২ শতাধিক সাপের কামড় খাওয়া ব্যক্তির রক্ত থেকে অ্যান্টিভেনম

আপডেট : ০৪ মে ২০২৫, ০৭:২১ এএম

২০১৭ সালে এক অদ্ভুত খবরের শিরোনামে চোখ আটকাল ইমিউনোলজিস্ট জ্যাকব গ্ল্যানভিলের। একজন মানুষ, যিনি বিশ্বের সবচেয়ে বিষাক্ত কিছু সাপ যেমন : কোবরা, মাম্বা ও র‌্যাটলস্নেকের বিষ নিজ শরীরে শত-শতবার ইনজেকশন দিয়েছেন এবং ইচ্ছাকৃত নিজেকে সাপের কামড় খেতে দিয়েছেন।

টিম ফ্রিডে নামের ওই ব্যক্তি যখন নিজের শরীরে একের পর এক বিষধর সাপের বিষ প্রয়োগ করছিলেন, তখন অনেকেই তাকে পাগল বলেই ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানী জ্যাকব গ্লানভিল বিষয়টিকে দেখেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন সম্ভাবনার এক গোপন রত্ন ফ্রিডের রক্তে থাকা বিরল অ্যান্টিবডি।

ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা টিম ফ্রিডে ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত সাপ বিশেষজ্ঞ। প্রায় ১৮ বছর ধরে ফ্রিড নিজেকে ইচ্ছাকৃত সাপের বিষে আক্রান্ত করে গেছেন কখনো ইনজেকশনের মাধ্যমে, কখনো সরাসরি কামড় খেয়ে। এর ফলে তার শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে, যা একাধিক সাপের নিউরোটক্সিনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরপর ফ্রিডে ৪০ মিলিলিটার রক্ত দিয়ে দেন গ্ল্যানভিলের গবেষণা দলে। আট বছর পর সেই রক্ত থেকে সংগ্রহ করা অ্যান্টিবডি ও একটি ভেনম-ব্লকার ওষুধের মাধ্যমে তৈরি হলো এমন এক অ্যান্টিভেনম, যা অন্তত ইঁদুরের দেহে ১৯ প্রজাতির বিষাক্ত সাপের কামড় ঠেকাতে সক্ষম।

সাপের কামড় এক বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকটে পরিণত হয়েছে। যদি আপনার দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো বিষধর সাপ আপনার শরীরে দাঁত বসিয়ে দেয়, তাহলে বাঁচার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায় অ্যান্টিভেনম, যা আজও প্রায় সেই ভিক্টোরিয়ান যুগের পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে। এই প্রচলিত পদ্ধতিতে সাপের বিষ সংগ্রহ করা হয় হাতে, তারপর তা অল্প অল্প করে ঘোড়া বা অন্য কোনো প্রাণীর শরীরে ইনজেকশন দিয়ে দেওয়া হয়। যাতে শরীর ইমিউন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরে সেই প্রাণীর রক্ত থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ করা হয়, যা বিষের বিরুদ্ধে কাজ করে। তবে এই প্রক্রিয়াটি যেমন সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি এতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে এবং তৈরি হওয়া সিরাম অনেক সময়ই শরীরে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ঘটাতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সাপের কামড়ের জন্য আরও উন্নত চিকিৎসা-পদ্ধতির আহ্বান জানিয়ে আসছেন। প্রতিদিন বিশ্বে প্রায় ২০০ জন মানুষ সাপের বিষে মারা যান, যার অধিকাংশই উন্নয়নশীল দেশে। প্রতিবছর প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ে স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যান। ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সাপের কামড়কে ‘উপেক্ষিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

ফ্রিডের রক্ত থেকে গবেষকরা যে অ্যান্টিবডিগুলো সংগ্রহ করেছেন, সেগুলো এমন কিছু নিউরোটক্সিনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যা ১৯টি বিষধর সাপের মধ্যে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ছিল কোরাল সাপ, মাম্বা, কোবরা, টাইপান, ক্রাইটসহ অনেক প্রজাতি। এরপর এই অ্যান্টিবডিগুলো একে একে পরীক্ষা করা হয়েছিল ইঁদুরের ওপর, যাদের শরীরে ওইসব সাপের বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল। এতে করে বিজ্ঞানীরা সুনির্দিষ্টভাবে বুঝতে পারেন, সব ধরনের বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে কতগুলো উপাদান ন্যূনতম প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত গবেষকরা একটি ‘ড্রাগ ককটেল’ তৈরি করেন, যাতে ছিল তিনটি উপাদান ফ্রিডের শরীর থেকে সংগ্রহ করা দুটি অ্যান্টিবডি এবং একটি ছোট আকারের ওষুধ ভ্যারেসপ্লাডিব, যা এমন একটি এনজাইমকে বাধা দেয়, যা ৯৫ শতাংশ সাপের কামড়ে সক্রিয় থাকে। এই ওষুধ বর্তমানে মানবদেহে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্যে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত