অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের জন্য ২৫টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এসব গাড়ি কেনার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রস্তাবনা ফিরিয়ে দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলন কক্ষে গতকাল মঙ্গলবার অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে উপদেষ্টা বা মন্ত্রী ও সমমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের ব্যবহারের জন্য ২৫টি গাড়ি কেনার জন্য পিপিআর, ২০০৮-এর বিধি ৭৬(২)-এ উল্লেখ করা মূল্যসীমার ওপরে কেনার জন্য নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়। তবে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটিতে অনুমোদন দেয়নি।
তবে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকের বৈঠকে আমরা এলএনজিসহ কয়েকটি পণ্য তাড়াতাড়ি আমদানি করার অনুমোদন দিয়েছি।’
জানা গেছে, দেশের জ¦ালানির চাহিদা মেটাতে সিঙ্গাপুর থেকে এক কার্গো এলএনজি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮’ অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক কোটেশন প্রক্রিয়ায় স্পট মার্কেট থেকে এই এলএনজি আমদানি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ৫৮৬ কোটি ৪৬ লাখ ২৭ হাজার ৫৯ টাকায় এই এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ নির্বচন কমিশনের জন্য ৪০৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৪০ টাকার ‘ব্ল্যাংক স্মার্ট কার্ড’ কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোবাংলা থেকে এক কার্গো এলএনজি সরবরাহের জন্য মাস্টার সেল অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (এমএসপিএ) স্বাক্ষরকারী চুক্তিবদ্ধ ২৩টি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে দরপ্রস্তাব আহ্বান করা হলে সাতটি প্রতিষ্ঠান দরপ্রস্তাব দাখিল করে। দাখিল করা সাতটি প্রস্তাবই কারিগরি ও আর্থিকভাবে রেসপন্সিভ হয়।
দরপত্রের সব প্রক্রিয়া শেষে প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরভিত্তিক মেসার্স গানভর সিঙ্গাপুর প্রাইভেট লিমিটেড থেকে এই এক কার্গো এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রতি এমএমবিটিইউ ১২ দশমিক ২২৮০ মার্কিন ডলার হিসেবে এক কার্গো বা ৩৩ লাখ ৬০ হাজার এমএমবিটিইউ এলএনজি আমদানিতে ব্যয় হবে ৫৮৬ কোটি ৪৬ লাখ ২৭ হাজার ৫৯ টাকা।
ক্রয় কমিটির সভায় রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় মরক্কো ও কাফকো থেকে ৭০ হাজার টন সার আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজার টন ইউরিয়া এবং ৪০ হাজার টন ডিএপি সার রয়েছে। এতে ব্যয় হবে ৪৭৭ কোটি ২৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির আওতায় মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার আমদানির জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন দিয়েছে।
জানা গেছে, বিএডিসি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চুক্তির মাধ্যমে মরক্কো থেকে ডিএপি সার আমদানি করে। এর আগে সম্পাদিত চুক্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় বিদ্যমান চুক্তির শর্তগুলো অভিন্ন রেখে ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর আবার চুক্তি নবায়ন করা হয়।
চুক্তিতে উল্লিখিত করা মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসারে সারের মূল্য নির্ধারণ করে মরক্কো থেকে ৪০ হাজার টন ডিএপি সার বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে ২ কোটি ৬৬ লাখ ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় ৩২৪ কোটি ৫২ লাখ টাকায় আমদানির প্রস্তাব সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক উপস্থাপন করা হলে কমিটিতে তাতে অনুমোদন দিয়েছে।
প্রতি টন ডিএপি সারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৬৫ ডলার। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মরক্কো থেকে ডিএপি সার আমদানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার টন। এ পর্যন্ত আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার টন।
এদিকে বৈঠকে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো), বাংলাদেশের কাছ থেকে ৩০ হাজার টন ব্যাগড গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার কেনার একটি প্রস্তাব দেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি এই প্রস্তাবটিও অনুমোদন দিয়েছে।
সরকারি চাকরিজীবীরা মহার্ঘ ভাতা পেতে পারেন : সরকারি চাকরিজীবীরা মহার্ঘ ভাতা পেতে যাচ্ছেন এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, মহার্ঘ ভাতার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থ উপদেষ্টা মহার্ঘ ভাতার বিষয়ে বলেন, ‘হয়তো একটু সময় লাগবে। কখন থেকে দিতে পারব, কত দিতে পারব, এটার জন্য কমিটিকে দায়িত্ব দিয়েছি।’
আসন্ন বাজেটে মহার্ঘ ভাতার বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসতে পারে কি না প্রশ্নে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘মহার্ঘ ভাতা নিয়ে এখন কিছু বলব না। আমরা কাজ করছি, দেখছি। এটা নিয়ে অ্যাকটিভলি কনসিডার (সক্রিয়ভাবে বিবেচনা) করছি। একটা কমিটিকে দায়িত্ব দিয়েছি। তারা কাজ করছেন, সেটা করে আমার কাছে দেবেন। বাজেটের ওয়ার্ক আউট করে দেখি, কখন থেকে দিতে পারব, কত দিতে পারব।’
মহার্ঘ ভাতা কত হতে পারে সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা বলা যাবে না, এটা বললে তো সব বলা হয়ে যাবে। যখন ফাইনাল করব, এরপর কেবিনেটে যাবে, প্রধান উপদেষ্টা অনুমোদন দেবেন, তারপর জানতে পারবেন। সরকারি চাকরিজীবীদের হতাশার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সেটা হওয়ার সুযোগ নেই, আমরা বিবেচনা করব। তবে এখনই এমন কিছু বলার দরকার নেই।’
স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পণ্য রপ্তানি বন্ধের প্রভাব কী হতে পারে, জানতে চাইলে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করব। আমি তো এখনই বলতে পারব না। ওনারা আসবে আমার কাছে কথা বলতে।’ এনবিআরের কর্মকর্তাদের আন্দোলন নিয়ে তিনি বলেন, ‘এনবিআরের বিষয়ে আমি কিছু বলব না। একই সঙ্গে এনবিআরকেও মন্ত্রণালয়ে কিছু বলতে দেব না। এনবিআর যদি কিছু বলতে চায় বাইরে গিয়ে বলবে।’
