১৮৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হারের পর ‘স্পোর্টিং টাইমস’ সাপ্তাহিক পত্রিকায় ব্যঙ্গ করে ছাপা হয়েছিল ইংল্যান্ডের ক্রিকেটের শোক সংবাদ। সেই ‘মৃত্যু সংবাদ’কে মিথ্যে প্রমাণ করে ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ‘জীবিত’ হয়েছে, বিশ্বকাপও জিতেছে। তাই আরব আমিরাতের বিপক্ষে সিরিজ হারের পর বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘মৃত্যু’ হয়েছে মনে করা সমর্থকরা আরেকবার আশায় বুক বাঁধতে পারেন। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজটা জিতলেই হয়তো ‘নবজন্ম’ হতে পারে ক্রিকেটের।
তুলনাটা অপ্রাসঙ্গিক, তবুও চলে আসে। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে পাকিস্তান হেরেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে, তার ঠিক আগে একই দলের বিপক্ষে টেক্সাসে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশও। সহযোগী দেশের কাছে হেরে যাওয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশের সমকক্ষ কেউ নেই তবে পাকিস্তানের পচা শামুকে পা কাটার ইতিহাসও কম নেই। জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ড, আফগানিস্তানের কাছে একাধিকবার হেরেছে পাকিস্তান। বাংলাদেশও হারিয়েছে ৩ বার। তাই লাহোরে আবারও তাদের হারাতে পারবে না বাংলাদেশ, এমনটা বলার উপায় নেই। পরিসংখ্যান যদিও সাহস জোগায়, ভয় ধরায় বাস্তবতা। আরব আমিরাতের বামহাতি স্পিনারদেরই খেলতে পারেননি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা, মাঝারি গতির পেসারদের বলে বিলিয়ে এসেছেন উইকেট; সেখানে পাকিস্তান সুপার লিগ খেলে ফর্মের তুঙ্গে থাকা বোলারদের তারা সামলাবেন কীভাবে? হারিস রউফ, নাসিম শাহ, হাসান আলিদের পেস আক্রমণ সামলে ওঠার আগেই শাদাব খান, খুশদিল শাহ, আবরার আহমেদদের ঘূর্ণিজাদুর সামনে পড়তে হবে লিটন-হৃদয়দের। তাদের ব্যাটে ভরসা জাগানোর মতো কোনো ইনিংসের তো দেখা নেই লম্বা সময় ধরেই। পিএসএলের ফাইনালে লাহোর কালান্দার্স এই গাদ্দাফি স্টেডিয়ামেই ২০১ রান তাড়া করে জিতেছে, তাতেই স্পষ্ট এখানে ব্যাটিংটা খুব ভালো না করে জেতার আশা করাটা ভুল।
দুই দিন প্রস্তুতির সুযোগ পেয়েছে দুই দল। মঙ্গলবার ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ অধিনায়ক লিটন দাস বলেছেন, ‘আমরা ভালো মতো দুটো অনুশীলন পর্ব সমাপ্ত করেছি। এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে আমরা ভালোভাবেই পরিচিত। খেলোয়াড়রা সবাই মাঠে নামার জন্য মুখিয়ে আছে। সবাই জানে নিজেদের পরিবেশে পাকিস্তান কতটা সামর্থ্য রাখে আর চ্যালেঞ্জ কতখানি সেটা সবাই বুঝতে পারছে’। ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে লিটন জানিয়েছেন, ‘শুধুই ফল নয় বরং ভালো ক্রিকেট খেলাটাই তার কাছে মুখ্য, আলোচনা সমালোচনা হবেই, ভালো ক্রিকেট না খেললে এটা স্বাভাবিক ঘটনা। আমাদের সবারই চেষ্টা থাকে ভালো ক্রিকেটটা কীভাবে খেলতে পারি, আমরা জানি কোথায় কী ভুল করেছি। চেষ্টা করব ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি যেন এখানে না হয়। সিরিজে প্রত্যাশা আমার একটাই, আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে চাই। আমরা ক্রিকেটটাকে দিন দিন উন্নত করতে পারছি কি না, শুধু ফল দিয়ে নয় কারণ ফল সবসময় নিজেদের পক্ষে আসবে না, তবে কীভাবে ক্রিকেট খেলছি সেটা বড় জিনিস। আমরা যদি প্রক্রিয়াটা মেনে এগোতে পারি তাহলে ভালো ফল বেশি আসবে।’ লিটনের আগে তার অনেক পূর্বসূরিই একই পদে থেকে একই রকম কথা শুনিয়ে গেছেন বহুবার। তার সামান্যই অবশ্য ফলেছে। বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে কখনোই ধারাবাহিক সাফল্য পায়নি। ব্যাপারটা মেনে নিয়েই লিটন বললেন, ‘আমরা যদি ধারাবাহিক হতাম তাহলে তো বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর ভেতরই থাকতাম, আমরা যেহেতু পেছনের দল তার মানে আমাদের কিছু কমতি আছে। সেই জায়গাগুলো নিয়েই কাজ করছি।’
গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের উইকেট পিএসএলের ফাইনালের মতোই রানপ্রসবা হবে বলেই মনে করেন লিটন, সেই সঙ্গে উদ্বেগ জানিয়েছেন শিশির নিয়েও। অনুশীলনে শিশিরের উপস্থিতি টের পাননি, তবে আমিরাতের বিপক্ষে তিনটা ম্যাচেই পরে বোলিং করতে গিয়ে শিশিরের উপস্থিতি অনেক ভুগিয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
অন্যদিকে পাকিস্তান অধিনায়ক সালমান আলি আগা বাংলাদেশ দলকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখছেন বলে জানিয়েছেন। সিরিজে ডিআরএস না থাকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তার কাছ থেকে উত্তর এসেছে, ‘ডিআরএস থাকলে সুবিধা হয়, আম্পায়াররাও তো মানুষ, তাদেরও ভুলত্রুটি হতে পারে। তবে ডিআরএস ছাড়াও ক্রিকেট হয়, আমরাও অনেক খেলেছি। মাঠের আম্পায়ারকে ভরসা করতে হবে আর তার সিদ্ধান্তকে সম্মান করতে হবে, এই তো।’ ডিআরএস চালানোর কৌশলীরা না থাকায় এই সিরিজে থাকছে না এই বিশেষ ব্যবস্থা।
প্রথম ম্যাচে চোটের কারণে পাকিস্তানের মোহাম্মদ ওয়াসিম জুনিয়রের একাদশে থাকা নিয়ে খানিকটা দ্বিধার কথা জানিয়েছেন সালমান আগা, বাংলাদেশ অধিনায়ক জানিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান ও তাসকিন আহমেদের মতো জ্যেষ্ঠ পেসারদের না থাকাটা অন্যদের জন্য বড় সুযোগ। এই সিরিজ দিয়েই পাকিস্তানের কোচ হিসেবে যাত্রা শুরু করবেন মাইক হেসন। মজার বিষয় তাকে কোচ করতে চেয়েছিল বাংলাদেশও, কিন্তু বেতনের অঙ্কে মেলেনি বলে করেনি বিসিবি। তার বদলে করা হয়েছিল রাসেল ডোমিঙ্গোকে, যার কোচিংয়েই দিন দুই আগে এই লাহোরের মাঠেই পিএসএল জিতল লাহোর কালান্দার্স।
