আমাদের দেশে ‘দূষণ’ প্রায় সর্বক্ষেত্রে। পরিবেশ, খাদ্য দূষণে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। যার ফলে এমন মানসিক দূষণেই আমাদের বেড়ে ওঠা। যে কারণে, সামাজিক দূষণ জাপটে ধরেছে সর্বত্র। কোথাও শৃঙ্খলা নেই, ভদ্রতা নেই। যে সমাজে উচ্ছৃঙ্খলতা এবং অরুচিকর মানসিকতায় সাধারণ মানুষ বন্দি, তখন সুস্থ একজন মানুষের ভদ্রতা এবং শিষ্টতা নিয়ে বেঁচে থাকা দুষ্কর। সমাজের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নষ্টদের প্রবল আধিপত্য। সেখান থেকে নিজেকে সুস্থ, নিরাপদ এবং আলোকিত রাখা প্রায় অসম্ভব। রাজধানীতে প্রতিদিন, বিভিন্ন পরিবহনে লাখ লাখ মানুষের যাতায়াত। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই নারী থাকেন। কিন্তু চলাচলের ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে অনেক আগে। কিন্তু এই মুহূর্তে বিষয়টি যেন অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।
গণপরিবহনে নারীদের জন্য একদিকে নিরাপত্তা নিয়ে আস্থাহীনতা, অন্যদিকে সামাজিক অসচেতনতার কারণে দিন দিন নির্যাতন ও নিগ্রহ বাড়ছে। এমনিতেই নারীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার। তার মধ্যে আবার ‘গণপরিবহনে নারী নির্যাতন’। দেশের মোট জনসংখ্যার ৫০.৪ শতাংশ নারী হলেও, আজ পর্যন্ত গণপরিবহন নারীবান্ধব নয়। তারা যৌন হয়রানি, ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ আজও নেওয়া হয়নি! পত্রপত্রিকা, মিডিয়া, কলামে নানাভাবে নারীদের এমন দুর্ভোগের কথা গুরুত্বসহকারে বলা হলেও, কর্তৃপক্ষ আজও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে রহস্যজনকভাবে নীরব। এবার জানা যাচ্ছে, গণপরিবহনে যাতায়াতে ৮৭ ভাগ নারী মৌখিক, শারীরিক ও অন্যান্যভাবে হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। তাদের মধ্যে ৩৬ ভাগই যৌন হয়রানির শিকার। বৃহস্পতিবার ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ কার্যালয়ে (ডিটিসিএ) আয়োজিত ‘গণপরিবহনে নারীর সম্মান রাখুন’ ক্যাম্পেইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে নারীদের বাসে চলাচলের বিষয়ে একটি সচেতনতামূলক নাটিকায় এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও ইউএন উইমেন্স এবং সুইডেন দূতাবাসের সহযোগিতায় এ ক্যাম্পেইন আয়োজিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে গণপরিবহনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে সচেতনতা এবং আচরণগত পরিবর্তন করতে ১৬১ জন বাসের চালক ও কন্ডাক্টরদের প্রশিক্ষণ এবং সনদ দেওয়া হয়। শুভেচ্ছা বক্তব্যে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, ‘নিরাপদে চলা নারীর মৌলিক অধিকার। সে যেখানেই থাকুক, যে কাপড় পরে থাকুক বা যেকোনো অবস্থায় থাকুক, তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সমাজের দায়িত্ব। সেটা না করতে পারলে সমাজের জন্য লজ্জার বিষয়।’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে অবস্থিত সুইডেন রাষ্ট্রদূত এইচ ই নিকোলাস উইকস বলেন, ‘সবার জন্য উন্মুক্ত স্থানগুলোয় নারীদের জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।’ ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং বলেন, ‘নারী ও মেয়েদের অবাধে, নিরাপদে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যেকোনো জায়গায় যেকোনো সময় চলাফেরা করার অধিকার রয়েছে।’ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক নীলিমা আক্তার বলেন, ‘গণপরিবহনে নারীদের সম্মান করতে হবে। নারীদের নিজেদেরও এ বিষয়গুলোতে প্রতিবাদ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের নজরদারি দরকার।’
যৌন হয়রানির শিকার হতে হয় বলে গণপরিবহনে যাতায়াত নারীদের জন্য রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়। বিভিন্ন সময় সরকারিভাবে নারীদের চলাচল নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেছে সেসব উদ্যোগ। যৌন হয়রানি রোধে গণপরিবহনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি চালক-হেলপার ও বাস কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রকাশ্যে অনেক নারীই প্রতিবাদ করেন না। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠছেন নারীরা। গবেষকরা বলছেন, গণপরিবহনে যৌন হয়রানির বিষয়টি তীব্রতর হওয়াতেই প্রতিবাদের এমন ভিন্ন উদ্যোগ। গণপরিবহনে নারীদের দুর্ভোগ কমাতে কঠোর আইন করতে হবে। পাশাপাশি নারীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা দরকার। বাসের ড্রাইভার, হেলপার নারী না হলে, এই উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে মুক্তি পাওয়া দুরূহ। যেখানে প্রায় সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সমান অধিকার, সমান অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়, সেখানে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তাবোধের ইস্যু একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দেয়। এখন এই চিহ্নমুক্ত হওয়ার দায়িত্ব সরকারের। কীভাবে কী হবে, তারাই ভালো জানেন।
