নির্বাচন, সংস্কার, নয়া নয়া দলের আবির্ভাবের মধ্যে সামনে মাসখানেকের মধ্যে বাজেট। মনেও করতে পারছেন না অনেকে। সচেতনদের মধ্যে এ নিয়ে শঙ্কা। নিত্যপণ্য বলতে যারা কেবল চাল-ডাল-তেল-আলু-পেঁয়াজ বোঝেন, তাদের কথা আলাদা। এর মধ্যে আবার বিতাড়িত আওয়ামী লীগ রাজধানী ঢাকাসহ এখানে-ওখানে ঢুঁ মারছে। কারও ভাষায় ঝটিকা মিছিল, কারও ভাষায় চোরাগোপ্তা মিছিল। মিনিট কয়েক মিছিল করেই ভোঁ দৌড়।
সরকারের শীর্ষ পর্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে পুলিশকে কড়া নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ যেন কোথাও নামতে না পারে। এ নিয়ে নানা মত-ভিন্নমত কারও কারও। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ সংগঠন নয়। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন আছে। মানে রাজনীতির ফিটনেস আছে। ফিটনেস থাকলে রুট পারমিট পাবে না কেন? এর বিপরীত তথ্য হচ্ছে, কৃতকর্মের জন্য আওয়ামী লীগ এখনো দুঃখ প্রকাশ করেনি। ক্ষমা চাওয়া তো আরও পরের ব্যাপার। তারা মনেই করে, যা করেছে সব ঠিকই করেছে। সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে আরও করবে। এ দুই মতের সমান্তরালে আরেকটি মত হচ্ছে, মাঠ সিধা রাখতে আওয়ামী লীগের মতো একটা দল মাঠে থাকা দরকার। এই ভাবনা শুধু ফ্যাসিবাদের পক্ষভুক্তদের নয়, সুবোধ জনগোষ্ঠীর কারও কারও। ব্যাখ্যা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ একটা কীটনাশকের মতো, খাওয়ার জন্য নয়, কীটপতঙ্গ বিনাশের জন্য এটা দরকার। পতনের ৭-৮ মাসের মধ্যে আওয়ামী লীগ এভাবে মাঠে নেমে পড়বে সেটা অনেকের ধারণার বাইরে। কারও কারও এ প্রশ্নও আছে, বিএনপির চোখ-কান বন্ধ এবং সহযোগিতা না থাকলে আওয়ামী লীগ হঠাৎ মিছিল করার সাহস পায় কীভাবে? প্রশাসনের আগাম প্রস্তুতি নেই কেন? বিএনপি এখন ডান-বাম, জামায়াত-হেফাজত, সিপিবি-বাসদ সবাইকে নিজের পক্ষে টানায় ব্যস্ত। সিপিবি-বাসদ বা হেফাজতের অংশবিশেষ দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করেছে। ফ্যাসিস্টদের টিকিয়ে রাখতে অবদান রেখেছে। এখন বিএনপি তাদের কোলে তুলছে। এর বাইরে আছে ছাত্রদের গড়া নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। তারা রাজনীতির নতুন বন্দোবস্ত চায়। বাংলাদেশের প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে গুলশানের করপোরেট ধনকুবের নির্বিশেষে অনেকের মধ্যে আবার নৌকা বা ধানের শীষের বাতাবরণ আরোপের প্রবণতা। আলামতটা নৌকার সোল এজেন্টদের আশা জাগাচ্ছে।
শেখ হাসিনা তার স্বজন ও একান্তদের নিয়ে পালিয়েছেন। অনেকে হিজ-হিজ, হুজ-হুজে নিজেরাই পালিয়েছেন। কেউ কেউ কিছুদিন নানা জায়গায় লুকিয়ে থেকে সমাজে মিলেমিশে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছেন। আসলে তারা আওয়ামী লীগ করেননি বা বাধ্য হয়ে করেছিলেন, এ ধরনের কিছু বাহানায় কোনোমতে জান বাঁচানোকে ফরজজ্ঞান করে টিকে থাকায় সচেষ্ট। এই শ্রেণিটাকেও নিরাপদ থাকতে দিতে নারাজ শেখ হাসিনা। তিনি চান, এরা গা-ঝাড়া দিক। মার খাক। দেশে ইস্যু তৈরি হোক। তাদের গা-ঝাড়া নিশ্চিত করতে কখনো চট করে দেশে চলে আসাসহ নানান কুনির্দেশনার অডিও ছাড়ছেন ক’দিন পরপর। কখনো কখনো অবাস্তব কর্মসূচি ঘোষণা করে তামাশায় ফেলছেন নেতাকর্মীদের। দলীয় আবেগ বা ভবিষ্যতে আরও কিছু প্রাপ্তির লোভে-মোহে কেউ কেউ এসবে গা মেখে ঝুঁকিতে পড়ছেন। মার খাচ্ছেন। কেউ পাকড়াও হচ্ছেন। বাস্তবে শেখ হাসিনা সেটাই চান। তার চাওয়া এই কর্মী-সমর্থকদের মাধ্যমে মাঠের আলোচনায় থাক আওয়ামী লীগ। প্রাসঙ্গিকতায় থাক শেখ হাসিনা। এরা বাঁচলে বাঁচুক, নয় মরুক। হুট করে, চট করে, টুস করে এ ধরনের শব্দে বরাবরই আসক্ত শেখ হাসিনা। এ ধরনের শব্দ তার মুখে লেগেই থাকে। যা ফ্যাসিস্ট রাজনীতির উপাদান। আর ফ্যাসিস্ট দলটিকে এ দেশের মানুষের কাছে হাজির করা হয়েছে প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ ও সংস্কৃতিমনস্ক দল হিসেবে। দলটির ফ্যাসিস্ট চরিত্র সবসময় আড়াল করা হয়েছে। এমনকি আওয়ামী লীগকে একটি উদার রাজনৈতিক দল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও চলেছে। অত্যন্ত সুন্নি, ধার্মিক বিশ্লেষণও গেলানোর চেষ্টা কম হয়নি। সেইসঙ্গে শেখ মুজিবকে দেবতা মানতে বাধ্য করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নামের সঙ্গে হযরত এবং শেখ মুজিবের নামে খুতবা পাঠের কানাঘুষাও চালানো হয়েছে। শেষতক এসব আর হালে পানি পায়নি। বরং চব্বিশের জুলাই-আগস্ট সব বরবাদ করে করুণ পরিণতির মাধ্যমে হাসিনাকে দেশছাড়াও করেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে হাসিনার পতন ও পলায়নের পর আওয়ামী লীগ নেতাদের নিরাপদ আশ্রয় এখন কলকাতা। সেখানে তারা লুটের টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করছেন। অন্যদিকে দিল্লিতে বসে হাসিনা অডিও বার্তায় হুংকার ছাড়ছেন, তিনি বসে নেই। নেতাকর্মীদের রাস্তায় নামার জন্য নানাভাবে উসকানি দিচ্ছেন। এমনকি পাল্টা আঘাত হানার ডাক দিয়েছেন। নিজেকে আড়াল করে হাসিনার দেওয়া অডিও বার্তাগুলো বেশ রহস্যময়। যা লক্ষ করে শিক্ষার্থীরা জনসভায় গান গেয়েছিল ‘দেখা না দিলে আপা, কথা কইও না’। তবে হাসিনা কথা বন্ধ করার মানুষ নন। দেড় দশকের শাসনে গুম, খুন ও নিপীড়নমূলক কর্মকা-ের সঙ্গে তার লাগামহীন কথা এ দেশের মানুষের মনে গেঁথে আছে তীরের মতো। তার সেই স্বভাব এখনো অটুট। তবে এখন পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়ায় অডিও বার্তায় তার যেসব কথা শোনা যাচ্ছে, তাতে দুই হাজার মানুষের মৃত্যু ও প্রায় ২০ হাজার মানুষকে পঙ্গু করা নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই। নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে পালিয়ে যাওয়া নিয়ে কোনো লাজ-শরমও নেই। পালানোর ৭২ ঘণ্টা আগেও নিজেই বলেছিলেন, শেখ হাসিনা পালায় না। এমন দশা থেকেও এখন ঘুরে দাঁড়ানোর আশা আওয়ামী লীগের।
এর বাইরে বড় দল হিসেবে আছে জামায়াতে ইসলামি। তাদের মতিগতি অস্পষ্ট। নির্বাচন-সংস্কার নিয়ে এক এক দিন তাদের এক এক কথা। বিএনপির সঙ্গে মিলমিশ, আবার বিরোধিতা। সংস্কার নিয়ে নানান তত্ত্ব-তথ্য উভয়েরই। এসব নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঝুলে যায় কি না, কানাঘুষা চলছে। বিএনপি চায় শর্টকাটে কিছু সংস্কার। জামায়াত বলছে, জরুরি সংস্কারগুলো করতেই হবে। মৌলিক সংস্কার চায় এনসিপি। মৌলিক সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তাতে এনসিপি অংশ নেবে কি না তা বিবেচনায় থাকবে বলে জানিয়েছে তারা। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বর্তমান মাঠ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না। অনেক জায়গায় প্রশাসন বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। এই ধরনের প্রশাসন নিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রশাসন ও পুলিশ নিশ্চিত করতে হবে। তার ওপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ করে নাহিদ বলেন, হামলা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে। প্রশাসন অনেক জায়গায় বিএনপির পক্ষে কাজ করছে, এ ধরনের প্রশাসনের অধীনে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনারদের দল এনসিপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বসলে কী হতে পারে? এ প্রশ্ন বড় রকমের তালগোলের শঙ্কা জাগাচ্ছে। অর্থনীতি-রাজনীতির বাইরে কূটনীতিতেও গোলমাল যাচ্ছে। ভালো খবর ধরা দিয়েও দিচ্ছে না। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের একটি হাব বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে ড. ইউনূসের বিশ্ব ইমেজকে ঘিরে। বিনিয়োগ সম্মেলন প্রশ্নে এবারের আবহটা ছিল ভিন্ন। বড় মোক্ষম ও প্রাসঙ্গিক সময়ে বাংলাদেশের কোর্টে নিয়ে আসা হয় বিনিয়োগের বলটি। যখন যাবতীয় আলোচনা-পর্যালোচনার মূলে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সফরে চীন কী দিয়েছে, আরও কত কী দেবে বাংলাদেশকে এ প্রশ্ন নিয়ে। সেই আলোচনায় ছেদ ফেলে বিমসটেক সম্মেলন, সেখানে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক। সেখানে আবার ছেদ-ছন্দপতন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের করারোপের ঘটনা। সেটা কাটতে না কাটতেই ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বাতিল।
মিয়ানমারও নতুন করে ঠোকাচ্ছে। যেখানে এখন রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার আয়োজন চলার কথা, সেখানে উল্টো উৎপাত। সীমান্ত থেকে ১০ কিলোমিটার বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে আরাকান আর্মির একটা দল উৎসব করে গেছে। কিন্তু সরকার কিছুই বলেনি! ফিরে গিয়ে তারা সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করেছে! এদিকে, পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘ সময় পর আলোচনার বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে বিবৃতি দিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের তরফে মুক্তিযুদ্ধে নৃশংসতার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কিংবা স্বাধীনতাপূর্ব অভিন্ন সম্পদের জন্য বকেয়া অর্থ দাবির মতো বিষয়ে একটি শব্দও নেই। আবার বৈঠকে ‘ভারতের দখলে থাকা জম্মু ও কাশ্মীর’ নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের আলোচনা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কিছু বলা না হলেও পাকিস্তানের বিবৃতিতে এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কূটনীতিতে এগুলো গোলমাল আরও পাকাচ্ছে। সরকারকে এক পা এগোলে দুই পা পিছিয়ে দিচ্ছে। আমাদের সংস্কার লাগবে। ভোটও লাগবে। এসব নিয়ে নানা তত্ত্ব ও অতিকথন মানুষকে বিরক্ত করছে। সেই সঙ্গে শঙ্কা তো জাগাচ্ছেই।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
