হাস্যকর পুনঃমঞ্চায়ন

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৪৮ এএম

ডিপিএলের সুপার লিগে জায়গা করে দিতে ‘সমঝোতার মাধ্যমে’ ম্যাচে ইচ্ছাকৃত হারের অভিযোগ শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে। মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বুধবার গুলশান ক্রিকেট ক্লাব ও শাইনপুকুর ক্রিকেট ক্লাবের মধ্যকার সেই ম্যাচের একাধিক মুহূর্তে ‘অস্বাভাবিক আচরণ’ লক্ষ করা যায় যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা, এক ব্যাটারের স্বেচ্ছায় স্টাম্পিং হওয়া। বিসিবি নীরব না থেকে তদন্ত শুরু করেছে ঠিকই, তবে ‘পুনঃমঞ্চায়নের’ মতো অভিনব উদ্যোগ নিয়ে এখন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট বলছেন, ‘এটা মূর্খামি ছাড়া কিছু না।’ আর অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা গুলশান কোচ খালেদ মাহমুদ সুজন এসব উড়িয়ে দিয়েছেন ‘হাস্যকর’ বলে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সন্দেহজনক আচরণ ও ফলাফল নিয়ে গুঞ্জন ছড়াতেই বিসিবি তদন্তে নামে। অভিযুক্ত দুই ক্রিকেটার রহিম আহমেদ ও মিনহাজুল আবেদীনকে গতকাল বৃহস্পতিবার ডেকে পাঠানো হয় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের একাডেমি মাঠে। সেখানেই বিতর্কিত স্টাম্পিংয়ের ঘটনাটি পুনঃদৃশ্যায়ন করতে বলা হয় তাদের। পুরো দৃশ্য ধারণে পিচের দুই পাশে বসানো হয় ক্যামেরা।

পুনঃদৃশ্যায়নের বিষয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়ে বিসিবি বলেছে, ‘খেলাধুলার স্বচ্ছ ও শুদ্ধতার প্রতি বিসিবির অঙ্গীকারবদ্ধ। যেকোনো ধরনের দুর্নীতি কিংবা আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে বোর্ড জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে এমন পদক্ষেপকে ‘নাটকীয়’ বলে সমালোচনা করেছেন অনেকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট একজন দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘দুই ক্রিকেটারের সাইকোলজি বোঝার জন্য এমনটা হতেই পারে। তবে এটা করা উচিত ছিল ইনডোরে। একাডেমি মাঠে করা মানে এক ধরনের লোকদেখানো তদন্ত বলেই মনে হবে।’

এমন ঘটনার সরাসরি সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ দলের সাবেক অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ পাইলট। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার আবার পুনঃদৃশ্যায়নের কী আছে, তা তো বুঝলাম না। কারণ সেই ম্যাচ তো ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। কয়েকটি অ্যাঙ্গেল থেকে ফুটেজ আছে। সেটা পুনঃদৃশ্যায়নের করা মানে আমার কাছে মনে হয় লোকদেখানো। এ ধারণাটা “ছাগলামি” ছাড়া কিছু না।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটা দলগত অপরাধ। একজন মানুষ অপরাধ একাই করতে পারে। কিন্তু একাধিক মানুষ জড়িত মানেই পেছন থেকে কারও আশীর্বাদ আছে বলে ধরে নেওয়া যায়। এর পেছনে কে আছে, সেটা খুঁজে বের করার ইচ্ছা থাকলে বোর্ডের লাগবে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট। যারা জড়িত, তাদের ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, কী শাস্তি দেওয়া হবে, সেগুলো বলা হোক, এমনিতেই তারা বলবে সব কথা। এর জন্য লোকদেখানো নাটকের প্রয়োজন নেই।’

পাইলটের মতে, এ অপরাধের পেছনে আর্থিক লোভই বড় কারণ। তিনি বলেন, ‘এই ক্রিকেটারদের পেছন থেকে কেউ নিশ্চয়ই প্রলোভন দেখিয়েছে, হয়তো অর্থের টোপ দেওয়া হয়েছে। যাদের আর্থিক সমস্যা আছে, তারাই এই টোপে পড়েছে এবং এটা করেছে নিশ্চয়ই পেছন থেকে কেউ।’

ঘটনার কেন্দ্রে থাকা গুলশান ক্রিকেট ক্লাবের সুপার লিগে যেতে হলে জয়ের বিকল্প ছিল না। ম্যাচটি ৫ রানে জিতে যাওয়ায় তারা সুপার লিগে যাওয়ার সম্ভাবনা জাগিয়ে রেখেছে। ফলে অভিযোগ ওঠে, শাইনপুকুর ‘সমঝোতার মাধ্যমে’ ম্যাচটি ছেড়ে দিয়েছে। কেউ কেউ আঙুল তুলেছেন খালেদ মাহমুদ সুজনের দিকেও, অভিযোগ তুলেছেন, যেখানে তিনি থাকেন, সেখানে এমন অক্রিকেটীয় ঘটনা ঘটে থাকে।

শাইনপুকুরের কারোর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়টি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন সুজন নিজেই। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘সমঝোতা বলতে তো ফিক্সিং বোঝাতে চাচ্ছেন। যদি ফিক্সিং হয়, তাহলে তো আমরা ৩৫০ রান করতাম, ম্যাচটা বিশাল ব্যবধানে জিততাম। তখন এমন কোনো প্রশ্নই উঠত না। আপনি কি মনে করেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের মতো দল আমাদের ম্যাচটা ছেড়ে দিয়েছিল! কিংবা সেদিন যে ধানম-ির সঙ্গে আমরা ম্যাচটা জিতলাম, ওরা কি আমাদের ছেড়ে দিয়েছে! এগুলো বলে আমার দলের ক্রিকেটারদের অবদানকে ছোট করে দেখা হচ্ছে। আমি কোচ হওয়ার আগে ক্রিকেটার ছিলাম। আমরা কত সিলি সিলি ভুল করেছি। খেলায় থাকলে ভুল হবেই, ভুল থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। আমরা যদি ওই ভুলগুলো না করতাম, তাহলে তো একেকজন ব্রায়ান লারা হয়ে যেতাম। আমি সাবেক ক্রিকেটার, এই প্রজন্মের ক্রিকেটার আমার সন্তানের মতো। তাদের কেন আমি অবৈধপথ শেখাতে যাব।’

তার বিরুদ্ধে পুরনো অভিযোগও সামনে এসেছে আবাহনীতে থাকাকালে ম্যাচের ফল প্রভাবিত করার মতো অভিযোগ। উত্তরে সুজন বলেন, ‘আবাহনীতে থাকতে আমি সব সময় বড় বাজেটের দল গড়তাম। স্বাভাবিক, বেশি টাকা যেখানে পাবে, ক্রিকেটাররা সেখানে যাবে। তাই তারকা ক্রিকেটাররা সেখানে থাকত। তারা দেশের সেরা ক্রিকেটার, তারা পারফর্ম করত, আমরা চ্যাম্পিয়ন হতাম। এখন কথা হচ্ছে, আমার তো শত্রুর অভাব নেই। আমি মাঠে পরিশ্রম করি। যারা এসব কথা বলে বেড়ায়, তারাও মাঠে আসুক। লড়াইটা এভাবে না করে সুস্থ প্রতিযোগিতায় হোক।’

তবে আগে থেকে কাউকে নিয়ে চিন্তা করার পক্ষে নন পাইলট। তার মতে, অন্য কেউও হয়ে থাকতে পারে, ‘এটা ভালোভাবে তদন্ত করা হোক। কারা কারা এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, এমন ধারণা থাকা ভালো। কিন্তু আগে থেকেই একজনকে লক্ষ করে বলা উচিত নয়। বোর্ড যদি তদন্ত করে, তাহলে এমনিতেই বেরিয়ে আসবে কারা এর সঙ্গে জড়িত।’

তদন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে, বিসিবি শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয় তা সময়ই বলে দেবে। তবে এরই মধ্যে পাইলট ও সুজনের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, ম্যাচ ঘিরে বিতর্ক থামছে না, বরং আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত