২৩ বছর পর মোহামেডানের শিরোপা

আপডেট : ১৮ মে ২০২৫, ০৩:৪৪ এএম

ডরমেটরির উঠোনে বসে মোবাইলে মাথা গুঁজে আছেন সুলেমান দিয়াবাতে। মোবাইল স্ক্রিনে চলতে থাকা আবাহনী ও ফর্টিস এফসি ম্যাচে দৃষ্টি নিবদ্ধ তার। পাশেই রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষায় একঝাঁক সমর্থক। বারান্দায় পায়চারি করছেন ম্যানেজার ইমতিয়াজ আহমেদ নকিব। নিজ কক্ষে কিছুক্ষণ মোবাইলে সেই ম্যাচে দৃষ্টি রেখে ঘাড়ের থেরাপি দিতে বের হলেন কোচ আলফাজ আহমেদ। সময় যেন কাটছিলই না। অবশেষে বাজল রেফারি সায়মন হাসানের শেষ বাঁশি। মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন স্লোগানে মুখরিত হলো গোটা ক্লাব। ফর্টিসের কাছে ২-১ গোলে হেরে চিরশত্রু আবাহনীই যেন ২৩ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে দিল মোহামেডানের। শীর্ষ লিগের শিরোপার অপেক্ষা ঘুচল মতিঝিল জায়ান্টদের।

লিগের তিন ম্যাচ বাকি থাকতেই সবার ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে মোহামেডান। আবাহনীর সুযোগ ছিল তাদের পেছনে ফেলার। তবে কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের শিরোপা অপেক্ষা ঘোচাতে হলে শেষ চার ম্যাচ জিতলেই হতো না, একই সঙ্গে মোহামেডানের পয়েন্ট খোয়ানোর প্রার্থনা করতে হতো। তবে দেশ জুড়ে লাখো মোহামেডান সমর্থকের প্রার্থনায় জিতে গেল শনিবার। মনেপ্রাণে তারা ফর্টিসের জয় চেয়েছিল। কুমিল্লায় ফর্টিস যেন খেলল মোহামেডানের হয়ে। বজ্রপাত ও বৃষ্টির কারণে বিঘিœত ম্যাচের ৩৯ মিনিটে পেনাল্টি থেকে ফর্টিসকে এগিয়ে নেন গাম্বিয়ান পা ওমর জোবে। ৭৭ মিনিটে ব্যবধান বাড়ান সাজেদ হাসান জুম্মন। এর পরপরই দশজনের দলে পরিণত হয়েছিল ফর্টিস। মনজুরুর রহমান সরাসরি লালকার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে আবাহনী জোর চেষ্টা চালায় ম্যাচে ফেরার। ৮০ মিনিটে ব্রাজিলিয়ান রাফায়েল আগুস্তোর ফ্রি-কিকে পা ছুঁয়ে ব্যবধান কমিয়েছিলেন অভিজ্ঞ ইয়াসিন খান। তবে মোহামেডানের শিরোপা উৎসব থামাতে যে সমতাসূচক গোল প্রয়োজন ছিল, সেটা পায়নি আবাহনী।

১৫ রাউন্ড শেষে মোহামেডানের সংগ্রহ ৩৮। আবাহনীর চেয়ে ১০ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ আবাহনী শেষ তিন ম্যাচ জিতলেও শিরোপা ছুঁতে পারবে না। মোহামেডানের শিরোপার অপেক্ষা পাক্কা ২৩ বছরের। ২০০২ সালে সর্বশেষ শীর্ষ লিগের শিরোপা জিতেছিল তারা। আর দেশের ফুটবল পেশাদার যুগে পা রাখার পর এলো প্রথম লিগ শিরোপা। গত ছয় মৌসুম এই দিনটির অপেক্ষায় ছিলেন মোহামেডানের ঘরের ছেলে বনে যাওয়া সুলেমান দিয়াবাতে। মালির এই ফরোয়ার্ড শেষ তিন মৌসুম ধরে মোহামেডানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এবারও দলটির সর্বোচ্চ গোলদাতাদের একজন তিনি। শেষ পর্যন্ত শিরোপা নিশ্চিত হওয়াকে স্বপ্নপূরণ মানছেন দিয়াবাতে, ‘ম্যাচ শেষ হওয়ার আগে আমার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গিয়েছিল। এখন ম্যাচটা শেষ হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। মোহামেডান এখন চ্যাম্পিয়ন, দীর্ঘ ২২ বছর পর আমরা শিরোপা জিতেছি। এটা খুবই সুন্দর অনুভূতি। আমরা শুরু থেকে অনেক পরিশ্রম করেছি, অনেক ঘাটতি ছিল আমাদের। অনেক কিছুই মনমতো ছিল না। তারপরও দিনশেষে আমরা চ্যাম্পিয়ন। এটা আমার কাছে অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণের মতো ব্যাপার।’

যার অধীনে মোহামেডানের দীর্ঘদিনের আক্ষেপ ঘুচেছে সেই আলফাজ আহমেদ সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন, ‘আমাদের একটা লক্ষ্য অবশ্যই ছিল। মৌসুম শুরুর আগে অফিশিয়ালরা জিজ্ঞাসা করেছিলেন আমরা পারব কি না। আমরা বলেছিলাম পারব। আমরা একটা দলকেই গত তিন মৌসুম ধরে রেখেছি। আল্লাহতায়ালার অশেষ মেহেরবানী যে আমরা শিরোপা জিততে পেরেছি।’ লক্ষ্যপূরণের পর কিছু অপ্রাপ্তির কথাও ঝরেছে আলফাজের কণ্ঠে, ‘অনেক কষ্টের ফসল এই চ্যাম্পিয়নশিপ। আমাদের অনেক কিছুই ছিল না। মাঠ, ভালো খেলোয়াড় সংকট। এসব কিছু মেনে নিয়ে খেলোয়াড়রা যে পরিমাণ পরিশ্রম করেছে, সেটা না বললেই নয়। একমাত্র আমাদের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ও ক্লাব সভাপতি ছাড়া পাশে কাউকেই পাইনি। আমাদের অভিভাবকদের চ্যাম্পিয়নশিপের চাওয়া ছিল না। তারা বলতেন ক্লাবের ঐতিহ্যটা ফিরিয়ে আনতে। আমরা সেই চেষ্টাই করেছি।’

সেই ২০১৯ সাল থেকে মোহামেডানকে কক্ষে ফেরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন একঝাঁক সাবেক তারকা। তাদেরই একজন ইমতিয়াজ আহমেদ নকীব ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করছেন। ২০০২ সালে সর্বশেষ লিগ শিরোপা জয়ে খেলোয়াড় হিসেবে বড় অবদান ছিল তার। এবার অন্য পরিচয়ে পেলেন শিরোপার স্বাদ। প্রতিক্রিয়ায় নকীব বলেন, ‘দলীয় শৃঙ্খলার কারণেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমাদের ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান আলমগীর ভাই, ক্লাব প্রেসিডেন্ট জেনারেল মুবিন সাহেব, দুজনের জন্যই আমরা আজ এ জায়গায় আসতে পেরেছি। লোকাল আর ফরেইন প্লেয়ার এক্সট্রা অর্ডিনারি সাপোর্ট দিয়েছে। ওদের কারণেই আমরা আসলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। অনেক দিক দিয়ে আমাদের সমস্যা ছিল। আর্থিক দিক দিয়ে ছিল, আমাদের কোনো ভালো গ্রাউন্ড ছিল না। ২০১৯-এর পরে আমাদের এই ক্লাবের সাবেক খেলোয়াড় যারা ছিলেন, জনি ভাই, সাব্বির ভাই, কানন ভাই সবাই একটা ফ্যামিলি হয়ে কাজ করেছি। গত চার বছর ধরে একটা কমপ্যাক্ট টিম হয়ে ছিল মোহামেডান। বেশিরভাগ খেলোয়াড় এখানেই খেলেছে। বিশেষ করে বিদেশি খেলোয়াড় সুলেমান, শেষ ৬ বছর ধরে মোহামেডানের হয়ে খেলছে। মোজাফফর ছিল, টনি ছিল, সানডে ছিল সবাই দারুণ নৈপুণ্য দেখিয়েছে। আমাদের কোচ আলফাজ, খেলোয়াড়দের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক ছিল। সব মিলিয়ে একটা কম্বাইন্ড এফোর্ডে আমরা রেজাল্ট পেয়েছি। আমরা নিজেরাও এটা আশা করিনি যে তিন ম্যাচ বাকি থাকতে আমরা চ্যাম্পিয়ন হব। আমাদের সমর্থকদের সহযোগিতা ছিল। আসলে শৃঙ্খলা ঠিক থাকলে কিছু একটা যে পাওয়া যায় সেটাই আল্লাহ আমাদের দেখিয়েছেন। ২২ বছর পর আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমরা সবাই খুব খুশি।’

দলের সাফল্যের নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছেন গোলকিপার সুজন হোসেন ও দুই ডিফেন্ডার মেহেদী হাসান এবং শাকিল আহাদ তপু। সব অপ্রাপ্তি একপাশে রেখে তারা মেতে উঠেছেন শিরোপা উৎসবে। সুজন বলেন, ‘আজ এমন দিনে কোনো দুঃখ বা অপ্রাপ্তি নিয়ে কথা বলতে চাই না। ক্লাব ম্যানেজমেন্ট আন্তরিক ছিল। আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছি বলেই আজ আমরা চ্যাম্পিয়ন হতে পেরেছি।’ তরুণ ডিফেন্ডার শাকিল আহাদ তপু বলেন, ‘মোহামেডানের জার্সিতে খেলার একটা মাহাত্ম্য আছে। প্রথম শিরোপা স্বাদ পাওয়া, সেটা সাদা-কালো জার্সি পরে, এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।’

মোহামেডানের এখন লক্ষ্য শেষ তিন ম্যাচে জিতে শিরোপা জম্পেশ উদযাপন করা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত