ঠিক এক বছর এক মাস আগের কথা। সে সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের মিডিয়া কমিটির প্রধান জালাল ইউনুস। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের মাঝপথে দেশে ফিরে মোস্তাফিজুর রহমানের জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘মোস্তাফিজের শেখার প্রক্রিয়া শেষ। ওখান (আইপিএল) থেকে শেখার দরকার নেই। সে ৭-৮ বছর ধরে আইপিএল খেলে। লাভবান তারা হবে, আমরা নই।’ আইপিএলের পরের মৌসুম আসতে আসতে বাংলাদেশের সরকার বদলে গেছে, বোর্ডের অনেক চেনামুখও উধাও হয়ে গেছেন। তবে চিন্তাভাবনার ধরনটা বদলায়নি। আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুই টি-টোয়েন্টি সিরিজের জন্য এবার আইপিএলে যাওয়াটা আটকে যেতে পারে মোস্তাফিজের।
আইপিএলের খেলা ফের শুরু হবে ১৭ মে শনিবার থেকে। দেশে ফিরে যাওয়া অনেক ভিনদেশি ক্রিকেটারই আইপিএলের বাকি অংশের জন্য ভারতে ফিরতে গররাজি। দিল্লি ক্যাপিটালসের অস্ট্রেলিয়ান রিক্রুট জেক-ফ্রেজার ম্যাকগার্ম ব্যক্তিগত কারণে আইপিএলের বাকি অংশটুকু থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। অতীতে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে খেলা মোস্তাফিজুর রহমানকেই তাই বিকল্প হিসেবে ডাক দেয় রাজধানীর ফ্র্যাঞ্চাইজিটি। নইলে টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানের বিকল্প একজন বামহাতি পেসার, ব্যাপারটা বেশ বেমানান। অন্যদিকে মোস্তাফিজুর রহমান এবারে মৌসুমে ঢাকা লিগেও শুরু থেকে খেলেননি, তার সঙ্গে একাধিক আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কথা বলেছিল এমনটাই শোনা যাচ্ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সুপার লিগে মোহামেডানের হয়ে খেলেন মোস্তাফিজ। আইপিএল থেকে ডাক এলো, তবে সেটা অনেকটাই জলঘোলা হওয়ার পর। ততদিনে নির্বাচকরা আরব আমিরাত ও পাকিস্তান সফরের জন্য দল ঘোষণা করে ফেলেছেন এবং সেখানে মোস্তাফিজের নাম আছে।
বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান ইফতেখার আহমেদ মিঠু দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, জাতীয় দলের খেলা থাকলে কোনো ক্রিকেটারকে অন্য কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার জন্য ছাড়পথ দেওয়া হবে না, এটাই বিসিবির নীতি, ‘অনাপত্তির ব্যাপারে আমরা বলে দিয়েছি, জাতীয় দলের খেলার পর সে যেতে পারবে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলা থাকলে ও যেতে পারবে না। আরব আমিরাত সিরিজ ও পাকিস্তান সিরিজের মাঝের বিরতির সময়টায় সে খেলতে পারবে। এখানে দুইটা না পাঁচটা ম্যাচ এটা তো বলা যায় না। এটা স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে আমাদের অবস্থান হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলার সূচি থাকলে এই সময়ে অন্য কোথাও অংশ নেওয়া যাবে না, জাতীয় দল হচ্ছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের হয়ে খেলা বাদ দিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব না।’
তবে প্রতিপক্ষ যখন আরব আমিরাত, তখন মোস্তাফিজকে আইপিএলের জন্য ছেড়ে দেওয়া যেত কি না, এমন প্রসঙ্গে ইফতেখারের বক্তব্য, ‘দল ঘোষণার আগে যদি তাকে আইপিএলের দল ডাকত তাহলে একটা কথা ছিল। দল নির্বাচন করা হয়ে গেছে, দল চলে গেছে (আমিরাতে), তারপরে অনাপত্তিপত্র চাইছি। একটা নিয়মের মধ্যে থাকতে হবে না? নিয়মটা তো সবার জন্য। কালকে যদি মাঝপথে অন্য কেউ চায় আমরা কি দিয়ে দিতে পারব? এটা তো বিশ্বের সব জায়গায় একই নিয়ম, বিরাট কোহলিকে কি ট্যুরের মাঝখানে দেবে অন্য লিগে খেলতে? মোস্তাফিজ তো আগে সরে দাঁড়ায়নি।’
কাল ১৭ মে এবং ১৯ মে আরব আমিরাতের বিপক্ষে দুটি টি-টোয়েন্টি খেলবে বাংলাদেশ। এরপর গ্রুপ পর্বে দিল্লি ক্যাপিটালসের হয়ে দুটো ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ হতে পারে মোস্তাফিজের, ২১ মে মুম্বাইতে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের বিপক্ষে আর ২৪ মে জয়পুরে পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে। এই মুহূর্তে পয়েন্ট টেবিলের পাঁচে আছে ১১ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট পাওয়া দিল্লি ক্যাপিটালস। যদি শেষ পর্যন্ত তারা প্লে-অফ নিশ্চিত করে, তাহলে ম্যাচের সংখ্যা বাড়বে। সেগুলোও আবার মোস্তাফিজ খেলতে পারবেন কি না, সেটাও অনিশ্চিত, কারণ বাংলাদেশের পাকিস্তান সফরের দলেও আছেন এই বামহাতি পেসার। সফরের জন্য বাংলাদেশ সরকারের সবুজ সংকেতও মিলেছে। পিসিবির ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই পাঁচ টি-টোয়েন্টি হবে ২৭ মে থেকে ৩ জুন এই সময়ে। আইপিএলের ফাইনাল ৩ জুন। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তান সিরিজের জন্যও মোস্তাফিজকে ছাড়তে হবে দিল্লি ক্যাপিটালসকে। তাই ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত মোস্তাফিজকে মাত্র দুটি ম্যাচে খেলানোর নিশ্চয়তা নিয়ে দিল্লি সই করাবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেই একজন ক্রিকেটার বড় হয়ে ওঠেন। খেলার মান ও প্রতিপক্ষ বিবেচনায় জিম্বাবুয়ে কিংবা আমিরাতের চেয়ে আইপিএলের যেকোনো দলই অনেক শক্তিশালী, তাদের বিপক্ষে খেলার সুযোগটা হাতছাড়া হওয়াটা যেমন দুর্ভাগ্যজনক, একই সঙ্গে এটাও সত্যি যে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত আইপিএলের সাত মৌসুমে ৫৭টি ম্যাচ খেলেছেন মোস্তাফিজ। সেই অভিজ্ঞতার খুব কমই তিনি কাজে লাগাতে পেরেছেন জাতীয় দলে, বাড়তি আরও কয়েকটি ম্যাচ যে তাকে ব্যক্তিগতভাবে আরেকটু আর্থিক লাভ এনে দেওয়ার বাইরে দক্ষতা প্রচ- মাত্রায় বাড়িয়ে দেবে এমনটাও বলার উপায় নেই। তবে এ কথা সত্যি যে আইপিএলের সময় বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ে এসব দলেরই সিরিজ থাকে, অন্য বোর্ডগুলো এই সময়ে সিরিজ আয়োজন করে না। দক্ষতার ঘাটতি তো আছেই, তার সঙ্গে প্রতি বছরই জাতীয় দলের খেলা এবং এনওসি-সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের প্রতি আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো আগ্রহও দেখায় না। এবার তো রাজনৈতিক পরিস্থিতিও পক্ষে নয়। অতীতে সাকিবের বেলায় অনেক নীতিই ভেঙেছে বিসিবি। নীতিটা যেন সবার বেলায় অটুট থাকে, এটাই আশা করতে পারেন মোস্তাফিজ।
