রাজনীতি এবং প্রশাসন পরস্পরের পরিপূরক। গণতান্ত্রিক দেশে একটি হৃৎপি- হলে অপরটি ফুসফুস। একটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপরটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। কিন্তু প্রশাসনের যে কাজ তা রাজনীতিকরা পারেন না বা করেন না। কিন্তু সিভিল প্রশাসন যখন দলীয় রাজনীতির মতাদর্শে ঘুরপাক খায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই অস্থিরতা দেখা দেয়। এর ফলে রাজনীতিতে গুরুতর প্রভাব পড়ে। অথচ গণতান্ত্রিক দেশে, প্রশাসনকে চলতে হয় বিধিবদ্ধ কিছু নিয়মের মধ্যে থেকে। তাদের সব কর্মকান্ডে দেশপ্রেমের ছোঁয়া থাকতে হয়। একই সঙ্গে কোনো দলের প্রতি আনুগত্য বা বিরুদ্ধাচরণ করা প্রশাসনের কাজ নয়। যেহেতু তারা জনগণের কষ্টের অর্থ নিয়ে চলছেন, সেহেতু তারা থাকবেন জনকল্যাণে। অথচ হচ্ছে উল্টো। দলীয় মতাদর্শ তাদের কাউকে এমনভাবে আটকে ফেলেছে যে, কোনোভাবেই তারা সেখান থেকে বের হতে পারছেন না।
২০২৪ সালে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, তা আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। যেসব দেশে রাজনৈতিক শক্তি প্রশাসনিক শক্তির কাছে ব্যর্থ হয়েছে বা প্রশাসনিক শক্তি নিজেকে বেশি ক্ষমতাবান করেছে, সেখানেই দেখা গেছে গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল। আসলে রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘদিনের ভুল হচ্ছে, তারা প্রশাসনের লোকজনকে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে বিশেষজ্ঞ মনে করেন। এই কারণে তারা তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতার সুযোগ নিয়েই প্রশাসন কখনো কখনো রাজনৈতিক শক্তির ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করে। এভাবেই চলছে দীর্ঘদিন। মেধাবী ও সুস্থ ধারার রাজনীতিকের অভাব অনুধাবন করেই কি করোনার সময়, সার্বিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধিদের না দিয়ে আমলাদের হাতে দেওয়া হয়েছিল? তখন প্রশাসনকে এমনভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে যে, প্রজাতন্ত্রের অনেক কর্মকর্তা ভুলে যেতে বসেছেন তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিতা হচ্ছে তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশে বেশিরভাগ জনগণ প্রত্যাশা করে, প্রশাসনে নিয়োজিত প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা থাকবেন নিরপেক্ষ, দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। সুবিচার, সুশাসন, শুদ্ধাচার ও জনকল্যাণসহ জনজীবনে নিরাপত্তা বিধান, পিছিয়ে পড়া জনগণের পাশে থাকা প্রশাসনের মৌলিক দায়িত্ব। জনসেবায় দক্ষতা, দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধ এবং গণমানুষের জীবনের মৌলিক প্রগতি বিধান হওয়া উচিত তাদের আদর্শ।
দলীয়করণ ও রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ায় গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে প্রশাসন এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। বিগত সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে কিছু কর্মকর্তা সচিবালয়ে আসছেন না। কোনো সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে সচিব পদে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার। অনেক ডিসি বদল করা হয়েছে। তারপরও পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে বলা যায় না। দেশ রূপান্তরে শনিবার প্রকাশিত প্রতিবেদন জানাচ্ছে ‘কৃষিতে অস্থিরতা জিইয়ে রেখেছেন আ.লীগপন্থি সচিব’। এ রকম বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে তারা রয়েছেন। যেখানে জনসেবার নামে দলীয় সেবায় তারা ব্যস্ত। জানা যাচ্ছে, হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই কৃষির গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে তৈরি হয় অস্থিরতা, অচলাবস্থা, যা দূর করতে সরকার তৎকালীন সচিব ওয়াহিদা আক্তারকে সরিয়ে আগস্টের মাঝামাঝিতে নিয়োগ দেয় আরেক আওয়ামীপন্থি আমলা ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে। যিনি সচিব হওয়ার পর থেকে দপ্তরগুলোতে অচলাবস্থা দূর করার বিপরীতে সংস্থাগুলোতে আওয়ামীপন্থিদের টিকিয়ে রাখা, বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের মধ্যে গ্রুপিং তৈরি করে অস্থিরতা জিইয়ে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে সচিবের ভাষ্য, আরও এক-দুই বছর এমন চলবে। শুধু তাই নয়, একই অবস্থা দেশের সবচেয়ে বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে (ব্রি)। যেখানে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামানকে মহাপরিচালক পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সেটিও ‘রুটিন দায়িত্ব’। প্রতিষ্ঠানটির বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প পরিচালক যারা আছেন তাদের সবাই আওয়ামী সময়ের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত।
শুধু কৃষি নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একই অবস্থা। ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে অস্থিরতা। এতে প্রকৃত অর্থে কোন পক্ষের লাভ হচ্ছে? মনে রাখতে হবে, এর ফলে কিন্তু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়বে। সমাজের সব গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরকে যদি সরকারের সদিচ্ছামতো জনকল্যাণে পরিচালনা না করা যায়, তাহলে নিকটভবিষ্যতে সমস্যা প্রকট হবে।
