রোহিঙ্গা সম্প্রদায় হচ্ছে, মিয়ানমার রাষ্ট্রের উত্তর রাখাইন প্রদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। কয়েকশ বছর আগে, রোহিঙ্গাদের বাসস্থান ছিল রাখাইন প্রদেশে। ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নাগরিকত্ব আইনে, রোহিঙ্গাদের বঞ্চিত করা হয়। যে কারণে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, একদিকে রোহিঙ্গারা হচ্ছে উদ্বাস্তু, অন্যদিকে রাষ্ট্রহীন। ১৪০৪ সালে আরাকান রাজা নিজের রাজ্য থেকে পালিয়ে সুলতানি আমলে বাংলার রাজধানী গৌড়ে আশ্রয় নেন। এরপর ১৮৭৫ সালে আরাকান রাজ্য বার্মার রাজা অধিগ্রহণ করার পর, দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময় অধিকাংশ উদ্বাস্তু আরাকান থেকে বাংলায় অনুপ্রবেশ করে। কিন্তু ১৯৭৮ সালে বার্মা সেনা ২ লাখ ২২ হাজার রোহিঙ্গাকে উত্তর আরাকান থেকে বিতাড়িত করে। তখন তারা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে বার্মা এবং বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার পর ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ জন উদ্বাস্তু বার্মায় ফিরে যায়। ১৯৯১-৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর আবার নির্যাতন শুরু হয়। তখন প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। ১৯৯২-২০০৮-এর মধ্যে আবার তাদের বার্মায় ফেরত পাঠানো হয়। কেউ কেউ বলেন, ১৯৯৭ সালে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া সঠিক ছিল না। অনেককেই জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
রোহিঙ্গাদের ঐতিহাসিকভাবে আরাকানি ভারতীয় বলা হয়। যারা শত শত বছর ধরে পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা। অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মের অনুসারী, তবে কিছুসংখ্যক হিন্দু ধর্মাবলম্বীও রয়েছে। এরপর ২০১৩ সালে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দেশটির রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গা ঢল শুরু হয়েছিল। এরপর কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়। আগে থেকেই সেই এলাকার ক্যাম্পে বসবাস করছিল আরও চার লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর থেকে কক্সবাজার ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বাঁশ আর প্লাস্টিকের খুপরি ঘরে বসবাস শুরু করে রোহিঙ্গারা। উখিয়ার কুতুপালং পরিণত হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে।
এবার কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয়ে থাকা ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে আংশিক যাচাই-বাছাইয়ে প্রথম ধাপে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার জনকে ফেরত নেওয়ার উপযোগী হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি দিয়েছে দেশটি। আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের অংশ হিসেবে ছবি ও নাম মিলিয়ে দেখার কাজ চলছে। এ বিষয়ে শনিবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আট লাখ রোহিঙ্গার তালিকা থেকে তারা ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে প্রত্যাবর্তনের জন্য যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এটি রোহিঙ্গাদের ফেরানোর ক্ষেত্রে প্রথম এই ধরনের নিশ্চিত তালিকা, যা রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের দিকে একটি বড় পদক্ষেপ। ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে এক বৈঠকে মিয়ানমারের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউ থান শোয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমানকে এই তথ্য জানান।
কিন্তু গতকাল ফেসবুক পোস্টে, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়ে এখনই নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, আগামী বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠাতে পারব কি না? আমাদের চাপ সৃষ্টি করে যেতে হবে, যাতে তারা স্বেচ্ছায়, পূর্ণ মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়। চীনের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের অংশ হিসেবে কয়েকবার রোহিঙ্গাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আমরা আশা করব, এবার অন্তত তাদের আশাহত হতে হবে না। নিজের পরিচয় এবং আত্মমর্যাদা নিয়ে এই নির্যাতিত জনগোষ্ঠী ফিরে পাক নিজভূমির মৃত্তিকা ঘ্রাণ।
