সাবিনাদের ফেরার মঞ্চ ভুটান লিগ

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:১৪ এএম

মানে-গুণে ভুটান নারী ফুটবল দলকে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশের পাশে রাখার সুযোগ নেই। পরপর দুবার শিরোপা জিতে বাংলাদেশ বসেছে দক্ষিণ এশিয়ার সেরার আসনে। অন্যদিকে ভুটান কখনোই সাফের ফাইনালে পা রাখেনি। সাত আসরে মাত্র দুবার সেমিফাইনাল খেলেছে তারা এবং দুবারই বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশের কাছে। অথচ সেই ভুটানই একটা জায়গায় পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশকে! মাত্র ৯ বছরে ভুটান নারী ফুটবলে গড়েছে শক্ত ঘরোয়া অবকাঠামো। ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া নারী ফুটবল লিগ হতে যাচ্ছে ১০ দল নিয়ে। প্রায় ছয় মাসব্যাপী লিগের খেলা হবে ৯ ভেন্যুতে। প্রথম পর্ব শেষে ছয় দল নিয়ে হবে সুপার লিগ। আর এই লিগ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের তারকা ফুটবলারদের ফুটবলে ফেরার মঞ্চ।

গত বছর অক্টোবরে সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের ১০ জন ফুটবলারকে নিয়েছে ভুটানের তিন ক্লাব। জোড়া সাফজয়ী দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন, সর্বশেষ সাফের সেরা তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা, দেশসেরা মিডফিল্ডার মনিকা চাকমা ও ফরোয়ার্ড মাতসুসিমা সুমাইয়া খেলছেন ২০২২-২৩ মৌসুমের শিরোপাজয়ী পারো এফসিতে। আরও দুটি ক্লাবে খেলতে গতকাল রবিবার ভুটানে পৌঁছেছেন আরও পাঁচ ফুটবলার। থিম্পু সিটির হয়ে খেলবেন রাইট উইঙ্গার সানজিদা আক্তার, মিডফিল্ডার মারিয়া মান্ডা এবং লেফটব্যাক শামসুন্নাহার সিনিয়র। ট্রান্সপোর্ট ইউনাইটেডে যোগ দিয়েছেন শেষ দুই সাফের সেরা গোলকিপার রূপনা চাকমা ও সেন্টারব্যাক মাসুরা পারভীন। এই দলে খেলার কথা রয়েছে অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড কৃষ্ণারানী সরকারেরও। তবে ওয়ার্ক পারমিট না মেলায় থিম্পুযাত্রায় গতকাল বাকিদের সঙ্গী হতে পারেননি তিনি।

১০ বাংলাদেশির ভুটান লিগে খেলার নেপথ্যে কাজ করেছেন দেশের একমাত্র ফিফা এজেন্ট নিলয় বিশ^াস। বেঙ্গল সকার এজেন্সির প্রতিষ্ঠাতা নিলয় জানালেন, ‘নারী ফুটবলের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে কয়েক বছর ধরেই ভুটান চেষ্টা করছে ভালো লিগ আয়োজনের। গত বছর তাদের একটি ক্লাব (রয়্যাল থিম্পু কলেজ) প্রথমবারের মতো আয়োজিত এএফসি উইমেন্স চ্যাম্পিয়নস লিগে অংশ নিয়েছে। এ বছর তিনটি ক্লাব আমার কাছে বাংলাদেশের ফুটবলারদের প্রতি আগ্রহ দেখায়। গত মৌসুমেও আমাদের মেয়েদের প্রতি ঝোঁক ছিল ভুটানের ক্লাবগুলোর। তবে জাতীয় দলের ক্যাম্প চলায় সেবার খেলা হয়নি। এবার বিদেশি কোটা ছয়ে উন্নীত করায় অনেকের খেলার সুযোগ হয়েছে।’ মাসিক বেতনে তিনটি ক্লাব বাংলাদেশের ১০ তারকাকে দলে নিয়েছে। এর মধ্যে পারো এফসি চার ফুটবলারের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে চার মাসের চুক্তি করেছে। অন্য দুটি ক্লাব বাকি ছয় ফুটবলারের সঙ্গে করেছে ছয় মাসের চুক্তি। ভুটানের এই লিগে সাবিনারা ছাড়াও ভারত, নেপাল, হংকং এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলারও খেলবেন।

এ প্রসঙ্গে গত বছর সাফের ফাইনালে জয়সূচক গোল করা ঋতুপর্ণা চাকমা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চারজন ছাড়াও হংকং ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে একজন করে ফুটবলার দলে নিয়েছে পারো। এখানে আসার পর থেকে ফিটনেস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছি। আশা করছি এখানে খেলার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে জাতীয় দলে অনেক কাজে দেবে।’

পারোতে তার সতীর্থ মনিকা চাকমা বলেন, ‘এখানে আসার এক দিন আগে বাফুফের সভাপতি স্যারের (তাবিথ আউয়াল) সঙ্গে আমাদের কথা হয়। তিনি আমাদের বলেছেন, দেশের সুনামের কথা চিন্তা করে যাতে খেলি। আর যখন জাতীয় দলে খেলার সময় আসবে, তখন আমাদের ডাকা হবে। আমি মনে করি, এটা আমাদের জন্য দারুণ একটা সুযোগ।’

৬ এপ্রিল থেকে ঢাকায় ব্রিটিশ কোচ পিটার বাটলারের অধীনে চলছে এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের প্রস্তুতি। বাটলারকে বয়কট করেছিলেন ১৮ ফুটবলার। তাদের বাদ দিয়েই সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে গত ফেব্রুয়ারি-মার্চে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। দুই ম্যাচেই বড় ব্যবধানে হারার পর অভিজ্ঞদের জাতীয় দলে ফেরানোটা ছিল বাফুফের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ জয় করে বাফুফে বিদ্রোহীদের ফেরালেও বাটলারের অধীনে এই মুহূর্তে খেলতে হচ্ছে না ১০ ফুটবলারকে। এটা যেমন তাদের এক রকম মুক্তি দিচ্ছে, পাশাপাশি দিচ্ছে আর্থিক স্বস্তিও। ফিফা এজেন্ট নিলয়ের কথায়, ‘একেকজনের সঙ্গে প্রতি মাসে ৫০০ থেকে ৭০০ মার্কিন ডলারের চুক্তি হয়েছে ক্লাবগুলোর। বাংলাদেশে নারী লিগের সঙ্গে তুলনা করলে অঙ্কটা নেহাত খারাপ নয়।’

বাফুফে ২০১১ সালে প্রথম নারী লিগ আয়োজন করেছিল। দুটি আসর টানা হওয়ার পর বড় ছেদ পড়ে। এরপর ২০১৯-২০ মৌসুম থেকে নিয়মিত লিগ হলেও মান নিয়ে আছে অনেক প্রশ্ন। নামকাওয়াস্তে লিগ আয়োজনের ফলে মেয়েদের উপার্জনের পথটা মসৃণ নয় মোটেও। বিশেষ করে সর্বশেষ লিগে বসুন্ধরা কিংস দল না গড়ায় মেয়েদের খুব বেশি আয়ের সুযোগ ছিল না। অথচ আন্তর্জাতিক মঞ্চে খাবি খাওয়া ভুটান দাঁড়িয়ে গেছে শক্ত ঘরোয়া ভিতের ওপর।

স্বস্তি বলি কিংবা মুক্তি, ঘরোয়া ফুটবলে ভুটানকে এগিয়ে যেতে দেখাটা সাবিনা, ঋতু, মনিকাদের জন্য কষ্টেরও।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত