জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান নবযুগের সূচনা

আপডেট : ১৫ মে ২০২৫, ০৪:১৯ এএম

গত জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে অবৈধভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলকারি স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের অসহনীয় দুঃশাসনের অবসান ঘটেছে। দেশবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলন চলাকালে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীরা সহস্রাধিক মানুষকে হত্যা করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তো বটেই, পৃথিবীর আর কোথাও নিজ দেশের মানুষের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ করে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। এমনকি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীও হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করে মানুষ হত্যা করেনি। আন্দোলন চলাকালে নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করা হয়েছে। বাড়ির জানালায় দাঁড়ানো শিশুকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ কতটা নির্মম হলে জনসমর্থনহীনভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এমন নির্মম অত্যাচার চালাতে পারে, তা ভাবলেও গা শিউরে ওঠে। এত অত্যাচার-নির্যাতনের পরও আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা তাদের উদ্দেশ্য সাধনে ছিল একনিষ্ঠ। তাই শাসকগোষ্ঠীর নির্মম নির্যাতন তাদের লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। ছাত্র-জনতা বুকের রক্ত ঢেলে বাংলাদেশের জন্য নবযুগের সূচনা করেছে। ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশ আবারও নতুন করে জেগে ওঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ নানা কারণেই বারবার বিদেশি পরাশক্তির আক্রমণের শিকার হয়েছে। এদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জীবনযাত্রার সহজ লভ্যতা বিদেশিদের আকৃষ্ট করেছে। তাই বাংলাদেশ বারবার বিদেশিদের দ্বারা আক্রান্ত এবং পদানত হয়েছে। কিন্তু কখনোই পরাভব মানেনি। পরাজিত হলেও বাংলাদেশের মানুষ তাদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে বাংলাদেশ উপ-মহাদেশের যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে অগ্রগামী। তাই ইংরেজরা বঙ্গভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাদের এক গোপন নথিতে উল্লেখ করেছিল, ‘বাংলার মানুষ আজ যা ভাবে, ভারতের অন্য এলাকার মানুষ আগামীকাল তা ভাবে।’ বাংলার মানুষ স্বপ্ন দেখে, দিল্লির লাট ভবনে একজন বাঙালি বসে আছে। তাই বাংলাকে একত্রিত রাখা হলে তা ইংরেজ শাসনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তারা বাংলার মানুষের শক্তি এবং ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করেছিলেন। আমাদের দেশের মানুষ ভারতের অন্য যেকোনো এলাকার চেয়ে বেশি স্বাধীনতা প্রিয় এবং সংগ্রামী। এক সময় বাংলাদেশের মানুষকে ‘ভীতু বাঙালি’ বলে উপহাস করা হতো। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বারবারই প্রমাণ করেছে, তারা শান্তিপ্রিয় কিন্তু নিজ মাতৃভূমির স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন। বিদেশি শক্তি অনেকবারই বাংলা দখল করেছে। কিন্তু কোনোবারই দীর্ঘ স্থায়ীভাবে তাদের শাসনক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধে নবার সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় ঘটলে, মীর জাফর বাংলার মসনদ দখল করেন। ইংরেজরা পেছনে থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নাড়তে থাকেন। ১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেউয়ানি লাভের মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলার রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের দিকে অগ্রসর হয়। পরবর্তীকালে এক সময় তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ইংরেজরা বাংলা এবং ভারতবর্ষ শাসন করেন। ইংরেজরা এদেশে তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেন। কিন্তু কোনো কৌশলই বাংলার মানুষকে স্বাধীনতার স্পৃহা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, তার বেশিরভাগই হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের উদ্যোগে। ১৯৪৭ সালে ইংরেজরা উপমহাদেশের স্বাধীনতা এই দেশীয়দের হাতে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলাদেশের মানুষ উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল। ১৯৪০ সালে যে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল, তার মূলে ছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। তিনি যে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন, তাতে সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিতি উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অঞ্চল নিয়ে এক বা একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ একাধিক মুসলিম রাষ্ট্রের বিধান বাতিল করে একক মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের কথা সংযুক্ত করেন। সেই সময় যদি মূল লাহোর প্রস্তাবকে এভাবে সংশোধন করা না হতো, তাহলে উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতে পারত।

বাংলাদেশের মানুষ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে। স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকের মাঝে চেপে রেখে উপমহাদেশে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র কায়েম করে। ভারত বিভক্ত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে। উপমহাদেশের মানুষ অনুধাবন করতে পেরেছিল, হিন্দুপ্রধান অখন্ড ভারতে তাদের জাতিসত্ত্বা অক্ষুণœ রেখে চলা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। তাই তারা ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত পাকিস্তানে যোগ দিতে সম্মত হয় এবং পাকিস্তান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হতে খুব একটা দেরি হয়নি। ১৯৪৭ সাল পাকিস্তান স্বাধীনতা অর্জন করে। এরপরই রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ পূর্ব পাকিস্তানে বাস করলেও তাদের মাতৃভাষা বাংলাকে অবজ্ঞা করা হয়। ঘোষণা করা হয়, উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সেই বৈষম্যমূলক আচরণ মেনে নেয়নি। তারা আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তীকালে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ঢাকার রাজপথ ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। পৃথিবীর আর কোনো স্বাধীন দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় বুকের রক্ত ঢেলে দেবার নজীর নেই। বাংলাদেশ মোট ২৪ বছর পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই সময়টা এদেশের মানুষের জন্য ছিল বিভীষিকাময়। পাকিস্তানি শাসকচক্র আমাদের দেশের মানুষের ওপর নির্মম শোষণ-নির্যাতন চালিয়েছে। এক সময় বাংলাদেশের মানুষ তাদের অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। তাদের সেই সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ঘটে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে।

বিগত সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা কী ছিল, তা বোধ হয় তাদের জানা নেই। আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। আমরা যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল দুটি। জনগণের মতামতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক উপায়ে সরকার পরিবর্তন বা নতুন সরকার গঠন। আর অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদ্যমান সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যদি ১৯৭০ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা হস্তান্তর করত, তাহলে কি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রয়োজন হতো? ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ কর্তৃক প্রকাশিত, ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেনো?’ পোস্টারের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? সেই পোস্টারে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছিল। বলা হতো, পূর্ব পাকিস্তান থেকে সব সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে আমরা কি দেখলাম? স্বাধীন বাংলাদেশ ক্ষমতাসীনদের লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হলো। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। কিন্তু তারা স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে তিন বছরের আওয়ামী শাসনের কথা একবারও উচ্চারণ করেনি। কারণ সেই সময় আওয়ামী দুঃশাসনের কারণে দেশের অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। ১৯৭৪ সালে সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। পরবর্তীকালে গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, খাদ্যাভাবের কারণে এত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়নি। খাদ্যদ্রব্য সঠিকভাবে উপদ্রুত এলাকার মানুষের মাঝে বিতরণ না করার কারণেই এমন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। সেই সময় আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতা খাদ্যদ্রব্য দেশের বাইরে পাচার করেছিল। ফলে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠন করে সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক তখনই ঠুকে দেওয়া হয়েছিল। সব সংবাদপত্র বন্ধ করে মাত্র ৪টি সংবাদপত্র চালু রাখা হয়। বাকস্বাধীনতার সব সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিপ্লবী নেতা সিরাজ সিকদারকে হত্যার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম ক্রসফায়ারের সূত্রপাত ঘটানো হয়েছিল।  

স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ যে দুঃশাসনের জন্ম দিয়েছিল, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তাকে আরও বিস্তৃত করা হয়। যুক্তিযুদ্ধের প্রধান লক্ষ্য ছিল, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মানুষ তার নিজের ইচ্ছামতো সরকার গঠন করতে পারবে। একই সঙ্গে সব ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূরীভূত হবে। কিন্তু বিগত সরকার আমলে নির্বাচন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে ফেলা হয়। ১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রণীত তিন জোটের উদ্যোগে যে রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছিল, সেখানে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছি। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করলে নানা অজুহাতে সেই সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালানো হয়। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিএনপিকে একদিনও শান্তিতে থাকতে দেওয়া হবে না। শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক জীবনে অনেকবারই অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন, কিন্তু বিএনপিকে একদিনও শান্তিতে থাকতে না দেওয়ার অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি এক তরফা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। সেই নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা আছে। কিন্তু ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনের যে আবশ্যকতা ছিল তা পরবর্তীকালে অনুধাবন করা গেছে। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার পর বিএনপি দ্রুততম সময়ের মধ্যে পদত্যাগ করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা না হতো, তাহলে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই বাতিল করতেন। এটা তাদের পরবর্তী আচরণ বা কার্যকলাপে প্রতীয়মান হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস এবং কলুষিত করেছে, অন্য কোনো সরকারের পক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তারা আদালতকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বাতিল করে দেয়। এরপর দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ২০১৪ সালে বিরোধী দল বিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় বলা হয়েছিল, এটা শুধু নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। কিছু দিনের মধ্যে সব দলের অংশ গ্রহণে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সেই অঙ্গীকার রক্ষা করা হয়নি। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংসের জন্য আওয়ামী লীগ চিরদিন সমালোচিত হবে। এমন একটি সময় আসবে যখন আওয়ামী লীগ তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের কথা বলতেও লজ্জাবোধ করবে। বাংলাদেশে অনেক নেতা-নেত্রীর আগমন ঘটেছে, কিন্তু শেখ হাসিনার মতো নির্মম, নিষ্ঠুর এবং মানসিক বিকারগ্রস্ত নেতা-নেত্রী একজনও আসেনি। তিনি সম্মানিত ব্যক্তিদের অসম্মান করে বিকৃত আনন্দ উপভোগ করতেন। একবার আদালত শেখ হাসিনাকে ‘রং হেডেড’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন, তার চরিত্র হননের চেষ্টা করতেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তিনি পদ্মা নদীতে চুবাতে চেয়েছিলেন। 

আওয়ামী লীগ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে বেশ আত্মতৃপ্তি অর্জন করার চেষ্টা করে। তাদের আমলে সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ বিশে^ উন্নয়নের ‘রোল মডেলে’ পরিণত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ আমলে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়নের জন্য জাতিকে কতটা মাশুল দিতে হয়েছে, তা কি আমরা একবারও ভেবে দেখি? অতি উন্নয়ন, অতি দুর্নীতিই ছিল আওয়ামী লীগের দর্শন। প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে কমিশন ভোগ করেছে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা এবং দলীয় লোকজন। ভারতে এক কিলোমিটার ফোর লেন রাস্তা নির্মাণ করতে যে অর্থ ব্যয় হয়, বাংলাদেশে ঠিক একই পরিমাণ রাস্তা নির্মাণের জন্য ৪ গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে। এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের উন্নয়ন। আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতারাও শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা গিনিসহগ-এর মতে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল অনেকটাই সহনীয় পর্যায়ে। কিন্তু তখন তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ ও আত্মীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোন প্রতিষ্ঠানই ঠিকমতো কাজ করতে পারেনি। পুলিশ বাহিনীকে দলীয় ক্যাডারের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। ৫ আগস্ট সরকারের পতন হলে দলীয় নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। এমন কি বিভিন্ন থানা থেকে পুলিশ সদস্যরাও পালিয়ে যায়। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এর আগেও বেশ কয়েকবার আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন হয়েছে। কিন্তু কোনোবারই দলীয় নেতাকর্মীরা একযোগে পালিয়ে যায়নি, পুলিশ তো নয়ই। আওয়ামী লীগ আমলে যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে, তা কতটা টেকসই এবং ব্যয়সাশ্রয়ী তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। ব্রিজে লোহার পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। বালিশকা-ের কথাও আমাদের অজানা নয়।

বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামালে বাংলাদেশ একটি দল ও পরিবারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। তারা যেভাবে ইচ্ছা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুুণ্ঠন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ থেকে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার সমতুল্য ২৮ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এটা দুর্নীতির সামান্য চিত্র মাত্র। কারণ দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সব টাকাই তো আর বিদেশে পাচার করা হয়নি। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যত টাকা বিদেশে পাচার করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা তারা দেশের অভ্যন্তরে কুক্ষিগত করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রীর বাসার একজন পিয়ন ৪০০ কোটি টাকার মালিক বলে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্য সভায় ঘোষণা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে দেশের মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পূর্বেই বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা সবচেয়ে বেশি বলত। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তাদের হাতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার আমলে হাজার হাজার দলীয় কর্মীকে মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে। এদের বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মদক্ষতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।

আওয়ামী লীগ তাদের শাসনামলে বাংলাদেশ ‘উন্নয়নের রোল মডেলে’ পরিণত হয়েছে বলে দাবি করত। কিন্তু তাদের এই দাবির কোনো গ্রহণযোগ্যতা ছিল না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান ম্যানিপুলেট করে তারা উন্নয়নের সাফল্য প্রদর্শন করত। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আওয়ামী লীগ আমলে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে উন্নয়ন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায়নি। বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, একটি জাতির জীবনে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একবারই আসে। আবার কারও কারও মতে, হাজার বছরে একবার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সৃষ্টি হয়। একটি দেশের মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশের বয়স যখন ১৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে থাকে সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বলা হয়। অর্থাৎ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি থাকে সেই অবস্থাকে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা বলা হয়। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কীভাবে অবদান রাখে তার প্রত্যক্ষ উদাহরণ হচ্ছে চীন। বিগত ৪৪ বছর ধরে বিশ্ব অর্থনীতিতে জাপান দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে অবস্থান করছিল। চীন তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করেছে। চীন জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে গেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে চীন অর্থনৈতিক শক্তির বিবেচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু বিগত সরকার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। পরিকল্পনাহীনতায় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অবস্থার সুফল অর্জন কীভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তার একটি উদাহরণ হতে পারে জনশক্তি রপ্তানি খাত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে জনশক্তি রপ্তানি খাত হচ্ছে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত। এই খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, তার পুরোটাই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করে। কিন্তু জনশক্তি রপ্তানি খাত নিয়ে সরকারের তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই বললেই চলে। এই খাতটি এখনো ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যে জনশক্তি রপ্তানি করা হয় তার বেশিরভাগই অদক্ষ অথবা আধা দক্ষ শ্রমিক। ফলে তারা বিদেশে গিয়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নানা সমস্যায় পড়েন। পরিকল্পিতভাবে দক্ষ এবং পেশাজীবী বিদেশে প্রেরণ করা গেলে, এই খাতের আয় কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব ছিল। বিগত সরকার আমলে দেশের উৎপাদন সেক্টরকে সঠিকভাবে পরিকল্পিত উপায়ে কাজে লাগানো হয়নি।      

আওয়ামী লীগ আমলে সাধারণ মানুষের কোনো বাকস্বাধীনতা ছিল না। রাজনৈতিক অধিকার ছিল না। তারা যেন কবরবাসী হয়ে দেশে বসবাস করছিল। এই দুঃসহ অবস্থা থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। অনেকেই বলছেন, ৫ আগস্ট আমাদের দ্বিতীয় স্বাধীনতা। আর কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা একবারই অর্জিত হয়। কাজেই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ বলে কিছু নেই। যারা ৫ আগস্টকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস বলছেন এবং যারা বলছেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলে কিছু নেই তাদের উভয়ের বক্তব্যের মধ্যেই আবেগের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়। বিদেশি শক্তির কবল থেকে একাধিকবার স্বাধীনতা অর্জিত হতে পারে। আর দেশের অভ্যন্তরে স্বৈরাচারী সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন করাকে স্বাধীনতা অর্জন বলা যায় না। এটাকে স্বৈরাচার মুক্তকরণ বলা যেতে পারে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে সাড়ে ১৫ বছরের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পতনকে দ্বিতীয় স্বাধীনতা বলা ঠিক হবে না। কিন্তু তাই বলে ৫ আগস্টকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে, ৫ আগস্ট স্বৈরাচার মুক্তির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আবারও যদি দেশ স্বৈরাচারের কবলে পতিত হয় তাহলে ৫ আগস্টের চেতনা আন্দোলনকারীদের উদ্বুদ্ধ করবে, অনুপ্রেরণা জোগাবে।

প্রতিবার দেশের মানুষ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সংগ্রাম-আন্দোলনে যুক্ত হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল। কিন্তু দেশের জনগণ যে উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল তা অর্জিত হয়নি। আমরা একটি স্বাধীন ভূখ- পেয়েছি, একটি পতাকা পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখনো তাদের মৌলিক অধিকার পায়নি। বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ এবং তার সুফল জনসাধারণ ন্যায্যতার ভিত্তিতে ভোগ করতে পারছে না। উন্নয়নের সুফল একটি বিশেষ মহলের হাতে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়েছে। আমাদের এখনো ভোটাধিকার, মৌলিক অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার মুক্তির জন্য এদেশের ছাত্র-জনতা এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলনে অংশ নিয়ে প্রতাপশালী এরশাদ সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। কথা ছিল তিন জোটের রূপরেখা মোতাবেক দেশ পরিচালিত হবে। কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক দলগুলোর অপরিণামদর্শিতার কারণে জনগণের সেই প্রত্যাশা বিফলে গেছে।

নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থাই সর্বোত্তম ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে আধুনিক বিশে^র অধিকাংশ মানুষের কাছে। কারণ গণতন্ত্রই মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে। তাই দুই শতাব্দী যাবৎ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে, গণতন্ত্র অর্জন করেছে এবং গণতন্ত্রের অগ্রাযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। আমাদের দেশেও প্রায়শ গণতন্ত্রের দাবিতে মানুষ সোচ্চার হয়েছে, সংগ্রাম করেছে এবং কখনো কখনো সফলও হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে গণতন্ত্র আছে এ কথা কি বলা যাবে? গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের অধিকারও থাকে না। অধিকারবঞ্চিত মানুষ মুক্তির পথ খুঁজতে থাকে। জনমানুষের পুনর্জাগরণই শুধু বিদ্যমান সংকট থেকে মুক্তির পথ রচনা করতে পারে। জনগণের শক্তি হিমালয় পর্বতের মতোই অটল এবং শক্তিশালী। পৃথিবীর প্রতিটি বিদ্রোহ-বিপ্লব এ সত্য প্রমাণ করে। রেনেসাঁর মতো একটি সফল বিপ্লবাত্মক গণজাগরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে সমসাময়িককালে সৃষ্ট সব সংকট নিরসন করা সম্ভব।

সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়েছে। দেশ আগামীতে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। সাধারণ মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। এবারের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। অতীতে আমরা বারবার প্রত্যক্ষ করেছি, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আন্দোলন করা হয় শেষ পর্যন্ত তা অর্জিত হয় না। রাজনৈতিক নেতাদের অদূরদর্শিতার কারণেই এমনটি ঘটে থাকে। কিন্তু এবারের আন্দোলনের মাধ্যমে যে গণআকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে তা কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে আগামীতে বাংলাদেশকে একটি সুখী-সমৃদ্ধ এবং মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। আন্দোলনকারীরা জনগণের হাতে আলোর মশাল তুলে দিয়েছে। এখন সেই আলোর মশাল বহন করার দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বের। কোনো কারণেই জনগণের প্রত্যাশাকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। আমাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এমন একটি নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল স্বীয় স্বার্থে আর কখনোই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে কলুষিত করতে না পারে। আগামীতে আন্দোলনের চেতনা বাস্তবায়নের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একতা বজায় রাখা। ঐক্যই আনতে পারে সাফল্য। আর অনৈক্য ব্যর্থতা বয়ে আনবে। কাজেই আমাদের সতর্ক হয়ে পথ চলতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি ৫ আগস্টের চেতনাকে সফলভাবে এগিয়ে নিয়ে যেতে না পারে, তাহলে দায়ভার তাদেরই বহন করতে হবে। আগামী প্রজন্ম কখনোই এই ব্যর্থতা ক্ষমা করবে না। অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে, কেউ যেন আর আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকে ভূলুণ্ঠিত করতে না পারে।                                            

 লেখক :  সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও

           বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত