নতুন চুক্তিতে ন্যায্য পাওনা নিশ্চিতের পরামর্শ

আপডেট : ১৬ মে ২০২৫, ০৬:৪১ এএম

পানির অভাবে নিদারুণ কষ্টে আছে পদ্মা নদী। এক সময়কার প্রমত্তা পদ্মার রাজশাহী পয়েন্টের চিত্র এখন বড়ই করুণ। ফারাক্কার প্রভাবে দিনদিন শুকিয়ে যাচ্ছে নদীটি। শুধু এই নদীই নয়, গেল কয়েক বছরে এ অঞ্চলের বেশ কিছু শাখানদী শুকিয়ে গেছে। এমন অবস্থাতেই আগামী বছর শেষ হচ্ছে ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ। নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।   

আজ ১৬ মে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চের ৪৯তম বর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটি। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কমিটির আহ্বায়ক ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ফারাক্কার সরাসরি শিকার রাজশাহীর মানুষ। বিগত ৪০ বছরের ব্যবধানে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকায় নদীর আয়তন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে তলদেশ ক্রমান্বয়ে ভরাট হতে চলেছে। জলজপ্রাণী বিশেষ করে কয়েক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গঙ্গার ডলফিন ও ঘড়িয়াল আর দেখা যায় না। আগের মতো পদ্মায় ইলিশের ঝাঁক আর আসে না। মহাবিপর্যয়কর অবস্থায় গঙ্গা অববাহিকার প্রাণবৈচিত্র্য। নদীকেন্দ্রিক নানা ধরনের পেশা হারিয়ে লাখ লাখ মানুষের জীবনে নেমে এসেছে ভয়াবহ বিপর্যয়।

রাজশাহীতে পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ চর আর ফসলি জমি দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এখানে একটি প্রমত্তা নদী ছিল। অথচ এক সময় এই নদীর বুকে ছিল অথৈ পানি। বর্ষা মৌসুমে পালতোলা নৌকা, জাহাজ স্টিমার চলত যেখানে, সেখানেই এখন ফসল ফলাতে ব্যস্ত কৃষক। পদ্মা নদীর অথৈ পানির সেসব কথা এখন যেন শুধুই ইতিহাস। শিশুদের কাছে মনে হতে পারে রূপকথার গল্প। বর্ষা মৌসুম ছাড়া পদ্মা নদীর রাজশাহী পয়েন্ট পানির দেখা মেলা কষ্টকর। বছরে ২/১ মাস নদীতে পানি থাকে আর বাকি সময় জুড়ে থাকে ধু ধু বালুচর।

শুধু খরা মৌসুমেই নয় পদ্মা নদীতে বর্ষা মৌসুমেও পানির সরবরাহ থাকছে তুলনামূলক কম। এ কারণে গত এক দশকে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় বন্যা হয়নি। 

পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতদিন নিজস্ব ধারায় চলতে পেরেছে পদ্মা নদী, ততদিনই এটির রূপ ছিল প্রমত্তা। কিন্তু ১৭৭৫ সালের এপ্রিলে ভারতে ফারাক্কা বাঁধ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দিন যত যাচ্ছে রুগ্ন হচ্ছে পদ্মা নদী। রাজশাহী পয়েন্টে খরা মৌসুমে পানির উচ্চতা কমেই চলেছে। এ বছর গত ১২ মে এখানকার পানির উচ্চতা নেমে যায় ৬ দশমিক ৯৫ মিটারে। চলতি বছরে এটিই সর্বনি¤œœ স্তর। আবার বর্ষা মৌসুমেও এখন আর আগের মতো পানির প্রবাহ থাকে না নদীতে। এ কারণে সেভাবে আর বন্যাও হয় না।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, ভারতের সঙ্গে যে চুক্তি আছে আমরা হয়তো সেই অনুযায়ী পানি পাচ্ছি কিন্তু এই পানি আমাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। পানির অভাবে পদ্মার বুকে চর জেগেছে। আগামী বছর পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। এর পরই নতুন করে এটি নিয়ে আলোচনা হবে। তখন হয়তো এই বিষয়গুলো উঠে আসবে। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নদী ছোট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে নদীটির তলদেশ পূর্ণ করে ফেলছে। এর ফলে বর্ষার মৌসুমে নদী অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারছে না। একদিকে, নদী শুকিয়ে যাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি খরা সৃষ্টি হচ্ছে, যা কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় জীবিকা বিপর্যস্ত করছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিজবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক সারওয়ার জাহান বলেছেন, ফারাক্কা ব্যারেজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পানির অভাব। পদ্মা নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর সংযুক্ত নদীগুলো যেমন মহানন্দা, আত্রাই, পুনর্ভবা, ও বার্নাই নদীও পানিহীন হয়ে পড়ছে। এভাবে নদীগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত খাল, জলাশয় এবং ভূগর্ভস্থ জল পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধীরে ধীরে কমছে।

রাজশাহীর নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী ভারতের তৈরি ফারাক্কার প্রভাবে এ অঞ্চলের মানুষ চরম ক্ষতির শিকার। পৃথিবীর কোনো দেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র এমন আচরণ করেনি। তিনি বলেন, আমাদের এখন ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। নিজেদের দাবির প্রতি সোচ্চার থাকতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত