রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক রকম কর্মচাঞ্চল্য দেখা গেছে গত রোজায়। নেতাকর্মীদের মধ্যে ইফতার মাহফিলের মাধ্যমে গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। ঈদেও অনেক নেতাকর্মী তাদের নির্বাচনী এলাকায় বা যিনি যে আসনে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে চান, সেখানে ঈদ করেছেন। ঈদের দিন জনতাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এতে এলাকাবাসী বুঝে নিয়েছেন, তিনি ইলেকশন করবেন। এলাকায় তাকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এই আলোচনা যত বেশি দীর্ঘ হবে, রাজনৈতিক নেতাদের জন্য ততই অমঙ্গল। কারণ আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের সম্পর্কে দেশের সাধারণ মানুষের ধারণা ভালো না। দখল, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, লুটপাট, আধিপত্য বিস্তারের ঘটনাগুলো সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। এই অবস্থা চলছে যুগ যুগ ধরে। নির্বাচন এলে কারও কাছে ঘেঁষাকে সবাই মূল্যায়ন করতে সব সময় চায় না। রাজনৈতিক নেতারাও বিষয়গুলো বোঝেন। তবু যেতে তো হবে। জনগণকে জানান না দিলে, নির্বাচনে ভোট আসবে কোথায় থেকে? এ সময়টা নেতাদের জন্য কঠিন। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলে, জানতে চায়। অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। অনেক অভাব-অভিযোগের কথা শুনতে হয়। অনেককে সহায়তা দিতে হয়। অনেক আশ্বাস দিতে হয়। যদিও তার প্রার্থিতার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়নি তবুও। সব মিলিয়ে রোজা এবং ঈদ রাজনীতিটাতে ভালোই কাটিয়েছে জনতা। কিন্তু রাজনীতিকরা যে উদ্দেশ্যে এসব করলেন সেটার খবর কী? নির্বাচন হবে কবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনের কথা বলছেন। এদিকে ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে সংস্কারের বিষয়ে মতামত সংগ্রহ করছে। এই মতামতের আলোকে সংস্কার হবে, তারপর নির্বাচন হবে এ কথা প্রধান উপদেষ্টা আগেই বলেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেছিলেন, ন্যূনতম সংস্কার হলে ডিসেম্বরে আর বৃহত্তর সংস্কার হলে জুনে নির্বাচন হবে। এখনো সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। এই প্রক্রিয়া শুরু করতে আরও কিছু সময় লাগবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জাতীয় সনদ জনগণের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করবে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় আমরা টেবিলের দুপ্রান্তে বসলেও দুপক্ষ নই। আমরা এক পক্ষ, আমাদের লক্ষ্য এক। আমরা রাষ্ট্র সংস্কারের একটি সুনির্দিষ্ট পথ খুঁজে বের করে একটি জাতীয় সনদ তৈরি করতে সবাই চেষ্টা করছি। অর্থাৎ অধ্যাপক আলী রীয়াজের কথা সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। আর এর আলোকে জুলাই সনদ হবে। জুলাই সনদের আলোকে নির্বাচন। বিষয়টা বেশ প্যাঁচিয়ে যাচ্ছে।
এরই মধ্যে রাজনীতির মাঠে অন্যতম প্রধান দল বিএনপি গত বুধবার নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ চাইতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে তারা সন্তুষ্ট হতে পারেননি। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে বিএনপির শীর্ষনেতারা নির্বাচনের সুর্নির্দিষ্ট রোডম্যাপ না পাওয়ায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। প্রায় দুই ঘণ্টার বৈঠক শেষে বিএনপি সহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ জানাননি। তিনি ডিসেম্বর থেকে জুন মাসের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলেছেন। আমরা বলেছি, ‘ডিসেম্বর নির্বাচনের কাট অফ সময়। আমরা দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’ এর আগে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করে উল্টো পথে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি এ কেমন আচরণ? যখনই ডিসেম্বরের মধ্য নির্বাচনের দাবি করা হয়, তখনই দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ গণতন্ত্রের জন্য ভালো নয়।’ বৈঠকের আগে নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ না পেলে দলীয় কর্মসূচির পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছিল বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে। সংস্কার ইস্যুকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তুলেছিল বিএনপি। এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা বলেন ডিসেম্বরে নির্বাচনের কথা। আবার আরেকজন বলেন জুনে নির্বাচন। আরেকজন বলেছেন, পাঁচ বছর এই সরকার থাকার দরকার, জনগণ চায়। একজন উপদেষ্টা বললেন, তারা নির্বাচিত। এদিকে সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন বললেন, গণতন্ত্রের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ, স্বৈরাচারের সৃষ্টি হয়। এই যে কথাগুলো, এতে একটা বিভ্রান্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এতে নির্বাচন নিয়ে জনগণের মনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।’ নির্বাচনের রোডম্যাপের বিষয়ে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে। আবার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাও আগামী ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলছেন। এক্ষেত্রে দুপক্ষ যদি ধরি তবে, দুপক্ষই তাদের অবস্থানে স্থির হয়ে আছে। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের আগে বিএনপি শীর্ষনেতারা অবশ্য ধারণা দিয়েছিলেন, তারা প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তথা সুনির্দিষ্ট নির্বাচনের সময়টি জানতে চাইবেন। চেয়েছেনও তাই। কিন্তু ড. ইউনূস তার আগের ভাষ্যই প্রতিধ্বনিত করেছেন। এর ফলে বিএনপির সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয় কি না, সেটা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। যদিও বিএনপি গত ৫ আগস্টের পর থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে একচ্ছত্র সমর্থন দিয়ে আসছে। বিএনপি নির্বাচনের দাবিতে কিছু কর্মসূচি দেওয়ার কথা আগেই বলে রেখেছে। এখন হয়তো এই ইস্যুতে কর্মসূচিগুলো আরও জোরালো হবে। রাজনৈতিক মাঠের কথা বিবেচনা করলে, এ মুহূর্তে বিএনপির বড় প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এর বাইরে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সদ্য গঠিত একটি রাজনৈতিক দল। যদিও জুলাই বিপ্লব থেকে উঠে আসা এই রাজনৈতিক দলটির বড় ভূমিকা থাকবে আগামী নির্বাচনে। তারাও রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। ফলে আগামী নির্বাচনে ত্রিপক্ষীয় একটি লড়াই হয়তো আমরা দেখব। এ কারণে আগামী নির্বাচনের সময় নিয়ে এই তিন দলের ভাবনাকে বড় করে দেখছে অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে বিএনপি ডিসেম্বরে নির্বাচন চাইলেও জামায়াত বা এনসিপি, ডিসেম্বরে নির্বাচন চাইছে না। অবশ্য বুধবার বিএনপির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এগুলো হলো সংস্কার, ফ্যাসিস্টদের বিচার এবং সঠিক নির্বাচন পদ্ধতি। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের জন্য ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর সময়সীমা কঠিন নয়। এ সময়ের আগে বা পরে নির্বাচন হতে পারে, যদি শর্তগুলো পূরণ হয়। আবার এনসিপির চাওয়া আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনার বিচার, সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনের আয়োজন করা।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যখন গঠিত হয় ওই সময়টা এবং আট মাস পর বর্তমান সময়টা যদিও এক নয়, তবু ড. ইউনূস ছাত্র জনতার আন্দোলনে নেতৃত্বে থাকা ছাত্রদের হাত ধরেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসেছেন। ফলে বিএনপি যদি অভিযোগ করে কাউকে ছাড় দেওয়ার জন্য নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়া হচ্ছে না, সেই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ছাত্ররা এখন আর ছাত্র নেই, এখন তারা একটি রাজনৈতিক দলের মালিক। তারা আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিত হয়ে তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে চায়। এ জন্য সব কিছু গুছিয়ে নিতে তাদের তো একটু সময় লাগবেই। আর অন্তর্বর্তী সরকার তাদের সেই সময়টা দিতেও পারে। এ ছাড়া তাদের চাওয়াকেও মূল্য দিতে হবে। তবে মুশকিল হতে পারে জুলাই সনদ ঘোষণা নিয়ে। কারণ সংবিধান ঠিক রেখে জুলাই সনদ কতটা ঘোষণা করা যাবে বা কীভাবে ঘোষণা করা যাবে তা ভাবনার বিষয়। ড. আলী রীয়াজ যদিও অনেক কথাই বলেছেন। কিন্তু একটা বিষয় আমাদের ভাবনার মধ্যে রাখতে হবে, জোর জবরদস্তি করে কোনো কিছু করা যাবে না। কিছু করতে হলে আগামী দিনে যেন বিতর্কের সৃষ্টি না হয় সেভাবেই করতে হবে। এক বিতর্ক মুছতে আরেক বিতর্কের জন্ম কাম্য নয়।
অন্যদিকে জামায়াতের নির্বাচনী ভাবনা কিছুটা রহস্যময়ই ঠেকছে। যদিও জামায়াত বিএনপির দীর্ঘদিনের সারথি। তারা জোটবন্ধ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়ও ছিল। কিন্তু ওয়ান ইলেভেনের পর দল দুটির মধ্যে একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যেসব কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে আগামী নির্বাচনে হিসাবের খাতায় ঠাঁই পাবে। যদিও গত রবিবার জামায়াতে আমির লন্ডনে গিয়ে বিএনপির চেয়াপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে বা কোনো বিষয়ে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি। তবু আগামী নির্বাচনে দুই দল যখন হিসাব কষতে বসবে, তখন অতীত ভুলে হিসাব করবে না। তারপরও রাজনীতিতে বড় দলকে পাশ কাটিয়ে কিছু করতে চাওয়া অন্তর্বর্তী সরকারকে বিতর্কিত করতে পারে। যদিও সেই সম্ভাবনা এখনো দেখা দেয়নি। তবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বুধবারের বৈঠকের পর বিএনপি দলীয় ফোরামে কী সিদ্ধান্ত নেয় সেটাই দেখার বিষয়। তা ছাড়া খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে আসার পর জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব ঘুচবে কি না তাও দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে বিএনপিকে ধৈর্যের সঙ্গে এগোতে হবে। কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে এদেশে নির্বাচন বলতে যা বোঝায়, তা হয়নি। এখন যখন একটি নির্বাচনের আবহ তৈরি হয়েছে তখন সেটা যেন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি প্রয়োজন। সব দলকে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশা।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক
