মোগল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন আলমগীরি মসজিদ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:১৬ পিএম

মোগলরা ২০০ বছরের বেশি ভারত শাসন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা নানা স্থাপনা নির্মাণ করেছেন। যেসবের অধিকাংশই কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে। এমনই এক স্থাপনা হলো, চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানার অন্তর্গত অলিপুর গ্রামে অবস্থিত আলমগীরি মসজিদ। এ মসজিদ বাদশাহ আলমগীরের শাসনামলে স্থানীয় প্রশাসক আবদুল্লাহ ১৬৯২ নির্মাণ করেন।

আলমগীরি মসজিদের দৈর্ঘ্য ৫২.৮ ফুট এবং প্রস্থ ২৯.৯ ফুট। মোগল স্থাপত্যের সাধারণ রীতি অনুযায়ী এ মসজিদের চারটি অষ্টকোনাকার মিনার রয়েছে। মসজিদের ছাদে দুই পাশে দুটি করে ছোট গম্বুজ এবং মাঝে একটি বড় গম্বুজসহ মোট পাঁচটি গম্বুজ রয়েছে। পশ্চিম পাশের দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। ইমাম সাহেব মধ্যবর্তী মিহরাবে অবস্থান করে নামাজ পড়ান, সেটিই বড় এবং দুই পাশের দুটি ছোট। মসজিদের ভেতরে রয়েছে অষ্টভুজাকৃতির দুটি বিশাল স্তম্ভ। যেগুলোর পরিধি কমপক্ষে আট হাত। আর মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় আড়াই হাত। মসজিদটিতে কোনো জানালা ও ভেন্টিলেটর ছিল না। পূর্ব দেয়ালে তিনটি দরজা রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে যে চারটি দরজা ছিল, সেগুলো বর্তমানে জানালায় রূপান্তর করা হয়েছে। মসজিদের চারদিকের দেয়ালের মধ্যে পূর্ব দেয়াল ছাড়া তিন দিকের দেয়ালই সমতল। পূর্ব দিকের দেয়ালে একসময় ছিল নানা কারুকাজ।

মসজিদের প্রধান প্রবেশ পথের দুই পাশে দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণের প্রতিটি দেয়ালে রয়েছে এক জোড়া খিলানযুক্ত প্রবেশপথ। সুতরাং মসজিদটিতে সর্বমোট সাতটি খিলানপথ রয়েছে। পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে দুটি করে। ১৯৬৫ সালে যখন পাক-ভারত যুদ্ধ হয়, তখন ভারতবর্ষে মুসলিম শাসকদের কীর্তিগাথা ও স্থাপিত বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। এর ধারাবাহিকতায় বিস্মৃতির অতল অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে অলিপুর নামের লোকালয়টি। অলিপুরের আলমগীরি মসজিদ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তরের নজরে আসে এর ৩১ বছর পর। ১৯৯৬ সালের ১৬ মার্চ আঞ্চলিক পরিচালক, প্রতœতত্ত্ব অধিদপ্তর অলিপুর এ মসজিদ সংস্কারের কাজ হাতে নেয়। মসজিদের ৬০ ফুট পূর্বে রয়েছে একটি বড় পুকুর। এই পুকুর মসজিদ নির্মাণকারী কর্র্তৃপক্ষই খনন করেছিল।

সাধারণ মোগল স্থাপত্যরীতির তাৎপর্যপূর্ণ ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয় এ মসজিদে। সাধারণত মোগলরা তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদই তৈরি করতেন। কিন্তু এ মসজিদের আছে পাঁচ গম্বুজ। মসজিদের প্রধান দরজার ওপর স্থাপিত রয়েছে ১.১০ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে ১১ ইঞ্চি প্রস্থের ফারসি ভাষায় লিখিত শিলালিপি। এ শিলালিপিতে ফার্সি ভাষায় লেখা আছে, ‘পরম দয়ালু ও দাতা আল্লাহর নামে। আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তার নবী’সহ এ ধরনের কয়েকটি লাইন।

মসজিদের নির্মাতা আবদুল্লাহ সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হয়, তিনি একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন। মসজিদের ১০০ মিটার পূর্বে একটি পুরনো ইটের মাজার আছে। এখানে আছে আবদুল্লাহর সমাধি।

১৯৬৫ সালের ৪ নভেম্বর পাকিস্তান সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা জনাব একেএম আমজাদ হোসেন ‘কসসেপ্ট অব পাকিস্তান’ সাময়িকীতে একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি অলিপুরের এ মসজিদকে ‘আলমগীরি মসজিদ’ হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৮ সালের বন্যার পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগ মসজিদটিকে এর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য সংস্কার করেছে। চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কের কৈয়ারপুল বাস স্টপেজ নেমে সিএনজি অথবা অটোরিকশাযোগে যাওয়া যায় আলমগীরি মসজিদে যাওয়া যায়। কৈয়ারপুল বাস স্টপেজ থেকে তিন মাইল দক্ষিণে এ মসজিদের অবস্থান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত