ব্যাটিং স্বর্গ হিসেবে পরিচিত সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেট। যেখানে দিনের শুরুতে পেসাররা সুইং ও সিম মুভমেন্টের সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে যে দল টস জেতে সে বোলিংটাই বেছে নেয়। লক্ষ্য থাকে শুরুতেই প্রতিপক্ষের কয়েকটি উইকেট তুলে নিয়ে চাপে ফেলা। সেটা জেনেও বাংলাদেশ বেছে নিল ব্যাটিং। ব্যাটসম্যানরা দাঁতে চেপে লড়াইটা করতে পারলেন না। বিশেষ করে ওপেনাররা উইকেট উপহার দিয়ে আসেন জিম্বাবুয়ের বোলারদের। মাঝের শান্ত আর মুমিনুল সেট হলেও আউট হয়েছেন সেই দায়িত্বহীন শট খেলে। তাদের বিদায়ের পরই যেন ধস নামে ব্যাটিং লাইনআপে। স্বাগতিকদের এই ধস প্রতিপক্ষের পেস বোলিং কোচ চার্লস ল্যাঙ্গাভেল্ট আখ্যায়িত করেছেন চাপের মুখে ‘মানসিক ভুল’ হিসেবে। যার সঙ্গে দ্বিমত করেননি বাংলাদেশের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনও।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হয়েছে দিনের আলো নেভার আগেই। মাত্র ১৯১ রানেই গুটিয়ে যায় তারা। শেষ বিকেলে হতাশ করেছেন বোলাররাও। তারা নিতে পারেননি কোনো উইকেট। তাতে ফুটে ওঠে মানসিক দুর্বলতার দিক।
প্রথম দিনের খেলা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন জিম্বাবুয়ের পেস বোলিং কোচ ল্যাঙ্গাভেল্ট। বাংলাদেশের এই পারফরম্যান্সের কারণ তার কাছে কী মনে হয়? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এটাকে মানসিক ভুল বলব। যেকোনো ব্যাটিং লাইনআপেই এমন হতে পারে। মুজারাবানি একটি ক্রস-সিম বল করেছিল, যেখানে বাড়তি বাউন্স ছিল। সেটি ব্যাটারের প্রিয় জায়গা হতে পারে, কিন্তু মাঝে মাঝে এমন ভুল হয়েই যায়।’ তিনি চলে যেতেই সংবাদ সম্মেলন কক্ষে আসেন সালাহউদ্দিন। তিনিও কথা বললেন একই সুরে। চোখেমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট দেখে বোঝাই যাচ্ছিল সন্তুষ্ট নন তিনিও। তবুও গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে সমর্থন দিলেন নিজের শিষ্যদেরই। বলেছেন, ‘মানসিক দিক থেকে ছেলেরা অনেক কিছু পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। নিজেদের উন্নতির ব্যাপারে তারা অনেক বেশি সচেতন। হয়তো আমরা খুব খারাপ খেলেছি। কিন্তু এটা বলা যাবে না যে তারা চেষ্টা করছে না বা বড় হওয়ার ইচ্ছা নেই।’ সালাউদ্দিন মনে করেন, বাজে শটগুলো আসলে ‘ম্যাচ প্রসেস’-এ না থাকার ফল। তার ভাষায়, ‘প্রতিটি বল ফেস (মোকাবিলা) করার আগে কীভাবে রুটিন ওয়ার্ক করতে হয়, সেটা আমরা করতে পারিনি। অন্য ফরম্যাটে আপনি একবার সুযোগ পান। টেস্ট ক্রিকেট আপনাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। সেখানে ভালো করাটা অনেক বেশি জরুরি।’
দ্রুত ২ উইকেট হারানোর পর শান্ত মুমিনুলের সেট হওয়া। তারপরই উইকেট উপহার দিয়ে আসা। মুশফিকুর রহিম, জাকের আলি অনিক ও মেহেদী হাসান মিরাজও হাঁটলেন একই পথে। সিনিয়র হয়েও ক্রিকেটারদের ম্যাচ অ্যাওয়ারনেস নিয়ে ঘাটতি আছে কি না জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, ‘ম্যাচ অ্যাওয়ারনেসের ঘাটতির উত্তর সবাই জানে। ভুল হতেই পারে, কিন্তু সেই ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।’ সিনিয়র ব্যাটারদের প্রসঙ্গ উঠতেই কিছুটা বিরক্তিই প্রকাশ পেয়েছে তার কণ্ঠে। বিশেষ করে ফর্মহীন মুশফিকুর রহিমকে কেন বিশ্রাম দেওয়া হয় না, একাদশের বাইরে রাখা হয় না? জানতে চাইলে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘এটা আমাকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। আমি দলের অংশ হতে পারি, তবে সব কিছু না।’
শান্ত ও মুমিনুল হকের ইনিংস নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা সেট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভুল শট খেলেছে। শান্ত নিজেও স্বীকার করেছে, ওর শটটা মারার বল ছিল না।’ মিরাজকে নিয়েও মত দেন কোচ, ‘এই পর্যায়ে শর্ট বল সামলানোর দক্ষতা না থাকলে প্রতিপক্ষ বারবার ওকেই আক্রমণ করবে।’
বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামো নিয়েও বেশ খোলামেলা কথা বলেন তিনি, ‘একটা দেশের ক্রিকেট নির্দিষ্ট কয়েকজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে না। স্ট্রাকচার কেমন এবং খেলোয়াড়রা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে উঠে আসছে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রিমিয়ার লিগ খেলে আসছে, ওখানে উইকেট যেমন ছিল, এখানে আলাদা বলের খেলা। এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় দরকার।’ জাতীয় দলের প্রস্তুতি নিয়ে বলেন, ‘যতটুকু দরকার ছিল, এখানে এসে আমরা সেটা পেয়েছি। এই একটা জায়গায় আমরা ভালো প্রস্তুতিই পেয়েছি। কিন্তু আজ (গতকাল) পারিনি, এটা আমাদের ব্যর্থতা।’ শেষদিকে সালাউদ্দিনের মন্তব্য আরও স্পষ্ট, ‘একটা দেশের ক্রিকেট কীভাবে এগোবে, সেখানে সবারই সাহায্য করতে হবে। শুধু খেলোয়াড় ভালো হলে হবে না, কোচ, কাঠামো, মাঠ সব জায়গায় উন্নতি লাগবে। আমি কাছ থেকে দেখেছি, ছেলেরা চেষ্টা করছে। কিন্তু এটা শুধু তাদের একার পক্ষে সম্ভব না।’
বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপে যে হুট করেই ধস নামা সেটা এবারই প্রথম নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই এমনটি হচ্ছে। পারফরম্যান্সে ধারাবাহিক না হলেও এক্ষেত্রে বেশ ধারাবাহিক বাংলাদেশি ব্যাটাররা। তাদের ধারাবাহিক হতে কত ইনিংস সময় দেওয়া হবে? জানতে চাইলে তার জবাব, ‘কত ইনিংস দেব, সেটা বলা যাবে না।’ এই কথার মধ্যেই ছিল এক অজানা শঙ্কা, আবার দায়িত্ববোধও। সব মিলিয়ে, সিলেট টেস্টে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের ভেঙে পড়া ব্যাটিংয়ের পেছনে প্রশিক্ষণ বা কৌশলগত দিক নয়, ‘প্রক্রিয়ায় গলদ ও মানসিক ভুল’ই আসল বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
