স্বার্থের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই নিয়ম চালু করলে টুর্নামেন্ট আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে ও লড়াইটাও জমবে। ডিপিএলের মান যেখানে থাকা উচিত ছিল সেখানে পৌঁছায়নি। তবে তার আগে ক্রিকেটার উঠে আসতে হবে। ভালো মানের কোচ যেমন আমরা পেয়েছিলাম। এখন ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন যাদের তারা সেই মানের কোচ পাচ্ছে না। আগে বিকেএসপির শাখা ছিল একটাই, সেটাও সাভারে। সাকিব আল হাসান বা মুশফিকুর রহিম বিকেএসপিতে পেয়েছিল ফাহিম স্যার ও সালাউদ্দিন স্যারের মতো কোচকে। এখন যারা কোচ তারা একেবারেই বাচ্চা ছেলে। ২২-২৩ বছর বয়সের। তারা কেউ শীর্ষ পর্যায়ে খেলেওনি। তাছাড়া প্রতিষ্ঠানটির শাখাও বেড়ে গেছে, কিন্তু মান বাড়েনি। বিকেএসপির ক্লাস নাইনে পড়ুয়া আমার ভাতিজার দুই বছরে যেমন উন্নতি হওয়ার কথা ছিল, তেমন হয়নি।
সম্প্রতি নুরুল হাসান সোহানকে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবে দেখতে চান। তার মাঝে কি এমন গুণাবলি পেয়েছেন যে জাতীয় দলের নেতৃত্বে তাকে চাচ্ছেন?
আশরাফুল: সোহানের সঙ্গে আমি ক্রিকেট খেলছি ২০১১ সাল থেকে। ১৪ বছর ধরে তাকে আমি দেখছি। আগে ক্রিকেটার হিসেবে। এখন কোচ হিসেবে। বাংলাদেশের যত সফল অধিনায়ক যেমন মাশরাফী, বাশার ভাই, তামিম- তারা সবাই অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েছেন বয়স ৩০-এর পর। সোহানের বয়স এখন ৩১। তাই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বিবেচনায় তার হাতে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। লিটন অবশ্যই ভালো অধিনায়ক। কিন্তু তার ব্যাটিং ফর্মটা এই মুহূর্তে আপ টু দ্য মার্ক নেই। অধিনায়কত্বের পাশাপাশি
নিজের পারফরম্যান্সও প্রয়োজন। সোহান সেক্ষেত্রে এগিয়ে। তাই টি-টোয়েন্টির অধিনায়ক হিসেবে তাকে দেখতে চেয়েছি।
